Loading...

মন ভোলানো মিষ্টি কথন

| Updated: April 27, 2021 16:53:57


ছবিঃ ইন্টারনেট ছবিঃ ইন্টারনেট

“ই কেমন কথা হলো মোহনবাবু? আপনার রসগুল্লা খাওয়া চেহেরা, শুগারে নো করছেন কেন?”

ফেলুদার ঘোর শত্রু মগনলাল মেঘরাজ এই ‘রসগুল্লা-খাওয়া’ টার্মটি ব্যবহার করেই বিখ্যাত রহস্যরোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক জটায়ুকে ঘায়েল করেছিল, ফেলে দিয়েছিল এক বিচ্ছিরি ধর্মসংকটে। বাস্তবিকই, বাঙালির চেহারা দেখলেই রসগোল্লা কিংবা মোটা দাগে মিষ্টির প্রতি তার টানটা খুব ভালোভাবে টের পাওয়া যায়। ভরপেট খাওয়া-দাওয়ার পর শেষপাতে একটু মিষ্টি না জুটলে কি আর বাঙালির পেট ভরে?

তাই ধর্ম-বর্ণ-বিত্ত নির্বিশেষে বিশেষ দিনের বিশেষ খাবারের তালিকায় শেষপাতের মিষ্টিটাও একটা বড়সড় জায়গা করে নেয় বৈকি! এই বাঙালির মিষ্টির ক্ষিদে মেটাতে কালে কালে কত রকমের মিষ্টি যে বাংলার ময়রা-হালুইকরদের হাতে জন্ম নিয়েছে, তার খবর আর ক’জনই বা জানে। আজকের এই লেখায় আমরা বিখ্যাত কিছু মিষ্টির বর্ণনা ও তাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করব।

প্রথম লাইনে মগনলালের উল্লেখ করা মিষ্টির কথা দিয়েই শুরু করা যাক তাহলে।

রসগোল্লা (কলকাতা)

এর নামটিই এর পরিচয়। এই মিষ্টি খুব সম্ভবত বাঙালির কাছে সবচেয়ে বেশি পরিচিত মিষ্টি। ঘন-খাঁটি দুধ থেকে ছানা আলাদা করে তার সাথে গুড় বা চিনি মিশিয়ে তৈরি হয় এই সাদা রঙের গোলগাল নরম নরম মিষ্টিটি। আর গরম গরম অবস্থায় তার দু-চারটা যদি ঝটপট পেটে চালান না-ই করা গেল, তবে একজন বঙ্গসন্তানের বাঙালিয়ানাটা আর রইল কোথায়!

রসগোল্লার প্রচলন ঠিক কবে, কোথায় হয়েছিল, সেটা বলা শক্ত। অনেকে বলেন ১৪-১৫ শতকের দিকে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার হারাধন ময়রা সর্বপ্রথম রসগোল্লার আদিরূপটি তৈরি করেন। আবার কেউ কেউ বলেন, রসগোল্লার উৎপত্তিস্থল আমাদের বরিশালের পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া অঞ্চল। পর্তুগীজ শাসনের সময় ওই অঞ্চলের ময়রারা ছানা, চিনি, সুজি, দুধ প্রভৃতি দিয়ে একরকম গোলাকার মিষ্টি তৈরি করতেন, যাকে অনেক গবেষকই এখন রসগোল্লার পূর্বপুরুষ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তবে বর্তমানে যে সাদা-নরম মিষ্টিটিকে আমরা রসগোল্লা হিসেবে চিনি, তার আবিষ্কর্তা হচ্ছেন কলকাতার নবীনচন্দ্র দাস ওরফে নবীন ময়রা। আক্ষরিক অর্থেই রসের গোল্লা এই মিষ্টিটি সর্বপ্রথম তিনিই তৈরি করেন। এ নিয়ে কলকাতায় একটা সিনেমাও বানানো হয়েছে ‘রসগোল্লা’ নামে।

রসমালাই (কুমিল্লা)

রসমালাই কে না চেনে! মিষ্টি দুধের রসে ডোবানো ছোট ছোট গোলাকৃতি এই মিষ্টিগুলো পছন্দ করে না, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই মিষ্টিটি সত্যি বলতে রসগোল্লারই একটি উন্নততর রূপভেদ। তা সত্ত্বেও প্রথম আবিষ্কারের পর থেকে এখন পর্যন্ত এর জনপ্রিয়তা তো বিন্দুমাত্র কমেইনি, উল্টো অনন্য স্বাদ এবং বৈশিষ্ট্যের কারণে রসমালাই পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছে বাঙালির স্বাদ কোরকে।

