সম্প্রতি আবার ভাইরাল হয়েছে শচীনকর্তার গাওয়া গান 'শোনো গো দখিনো হাওয়া'-এর ফিউশন, গানটি লিখেছেন মীরা দেব বর্মণ। শচীন দেব বর্মণকে ভালোবেসে অনেকে ডাকেন এ নামে। কোক স্টুডিওর এই গানটির ফিউশন করা হয়েছে গাউসুল আজম শাওনের লেখা লিরিকের সাথে।
শোন গো দখিনো হওয়ার সূত্রেই আবারো আলোচনায় উঠে এসেছে মীরা দেব বর্মণের নাম। তিনি শচীন দেব বর্মণের স্ত্রী ও রাহুল দেব বর্মণের মা।
তবে এই পরিচয়গুলোর আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে তার গীতিকবি পরিচয়। এছাড়াও তিনি ছিলেন গুণী একজন সঙ্গীতশিল্পী, সুরকার ও নৃত্যশিল্পী।
মীরার জন্ম নাম মীরা দাশগুপ্ত। শৈশবে তিনি বড় হন তার দাদু - দিদার কাছে। দাদু তার গলা শুনে গানের শিক্ষক রেখে গান শেখাবার ব্যবস্থা করেন। প্রথম শিক্ষক ছিলেন পণ্ডিত ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়। এরপর তিনি ধীরেন্দ্র নাথ দেবের কাছেও গান শেখেন।
১৯৩৮ সালে কোলকাতায় এক অনুষ্ঠানে শচীন দেব বর্মণের সাথে তার পরিচয় হয়। তার গানের গলায় মুগ্ধ শচীন তার প্রতি ভালো লাগা প্রকাশ করেন। তবে মীরার বাবা ও মায়ের বিচ্ছেদ ঘটায় এই বিয়েতে শচীনের মা - বাবার আপত্তি ছিল। তারা ত্রিপুরার রাজপরিবার। সে তুলনায় মধ্যবিত্ত একটি ঘরে বিয়ে তাদের সামাজিক অবস্থানের বিরোধী ছিল।

বিয়ের দিনে শচীন দেব বর্মণ ও মীরা দাশগুপ্ত। ছবি: উইকিবায়ো.ইন।
তবে তাদের উভয়ের অনড় অবস্থানের কারণে দুই পরিবারই এই বিয়েতে রাজি হন। সে বছরই তাদের বিয়ে হয়। বিয়েতে ঘোড়ায় চেপে এসেছিলেন রাজকুমার শচীন দেব বর্মণ।
এর পরের বছর মাত্র ১৬ বছর বয়সে মীরা তার একমাত্র সন্তান রাহুল দেব বর্মণের মা হন। পাশাপাশি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। তবে আই.এ পড়া অবস্থায় সঙ্গীতের প্রতি টান থেকে পড়ায় ইস্তফা দিয়ে সঙ্গীতেই মনোনিবেশ করেন।
১৯৪৫ সালে তিনি অল - ইন্ডিয়া রেডিওর তালিকাভুক্ত সঙ্গীতশিল্পী হন। পাশাপাশি শচীন দেব বর্মণকে সিনেমার সঙ্গীত পরিচালনায় সহায়তা করতে থাকেন। কালা বাজার, পিয়াসা, শর্মিলী, অভিমান-সহ অনেক সিনেমাতেই তিনি সহকারীর কাজ করেছেন।

