১৪৯৮ সালের ২০ মে। ভারতের কালিকট বন্দরে চাঞ্চল্য। এক আগন্তুক এসেছেন, সঙ্গে ৩৩ টি জাহাজ ও ১৭০ জনের বেশি লোক। তিনি জাতিতে পর্তুগিজ। কালিকটের রাজা জামোরিনের কাছে চান কর ও শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অধিকার!
কিন্তু জামোরিন তাতে রাজি হলেন না। আরব বণিক খোজা আম্বর তাকে সাবধান করে দিলেন। বললেন যে, এই পর্তুগিজ লোকটার দস্যু হবার সম্ভাবনাই বেশি.
প্রত্যাশিত প্রস্তাব নাকচের ধাক্কা সহ্য করেননি সেই পর্তুগিজ দস্যু। তার নাম ভাস্কো দ্য গামা। পর্তুগিজ এই নাবিক ভারতে এসেছিলেন মসলার সন্ধানে। কিন্তু তার পেছনে ছিলো বাণিজ্যিক আধিপত্য বিস্তারের সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য। আর তাই শেষ পর্যন্ত কালিকট রাজ্যের বিরুদ্ধে কামানসজ্জিত হয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি।
তবে রাজা জামোরিন সে যাত্রায় যুদ্ধে জয় পেয়েছিলেন। প্রথমে খোজা আম্বর ও পরে মিশরের সেনাপতি মীর হুসেন প্রচুর সাহায্য করেন তাকে। পরে অবশ্য ১৫২৬ এ কালিকটের পতন ও সন্ধিসূচক চুক্তি হয়। এতে পর্তুগিজরা অবাধ বাণিজ্যের অধিকার পেয়ে যায়।
কিন্তু কেন এত দূরের পথ পাড়ি দিয়ে গামাকে আসতে হলো ভারতবর্ষে? এর উত্তর খুঁজতে হলে যেতে হবে আরো একটু পেছনে।
পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত ভারতবর্ষের উৎপাদিত মসলা পশ্চিমে যেত আরব হয়ে, বিশেষত মিশর হয়ে। আরব বণিকেরা মসলার মূল উৎস গোপন রেখেছিলো। আরব হয়ে ইতালির ভেনিসে আসত এসব মসলা। সে সময় মিশরে মুসলিম শাসন আসায় নানাবিধ কারণে ক্যাথলিক চার্চতন্ত্র প্রভাবিত ইউরোপের জন্য তা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এদিকে ইতালি ও পর্তুগালের মধ্যে শুরু হয় মসলা বাণিজ্য নিয়ে আধিপত্যের লড়াই। আর তাই পর্তুগিজ রাজা ডোম হেনরির কথায় দস্যু বণিক ভাস্কো দ্য গামা যাত্রা করেন এ মসলার মূল উৎস ভারতবর্ষের উদ্দেশ্যে।
দীর্ঘসময় ধরে চলা ক্রুসেড তাদের ভেতর মুসলিমবিরোধী মনোভাব প্রবল করেছিলো। এর ফল গামার নের্তৃত্বে 'মেরি' নামের জাহাজে আগুন দিয়ে ৪০০ হজ্বযাত্রীকে পুড়িয়ে মারা হয়।
সে সময় আন্তর্জাতিকভাবে সমুদ্র আইন বলে তেমন কিছু ছিল না। যা ছিলো তা সব ইউরোপীয়দের অনুকূলেই। একারণে রাজসমর্থনপুষ্ট নাবিক নামের দস্যুদের পক্ষে যা ইচ্ছা তা-ই করা সম্ভব ছিলো।
তবে এই আধিপত্য ও বাণিজ্য বিস্তারের লড়াই শুধু পর্তুগিজদের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকেনি। কালিকটের পতনের পর পর্তুগিজরা যেমন ব্যবসা করতে থাকলো, তেমনি এদিকে চোখ পড়ে ডাচদের।
১৬০২ সালে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠিত হয়। এটাই ছিল পৃথিবীর প্রথম কর্পোরেশন। আজকের যুগের মাল্টিন্যাশনাল বা কর্পোরেট গ্রুপগুলোর আদি পিতা বলা যায় এই কোম্পানিকে। ডাচেরা পর্তুগিজদের হটিয়ে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন দ্বীপাঞ্চল দখলে নেয়। এসব দ্বীপে দারুচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, এলাচ, জায়ফল, জয়ত্রীর মত মসলাগুলোর ব্যাপক চাষ হতো।
সে সময় ১ টি জায়ফলের বিনিময়ে ৩ টি ভেড়া পাওয়া যেত! লবঙ্গ রপ্তানি করে বিনিয়োগের ২৫ গুণ মুনাফা করতো ডাচেরা।
বছরে মসলা রপ্তানি করে যে আয় হতো, তা ছিলো ১৫ লক্ষ মানুষের বার্ষিক খাবার খরচের সমান! এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ইন্দোনেশিয়ার বান্দ্রা দ্বীপপুঞ্জের ছোট একটি দ্বীপ 'রান' এর বিনিময়ে নিউইয়র্কের হস্তান্তর।
তখনও আমেরিকা রাষ্ট্র গঠিত হয়নি। আজকের নিউইয়র্ক তখন ছিলো ডাচদের দখলে। নাম ছিলো নিউ ম্যানহাটন। ডাচেরা নাম দিলো নিউ এমস্টারডার্ম। মসলার এই লড়াইয়ের অংশ হয়েছে ততদিনে ইংরেজরাও। মসলা বাণিজ্যকে পুঁজি করে একের পর এক অঞ্চলে উপনিবেশ গড়ে নিচ্ছে তারা।
তারই অংশ হিসেবে তারা আক্রমণ করে ইন্দোনেশিয়ার বান্দ্রা দ্বীপপুঞ্জ। বান্দ্রা ছিলো জায়ফল আর জয়ত্রী উৎপাদনের তীর্থক্ষেত্র। তাই মসলাগুলোর ওপর একচেটিয়া অধিকার নিতে এলো ব্রিটিশরা। তবে তারা ডাচদের সাথে পেরে ওঠেনি। পরে সন্ধিচুক্তির অংশ হিসেবে সেখান থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে নিতে হয় তাদের, বিনিময়ে নিউইয়র্ক ছেড়ে দেয় ডাচেরা।
সেই ১৪৯৮-এ যে বাণিজ্যিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য পর্তুগিজদের আগমন, সেই আধিপত্যেরই পর্যায়ক্রমিক চূড়ান্ত রূপ ১৯০ বছরের ইংরেজ শাসন।
মসলা চাষের নিয়ন্ত্রণ নেবার সাথে সাথে পরবর্তীতে জোরপূর্বক কফি চাষও শুরু করে ডাচেরা; যার উত্তরসূরী হয় ইংরেজদের নীলচাষ। আর এসবকিছুর মাধ্যমে ভেঙে পড়ে ভারতবর্ষের কৃষকদের মেরুদণ্ড ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি।
মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
mahmudnewaz939@gmail.com