স্বাধীনতা — মানুষ ভেদে যার পাল্টে যায় সংজ্ঞা, তার ব্যাখ্যা। আমরা যদি 'স্বাধীনতা' শব্দের অর্থ হিসেবে ‘স্ব অধীন’ ব্যবহার করি, তবে তার তাৎপর্য ঠিক কতখানি?
বলা হয়, মানুষের মন গিরগিটির মতো, ক্ষণে ক্ষণে যার বদলায় রঙ। কিন্তু এ রঙ বদলে যাবার সাথে পাল্লা না দিয়ে মানুষ যদি নিজেকে প্রতিমুহূর্তে তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারে, তবে তা শুভ কিছু বয়ে আনতে নাও পারে। এই আত্ননিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটিই হচ্ছে ‘স্বাধীনতা’ বা ‘স্ব-অধীন’। অর্থাৎ, মনের ভালো-মন্দ চাওয়াগুলোকে ছেঁকে নিয়ে ভালোর পথে দৃঢ়চেতা মনোভাব।
মানসিকভাবে যারা প্রবল শক্তিশালী, যারা তাদের লক্ষ্য হাসিলে সর্বদা সচেতন, তাদের প্রত্যেকের কাছে সফলতার পথে ‘স্বাধীনতা’ এক অন্যতম হাতিয়ার। তবে এর বাইরেও এমন কিছু বিষয় আছে, যা তারা সবসময়ই মেনে চলার চেষ্টা করেন। আজকে আমরা সে বিষয়গুলো সম্পর্কে জানার চেষ্টা করব।
দোষারোপ করা
অনেকেই আছেন, যারা নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া সব বিফলতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে, নিজেকে ত্রুটিমুক্ত প্রমাণ করতে চান। কিন্তু যারা নিজের অধীনে থাকেন, তারা নিজের ব্যর্থতার জন্য পরিবেশ বা অন্যের সাহায্যহীন মানসিকতাকে কখনোই দায়ী করেন না। অথবা, কখনোই বারবার নিজেকে দুঃখিত বলে তাদের মহামূল্যবান সময়টুকু অপচয় করেন না। বরং তারা প্রতি মুহূর্তে বিশ্বাস করে, জীবন সবসময়ই খুব বেশি সহজ বা খুব বেশি ভীতির হয় না, জীবন জীবনের নিয়মে চলে।
পরিবর্তন
পৃথিবী ও জীবন সবসময়ই পরিবর্তনশীল। এর বাইরে গিয়ে আসলে জীবনকে খুঁজে পাওয়া নিতান্তই শক্ত কাজ। যে বা যারা মানসিকভাবে ভীষণরকম মজবুত, তারা যেকোনো পরিবর্তনকে সাদরে জীবনের সওগাত হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। এতে তারা কখনোই কোনো ধরনের ভীতি বা হীনমন্যতায় ভোগেন না।
নিয়ন্ত্রণের ধারণা
এমন মানুষ নেহায়েত কম নয়, যারা কখনোই তাদের সক্ষমতা সম্পর্কে গভীর ধারণা রাখেন না। আমরা কি চাইলেই সবকিছু আমাদের পক্ষে নিয়ে আসতে পারি? ভেতর থেকে যারা প্রচণ্ড কৌশলী হয়, তারা খুব প্রবলভাবে বিশ্বাস করে, যা আমাদের হাতে আর নেই, তা নিয়ে শুধু শুধু ভাবার কোনো মানে হয় না।
না বনাম হ্যাঁ
সবচেয়ে ছোট দুটো কথা, তবে বিস্তর অর্থবোধ নিয়ে তাদের জন্ম। এদের ব্যবহারিক প্রতিফলনেও আমাদের সজাগ থাকতে হয় সবসময়। সবাইকে যেমন 'হ্যাঁ' বলা সম্ভব নয়, তেমনি সবাইকে 'না' বলার ক্ষেত্রেও ভাবতে হয় অনেক।
কিন্তু, মানসিকভাবে শক্তিশালী ব্যক্তি মূলত বিশ্বাস করে— পৃথিবীর সবাইকে খুশি করে চলা সম্ভব তো নয়ই, প্রয়োজনও নেই।
তাই, যখন ‘না’ বলা দরকার, তখন ‘না’ বলা, আর যখন ‘না’ এর বদৌলতে নেতিবাচক কিছু ঘটার আশঙ্কা থাকে, তখন তারা কৌশলে ‘না’ দিয়েই তা নিজেদের বাগে আনতে পারে।
ঝুঁকি
দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন মানুষ, ঝুঁকি নেবার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র দ্বিধাগ্রস্ত হন না। আবার তারা কখনোই হিসেবের খাতায় ঝুঁকি নিয়ে অংক কষতে বসেন না। বরং প্রতি মুহূর্তে ঝুঁকি থেকে পাওয়া, নানাবিধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে; পরবর্তী পদক্ষেপে আরও বেশি মজবুত হবার প্রয়াস খোঁজেন।
ঈর্ষাপরায়ণতা
নিজেদের সমস্ত কর্ম ভুলে, অনেকেই অন্যের সফলতায় ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে পড়েন। তবে, মানসিকভাবে যারা নিজেকে নিজের আয়ত্ত্বে রাখেন, তারা কখনোই অন্যের সফলতায় ঈর্ষান্বিত হন না। কারণ তারা জানেন, ঈর্ষা নয়; কঠোর পরিশ্রমই পারে সফলতার সব দুয়ার খুলে দিতে।
চটজলদি ফলাফল
ভালো যেকোনো কিছুই খুব সহজে হাতের দখলে আসে না। তার জন্য খাটতে হয়, বেচতে হয় ঘাম। দৃঢ়চিত্তের অধিকারী যারা, তারা সবসময়ই এমনটা স্মরণে রেখে পথ হাঁটেন। আসলে আজ কিছু করে, কালই তার ফলের আশা করা, দুশ্চিন্তা ছাড়া আর কোনোকিছুই দিতে সক্ষম নয়।
একাকিত্ব
একা থাকার মতো ব্যথাতুর কিছু বুঝি দুনিয়াতে আর নেই। কিন্তু, মানসিকভাবে যারা শক্ত, তারা কখনোই একাকিত্বে ভয় পান না। তাদের কাছে একাকিত্বের মানে আরও বেশি সৃজনশীল হবার সুযোগ, আরও বেশি নিজেকে জানার ফুরসত। তারা এমনটাও মনে করেন, অন্যের সাহচর্য মূলত উপরি পাওনা। আর নিজেকে নিজের সাথে রাখাটাই হচ্ছে মূলধন।
আবেগ কিংবা ইচ্ছা এসব কিছুই জীবনের অংশ। কিন্তু সব অংশে হাত রেখে আমরা পথ চলতে পারি না। কারণ, আমাদের হাত মোটে দু'টো। দু' হাতে তাই এমন বিষয়কে বেছে নেওয়া উচিত, যা সবসময়ই আমাদের মনোবলের পারদে ইতিবাচক হয়, আমাদের পথ চলায় গভীর সহায়ক হয়।
সঞ্জয় দত্ত ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।
sanjoydatta0001@gmail.com