একমাত্র সন্তান পঞ্চম (রাহুল দেব বর্মণ) কোলে মীরা। ছবি: উইকিবায়ো.ইন।
এছাড়া তিনি ভালো নাচতেও জানতেন। তবে সে সময়ের সমাজে বিবাহিত নারীদের নাচের বিষয়টি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় তিনি নাচ চালিয়ে যাননি।
তবে মীরা দেব বর্মণ সবচেয়ে বেশি পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন তার লেখা গানগুলোয়। তার লেখা গানের ভেতর 'নিটোল পায়ে রিনিক - ঝিনিক', 'শোন গো দখিনো হাওয়া', 'ঘাটে লাগাইয়া ডিঙা', 'গায় যে পাপিয়া', 'বর্ণে – গন্ধে – ছন্দে - গীতিতে', 'কে যাস রে', 'তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল', 'রঙিলা রঙিলা রঙিলারে'-সহ বেশকিছু গান আছে।
মীরা চিত্রকল্প নির্মাণ করতে পারতেন চমৎকার দক্ষতার সাথে। যেমন- 'ঘায়েল হয়ে ফিরি আমি ঐ নয়নের পিয়াসে।' (নিটোল পায়ে রিনিক ঝিনিক)। এখানে এক শ্যামা মেয়ের চোখের চাহনিতেই তাকে দেখতে চাওয়ার পিপাসা আরো বেড়ে যাবার কথা বলা হয়েছে।
কিংবা 'ঘাটে লাগাইয়া ডিঙা' গানে - 'এই পরাণের বিনিময়ে তোমার পরান দিও মাঝি আল্লাহর দোহায়'। এখানে পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক সমাজের মানুষের সাথে মিল রেখে তিনি 'আল্লাহর দোহায়' শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন।
‘মুক্তা যেমন শুক্তির বুকে তেমনি আমাতে তুমি/ আমার পরানে প্রেমের বিন্দু - তুমি শুধু তুমি’ - ঝিনুক যেমন সব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে মুক্তা ফলায়, তেমনিভাবেই সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করার কথা বলেছেন অবিচ্ছেদ্য ভালোবাসা দিয়ে (বর্ণে – গন্ধে – ছন্দে - গীতিতে)। গানটিতে তার নিজের জীবনের কথাই ফুটে উঠেছিল। শচীন দেব এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেই লিখেছিলেন এই গান।
এমন গভীর ভালোবাসাময় রূপকসমূহের প্রয়োগে তার গীতিকবিতাগুলোর প্রেম শাশ্বত রূপ লাভ করেছে।
মুক্তিযুদ্ধের পরপরই '৭১ এর ডিসেম্বরে তিনি কুমিল্লায় এসেছিলেন। সেখানে নববিবাহিতা এক কিশোরীকে কাঁদতে দেখে জানতে পারেন তার বিয়ে হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে। এরপর যুদ্ধ শেষ হয়েছে। কিন্তু তাকে নাইওর নেবার জন্য বাবার বাড়ি থেকে ভাই বা অন্য কেউ আসেননি। কে জানে, হয়ত তারা বেঁচেই নেই; কিংবা সবাই উদ্বাস্তু। এর ওপরই তিনি লেখেন, 'কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া' গানটি।

ছবি: উইকিবায়ো.ইন।
বোম্বেতে স্থায়ী হলেও তার মন পড়ে থাকতো কুমিল্লার গ্রামে। সেই অনুভূতি প্রকাশ করেছেন 'তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল' গানে। গানটি ঋত্বিক ঘটকের নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘দুর্বার গতি পদ্মা’-য় শচীনকর্তাকে গাইতে দেখা যায়।
সংবেদনশীল মীরা পাদপ্রদীপের আড়ালে থেকেই সারাজীবন তার স্বামী ও সন্তানের প্রতিভার সর্বোচ্চ বিকাশে ছায়ার মত পাশে থেকেছেন। ১৯৭৫ সালে শচীনকর্তার মৃত্যুর পর তিনি ভেঙে পড়েন এবং গান থেকে অনেকটা দূরে সরে যান।
এরপর একসময় তারা সপরিবারে সেই বাসা ছেড়ে রাহুল দেব বর্মণের সান্তাক্রুজের বাসায় থাকতে শুরু করেন। ১৯৯৪ এর ৪ জানুয়ারি রাহুল দেব বর্মণের মৃত্যুর পর তিনি প্রচণ্ড আঘাত পান ও মানসিক ভারসাম্য হারান।
এরপর ধীরে ধীরে বাকশক্তিহীন হয়ে পড়েন। তারপর পুত্রবধূ আশা ভোঁসলে তাকে একটি আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন। এরপর দীর্ঘদিন তার কোন খোঁজ ছিল না।
২০০৭ সালে ত্রিপুরা সরকার একটি সম্মাননা দেয়ার জন্য তাকে খুঁজতে শুরু করে। তারপর তাকে পাওয়া যায় সেই বৃদ্ধাশ্রমে। ততদিনে তার কোনো চেতনা ছিল না। কাউকে চিনতে পারতেন না। কথাও বলতে পারতেন না।
এরপর তাকে নিয়ে আসা হয় রাহুল দেব বর্মণের সেই বাসায়। সেখানে আনার ১৫ দিন পর তার মৃত্যু হয়। সে সময় কাউকে চিনতে না পারলেও ছবি দেখে স্বামী ও ছেলেকে চিনতে পেরেছিলেন। শচীন দেব বর্মণের জন্য লেখা সেই গানগুলো বাজতে শুরু করলেই নড়েচড়ে বসতেন, মনে হতো তিনি হারানো কিছু আবার ফিরে পেয়েছেন।
মাহমুদ নেওয়াজ জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগা্যোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।
mahmudnewaz939@gmail.com