রসমালাইয়ের কথা বলতে গেলে কুমিল্লার নামটা খুব সম্ভবত অবধারিতভাবেই উঠে আসবে। স্বাদে-গন্ধে এই কুমিল্লার রসমালাইকে টক্কর দেয়া অন্য যেকোনো জায়গার রসমালাইয়ের জন্য বেশ শক্ত কাজই বটে! কুমিল্লার এই বিখ্যাত রসমালাইয়ের আবিষ্কর্তা হলেন ত্রিপুরার ঘোষ সম্প্রদায়। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে যাত্রা শুরু করা এই মিষ্টিটির আকার প্রথমে বেশ বড় ছিল, রসগোল্লার মতোই, তখন এর নাম ছিল ক্ষীরভোগ। সময়ের সাথে সাথে ক্ষীরভোগের আকার ছোট হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে ত্রিশের দশকের দিকে ক্ষীরভোগ থেকে আলাদা হয়ে কুমিল্লার রসমালাই তার নিজস্ব নাম, আকৃতি এবং খ্যাতি অর্জন করে।

কাঁচাগোল্লা (নাটোর)

জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে বনলতা সেনের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে তাকে হারানোর মতো নাটোরের যদি কোনো শক্ত নিজস্ব প্রতিযোগী থেকে থাকে, তবে খুব সম্ভবত তা হচ্ছে নাটোরের কাঁচাগোল্লা। কাঁচাগোল্লার সবচেয়ে মজার ব্যাপারটি হচ্ছে, এ মিষ্টিটি তৈরি করার জন্য স্রেফ ঘন দুধ থেকে ছানা আলাদা করতে হয়, তারপর  সেই কাঁচা ছানা গরম চিনির সিরায় ঢেলে দিয়ে অনেকক্ষণ জ্বাল দিতে হয়। ব্যস, তৈরি হয়ে গেল কাঁচাগোল্লা। শুনতে খুব সহজ লাগলেও গোটা কাজটা যদিও অতটা সহজ নয়!

কাঁচাগোল্লার নামটাও দেয়া হয়েছে মূলত এর বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে, যেহেতু না ভেজে শুধুমাত্র কাঁচা ছানা দিয়েই এটি তৈরি করা হয়।

এ গোল্লার আবিষ্কারকের নাম মধূসূদন পাল। তিনি, বলা যায় অনেকটা কাকতালীয়ভাবেই কাঁচাগোল্লা আবিষ্কার করে বসেন। এই মধূসূদন পালের নাটোর শহরে একটি বিরাট মিষ্টির দোকান ছিল, সমপরিমাণ বিখ্যাতও ছিল বটে। মিষ্টি তৈরি করার জন্য মধুসূদনের আলাদা কারিগর ছিল। যা-ই হোক, কোনো একদিন কোনো কারণে সেই মিষ্টির কারিগর কাজে আসতে পারেননি, অথচ ইতোমধ্যে মিষ্টি তৈরির জন্য প্রচুর কাঁচা ছানা আলাদা করে রাখা হয়েছে, বেশিক্ষণ পড়ে থাকলে সেগুলোও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই ভেবে মধুসূদন কর্মচারীদের নির্দেশ দিলেন সেই কাঁচা ছানা চিনির রসে জ্বাল দিয়ে রাখতে। যেই কথা, সেই কাজ!

কিছুক্ষণ পর সেই চিনির রসে জ্বাল দেয়া ছানা নিজের অজান্তেই চেখে দেখতে গেলেন মধুসূদন, সেই তখন থেকেই কাঁচাগোল্লার যাত্রা শুরু হলো। সালটা ছিল খুব সম্ভবত ১৭৫৭, যে বছর সিরাজউদ্দৌলা বাংলার মসনদের দখল ইংরেজদের কাছে হারিয়ে ফেলেন। তারপর দু’শো বছর ইংরেজরা শাসন করল, চব্বিশ বছর পাকিস্তানিরা, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু নাটোরের কাঁচাগোল্লা এখনও স্বমহিমায় বিরাজিত, ঠিক আগের মতোই!

বালিশ মিষ্টি (নেত্রকোণা)

এই বালিশ নামক মিষ্টিটি সম্ভবত বাঙালি রসনার মিষ্টি পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকৃতির মিষ্টি। যেখানে অন্য মিষ্টি এক কেজিতে দশ-বিশটি করে পাওয়া যায়, সেখানে একেকটি বালিশের ওজনই হয় এক কেজি বা তারও বেশি। নেত্রকোণা শহরের যা কিছু দ্রষ্টব্য, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এই বালিশ মিষ্টি।

