সিরাজগঞ্জের নলকা এলাকায় বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কে গত রোববার রাতে কোনো এক গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন ব্যাটারিচালিত ভ্যানের আরোহী মা ও মেয়ে। অথচ সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী মহাসড়কে তিনচাকার যানবাহন, রিকশা বা ভ্যান চলারই কথা নয়।
বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম থানার ওসি মোসাদ্দেক আলী বলছেন, ভ্যানটি মহাসড়ক অতিক্রম করতে গিয়ে মাঝরাস্তায় বিকল হয়ে যায়। দ্রুতগামী কোনো গাড়ি তখন সেটিকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত পুলিশ সেই গাড়িকে শনাক্ত করতে পারেনি।
বিগত বছরগুলোতে মহাসড়কে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে তিনচাকার এই বাহনগুলো। সরকারি নিষেধাজ্ঞার পরও মহাসড়কে এসব বাহন চলাচল বন্ধ হয়নি।খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
দূরপাল্লার বাসচালক, পরিবহন মালিক এবং গবেষকেরা বলছেন, চালকদের অদক্ষ, ধীর গতি, নির্মাণত্রুটি জনিত ভারসাম্যহীনতা, যথাযথ ব্রেক ও সিগন্যাল লাইটের অভাবে এসব যানবাহন মহাসড়কে চলতে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয় সড়কে চলতে দিলেও সেগুলোকে অবশ্যই নিয়ম আর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে। বাহনের নিবন্ধন এবং চালকদের প্রশিক্ষণ এবং লাইসেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৫৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩১০ জন ছিলেন বিভিন্ন ধরনের তিন চাকার বাহনের চালক ও যাত্রী।
দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালের অগাস্ট মাসে দেশের ২২টি মহাসড়কে থ্রি-হুইলার ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নিজে সে সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মহাসড়ক থেকে তিন চাকার বাহনের উচ্ছেদ অভিযানে অংশ নেন। কিন্তু মহাসড়কে এসব বাহনের চলাচল থামেনি।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালকঅধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের সড়কগুলোতে মূলত স্থানীয়ভাবে তৈরি শ্যালো ইঞ্জিনচালিত কিছু থ্রি হুইলার, চীন থেকে আমদানি করা ব্যাটারিচালিত এবং ভারত থেকে আমদানি করা ডিজেল ও সিএনজি চালিত থ্রি হুইলার চলাচল করে।
স্থানীয়ভাবে তৈরি গাড়িগুলো- ভটভটি, নসিমন, করিমন, আলমসাধু ইত্যাদি নামে পরিচিত। এছাড়াও দেশীয় রিকশা বা ভ্যানে ব্যাটারিচালিত মোটর বসিয়ে চালানো হচ্ছে ব্যপকভাবে।
গত জুনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল আবারও মোটরচালিত রিকশা-ভ্যান নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত জানান। কিন্তু এসব বাহন এখনও শহর এলাকা থেকে শুরু করে মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গে বিভিন্ন পথে চলাচলকারী হানিফ পরিবহন বাসের সুপারভাইজার পইমুল ইসলাম বলেন, এই অটোগুলো হাইওয়েতে যেমন-তেমনভাবে চলে। হুট করে কানেকটিং রোড থেকে হাইওয়েতে উঠে পড়ে। যখন তখন মোড় ঘোরায়। আবার যেখানে সেখানে উল্টো পথে চলে। উত্তরবঙ্গ মহাসড়কের কয়েকটা জায়গায় তো ব্যাটারি রিকশার স্ট্যান্ডই বসানো হয়েছে।
পঞ্চগড় থেকে সিলেটের পথে চলাচলকারী আহাদ পরিহন নামে একটি বাসের চালক বলেন, তাকে এক নাগাড়ে প্রায় সাতশ কিলোমিটার গাড়ি চালাতে হয়। রাত ১১টার পর থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত মহাসড়কে ভ্যান-অটোরিকশার অত্যাচার কিছুটা কম থাকে। বাকি ১৮ ঘণ্টা এসব বাহনকে পাশ কাটিয়েই চলতে হয়।
বুয়েটের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, স্থানীয়ভাবে তিন চাকার বাহনগুলো তৈরি হয় বলে এগুলোর ভারসাম্য খুবই নাজুক। ব্রেকও ভালো না।
এই গাড়িগুলো এমনিতেই ঢালু সড়ক বা মোড় ঘোরানোর সময় উল্টে যেতে পারে। বড় গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগার পর এসব বাহনের যাত্রী ও চালকদের হতাহতের হার খুবই বেশি। আবার এসব গাড়ির চালকদের প্রশিক্ষণেরও কোনো ব্যবস্থা নেই।
হাদিউজ্জামান বলেন, স্থানীয় মানুষদের স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের প্রয়োজনে এসব বাহন জনপ্রিয় হয়েছে। ফলে রাতারাতি এসব বন্ধ করা যাবে না।
সেক্ষেত্রে ছোট বাস বা মাইক্রোবাসের মত বাহনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আর মহাসড়কের সমান্তরালে সার্ভিস রোড দিতে পারলে আরও ভালো। কারণ মহাসড়কে দ্রুত গতিতে ভারী যানবাহন চলবেই।সোহাগ পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক তালুকদার সোহেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, হাইওয়ে দ্রুগতির বড় যানবাহনের জন্য, এটা বোঝার জন্য খুব বেশি টেকনিক্যাল জ্ঞানের দরকার হয় না। সেই জায়গায় দ্রুতগতি ও ধীরগতির গাড়িকে যদি একইসঙ্গে চলতে দেন, তখন অবশ্যই বিপর্যয় ঘটবে, যেগুলো আমরা এখন প্রত্যক্ষ করছি।
এই বিপদ কাটাতে পৃথিবীজুড়ে স্বীকৃত বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা ও নিয়মগুলো মহাসড়কে কাজে লাগানোর ওপর জোর দেন তিনি।
সোহেল বলেন, যদি আপনি জোড়াতালি দিয়ে চালাতে চান, তাহলেও চলবে। তবে আমাদের একটার পর একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সাক্ষী হতে হবে। তখন এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা থামানো খুব কঠিন হয়ে যাবে।