মুখের দুর্গন্ধ এমনই একটি সমস্যা যা কেবলমাত্র ব্যক্তিবিশেষকে নয় বরং তার সাথে জড়িয়ে থাকা সম্পর্কগুলো এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। কখনো কখনো মুখে দুর্গন্ধ হতেই পারে, তবে সেটা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার মতো কিছু নেই। কিন্তু যদি এই সমস্যা নিত্যদিনের হয় তাহলে তা নিয়ে ভাবার এবং করবার মতো অনেক কিছুই আছে। তবে তার আগে জানতে হবে কেন মুখে দুর্গন্ধ হয়।
মুখে দুর্গন্ধের কারণে অনেকসময় অনেককেই আত্মীয়পরিজন, বন্ধুবান্ধব বা সহকর্মীদের সামনে একটি বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়। এমন পরিস্থিতিতে অস্বস্তিবোধ আর মর্মপীড়া আত্মবিশ্বাসকেও খানিকটা নড়বড়ে করে দেয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মুখের দুর্গন্ধকে বলা হয় হ্যালিটোসিস। আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, গড়ে প্রতি চারজনে একজনের এই সমস্যা রয়েছে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ৫০% এই সমস্যায় ভুগছেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও মুখে দুর্গন্ধের সমস্যাটি বেশ প্রকট। ২০২১ সালে এই নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব জার্নালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। উক্ত হাসপাতালের শিশু বিভাগের মোট ৪৫ জন শিশুর উপর জরিপ চালানো হয়। জরিপ শেষে দেখা যায়, ১২.৫% ছেলে এবং ৩৩.৩% মেয়ে শিশুর হ্যালিটোসিস রয়েছে। যাদের বয়স ১৩ বছরের বেশি তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা অধিক।
ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস প্রদত্ত তথ্যাবলী বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় নিজেদের বদঅভ্যাস এবং অসচেতনতার পাশাপাশি কিছু রোগের কারণে এমন সমস্যার সৃষ্টি হয়।
ঠিকমতো দাঁত না মাজা
নিয়মিত দাঁত ব্রাশ না করার ফলে দাঁত, জিহ্বা এবং মুখের ভেতরে ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেয়। ব্যাকটেরিয়া এবং দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাবার মিলেমিশে মুখের ভেতর দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে।
শুধু তাই নয়, দাঁত ব্রাশ না করলে প্লাক তৈরি হয়। প্লাক থেকে দাঁত ক্ষয় বা মাড়ির সংক্রমণ হতে পারে। এর ফলেও দুর্গন্ধ হয়।
খাবারের ধরন
পিঁয়াজ, রসুন বা তীব্র গন্ধ রয়েছে এমন খাবার খেলে পরিপাকের সময় পাকস্থলী এই খাবারগুলো থেকে তেল শোষণ করে নেয় যা পরবর্তীতে রক্ত এবং রক্ত থেকে ফুসফুসে প্রবাহিত হয়। এর ফলে মুখে এক ধরনের দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয় যা প্রায় ৭২ ঘন্টা পর্যন্ত থাকে। কফি খেলেও এমন দুর্গন্ধ হতে পারে।
ধূমপান
ধূমপানের ফলে মুখে দুর্গন্ধ হয়। নিয়মিত ধূমপান পাকাপাকিভাবে মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করতে পারে।
শুষ্ক মুখ
যাদের মুখে পর্যাপ্ত পরিমাণে লালা তৈরি হয় না তাদের ক্ষেত্রেও এই সমস্যা হয়।
সাইনাস, মুখ ও গলার সমস্যা
সাইনাসের সংক্রমণ, ক্রনিক ব্রংকাইটিস, শ্বাসনালীর সংক্রমণ, নাকের পিছনভাগে মিউকাস জমে গেলে বা টনসিলে পাথর (টনসিল স্টোনস) হলে মুখে দুর্গন্ধ হয়।
বিভিন্ন রোগ
মুখে দুর্গন্ধ কিছু রোগের পূর্বলক্ষণ, যেমন-কিডনি ও যকৃতের অসুখ, ডায়াবেটিস, নিদ্রাহীনতা এবং গ্যাস্ট্রোইসোফিগাল রিফ্লাক্স ডিজঅর্ডার (জিইআরডি)।
মুখে দুর্গন্ধ হলে এই সমস্যা নিরসনে ব্যস্ততার অন্ত থাকে না। প্রতিরোধ বা প্রতিকার হিসেবে এই কাজগুলো করা যেতে পারে -
-নিয়মিত ব্রাশ করতে হবে। দিনে কমপক্ষে দুইবার ফ্লোরাইডযুক্ত পেস্ট বা অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল গুণ সমৃদ্ধ পেস্ট দিয়ে ব্রাশ করতে হবে।
-ফ্লসিং করতে হবে।
-জিহ্বা পরিষ্কার করতে হবে।
-রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে অ্যালকোহল মুক্ত মাউথওয়াশ দিয়ে ভালো করে গড়গড়া করতে হবে।
-মুখের শুষ্কতা দূর করতে প্রচুর পানি পান করতে হবে। এছাড়াও সুগার ফ্রি চুইংগাম বা ক্যান্ডি খাওয়া যেতে পারে।
-পিঁয়াজ, রসুন এবং উচ্চ চিনিযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।
-ধূমপান ত্যাগ করতে হবে।
-প্রতি তিন বা চার মাস অন্তর অন্তর টুথব্রাশ বদলাতে হবে।
-নিয়মিত দাঁতের চেকআপ করাতে হবে। অন্ততপক্ষে বছরে দুইবার একজন ডেন্টিস্টের শরণাপন্ন হতে হবে।
- যাদের জিঞ্জিভাইটিস আছে, তাদের ক্ষেত্রে দাঁতের ফাঁকে খাবার জমতে দেওয়া যাবে না। নিয়মিত ফ্লসিং করে এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