বালিশ মিষ্টির রূপটা আক্ষরিক অর্থেই অনেকটা কোলবালিশের মত। ছানা-ময়দার মিশ্রণে তৈরি বিশাল বিশাল মণ্ডকে একবার চিনির সিরায় ভেজে, তারপর আবার অনেকক্ষণ সিরায় ডুবিয়ে রেখে বালিশ মিষ্টি তৈরি করা হয়। তবে, যে উপকরণটির জন্য বালিশ মিষ্টির স্বাদ অনেকগুণ বেড়ে যায়, সেটি হচ্ছে ক্ষীর কিংবা দুধের মালাই। তুলতুলে বালিশ মিষ্টির সাথে ক্ষীরের মালাই, এর চেয়ে ভালো জুটি বোধহয় বাঙালির মিষ্টি জগতে দ্বিতীয়টি নেই।

বালিশ মিষ্টির আবিষ্কারকের নাম গয়ানাথ ঘোষ। মূলত একটু অন্যরকম মিষ্টি তৈরির ইচ্ছা থেকেই নেত্রকোনার বারহাট্টা সড়কে নিজের দোকানে বসে বিশাল আকারের এই মিষ্টিটি প্রথমবারের মতো তৈরি করেছিলেন তিনি। সেই থেকে বালিশ মিষ্টির স্থানীয় নাম হয়ে যায় গয়ানাথের বালিশ। অবশ্য, বালিশ তৈরির আঁতুড়ঘর গয়ানাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার নামের দোকানটি শেষ পর্যন্ত গয়ানাথের নিজস্ব আর থাকেনি। ১৯৬৯ সালে গয়ানাথ ঘোষ দেশত্যাগ করেন, তারপর থেকে বার দুয়েক দোকানটিরও হাতবদল হয়।

চমচম (টাঙ্গাইল)

টাঙ্গাইল যাবেন, আর চমচম খাবেন না, তা তো আর হয় না! টাঙ্গাইলের নিজস্ব এই  মিষ্টি নিজ রূপ, স্বাদ ও মিষ্টতার জন্য গোটা বাংলাদেশে এক নামে পরিচিত। এই মিষ্টির বাইরের দিকটা পোড়া ইটের মতো লালচে, এবং ভেতর অতি অবশ্যই তুলতুলে।

এ চমচম সর্বপ্রথম  তৈরি হয় টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ি গ্রামে জনৈক যশোরথ হালুইয়ের হাতে। তিনিই সর্বপ্রথম ছানা, দুধ, চিনি ও ধলেশ্বরী নদীর পানি দিয়ে এই চমচম তৈরি করেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কখনও অন্য কোনো জায়গায় টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির এই চমচমের মতো একই স্বাদের চমচম  তৈরি করা সম্ভব হয়নি; এমনকি পোড়াবাড়ির চমচমের কারিগরও অন্য জায়গায় হুবহু তৈরি করতে পারেননি এই নাছোড়বান্দা মিষ্টিটি। স্থানীয়দের মতে, ধলেশ্বরীর পানিই একমাত্র উপাদান, যার অভাবে অন্য জায়গায় হুবহু টাঙ্গাইলের চমচম তৈরি করা সম্ভব হয় না!

এছাড়াও এপার বাংলা-ওপার বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে আছে আরও হাজারও নামের-রঙের-স্বাদের মিষ্টি আর মিষ্টিজাতীয় খাদ্যদ্রব্য, যেমন ধরুন মুক্তাগাছার মণ্ডা, বগুড়ার দই, মৌলভীবাজারের স্পঞ্জ রসগোল্লা, ওপারের কৃষ্ণনগরের সরভাজা, কলকাতার লেডিকেনি, নামের কি আর ইয়ত্তা আছে!

মিষ্টির সাথে বাঙালির সম্পর্ক আজকের নয়। সুপ্রাচীনকাল থেকেই বাঙালির উৎসবে, অনুষ্ঠানে, পূজায়-পার্বণে মিষ্টি এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাই তো আজও পরীক্ষার ভালো ফল বেরোলে পাড়া-প্রতিবেশীকে মিষ্টি দেয়া হয়, বিয়ের সময় নতুন জামাই ঘরে পা রাখার আগে তাকে খাইয়ে দেওয়া হয় মিষ্টিই, কিংবা সংসারে নতুন মুখ এলে সবার আগে ছুটে যেতে হয় মিষ্টির দোকানেই। বাঙালি জীবনে মিষ্টির মহিমা এমনই যে, বাঙালির ‘শুভকাজ’ আর ‘মিষ্টিমুখ’ শব্দদুটো জড়িয়ে আছে একদম আষ্টেপৃষ্ঠে। মিষ্টি আর বাঙালিয়ানার এই সম্পর্ক অটুট থাকুক, যুগ যুগ বাঙালি বেঁচে থাকুক জটায়ুর মতো ‘রসগুল্লা-খাওয়া-চেহেরা’ নিয়ে।

লেখক বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ, তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

shuvodipbiswasturja1999@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic