এসএসসি (তৎকালীন মেট্রিকুলেশন) পরিক্ষার্থী এক কিশোর। বয়স মাত্র ষোল বছর। ঠিক করলো আর লেখাপড়া করবে না। মেট্রিক পরীক্ষাটা হয়ে গেলে এরপর ব্যবসা শুরু করবে। তার বাবা চাইতেন ছেলে কষ্ট করে হলেও পড়ালেখা করুক। এজন্য যা করা দরকার করা যাবে৷ কিন্তু ছেলে ব্যবসা করবে- এটায় সমর্থন ছিলোনা তার।
কিন্তু ছেলেটি নাছোড়বান্দা। সে ঠিক করলো ব্যবসা করতেই হবে। মাথায় খেললো - একটা খাবারের হোটেল হলে মন্দ হয়না। তাই নিজের শখের রেডিওটা বিক্রি করে দেয় সে। আর বন্ধু-বান্ধবদের থেকে কিছু ধার করে। এভাবে পাওয়া টাকা থেকে হাজারদশেক টাকা দিয়ে শুরু করে দিলো নিজের ব্যবসা।
দোকানের নাম ‘মদিনা মিষ্টান্ন ভান্ডার।’ ৪৬ বছর আগের সেই তরুণ হলেন আজকের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ওয়াজির আহাম্মদ। দোকানটির অবস্থান লালবাগ রহমতউল্লাহ বয়েজ কলেজের বিপরীত দিকে।
সকাল ৬ টার দিক থেকে শুরু করে রাত ১১ টা পর্যন্ত চলে দোকানটি। সকালে পরোটার সাথে ডাল, সবজি-ভাজি পাওয়া যায়। হোটেলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই পরোটা আর ভাজি-ডালের জন্যই খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
কিছুটা পাতলা ও মুচমুচে হওয়ার ফলে পরোটা হতো অন্যান্য হোটেলের চেয়ে আলাদা। আর সবজির ক্ষেত্রে তিনি চার-পাঁচরকম সবজি মিক্স করে ব্যবহার করতে থাকেন। মসলার প্রয়োগে ছিল ভিন্নতা। ফলে তাদের সবজির কথা খুব দ্রুতই লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে।
এভাবে দোকান আস্তে আস্তে লোকের ভিড়ে ভরে যেতে থাকে। তবে দামি চেয়ার-টেবিল দিয়ে একে অভিজাত রূপ দেবার চেষ্টা করেননি তিনি। এখানে রয়েছে বৈঠকী ধরনে রাখা কাঠের চেয়ার-টেবিল। অনেকটা মধ্যবিত্ত বাড়ির ড্রয়িংরূমের মতো। লোকজন খেতে আসে, এখানে বসে বাড়ির ড্রইংরুমের একটা স্বাদ পায়। পাশাপাশি গল্প করেও আরাম পেতে পারেন তারা। 
মজার ব্যাপার হলো, আজ যেসব মিষ্টির কারণে হোটেলটি এত বিখ্যাত, দুর-দুরান্ত থেকে মানুষ আসেন এই হোটেলে খেতে ; সেসব মিষ্টিই কিন্তু শুরুতে ছিল না। ওয়াজির বললেন, "পুরান ঢাকার মানুষ মিষ্টি পছন্দ করে। পরোটার সাথে লোকজন মিষ্টি চাইত৷ ভাবলাম অন্য কোনো দোকানের সাথে কন্ট্র্যাক্টে না গিয়ে নিজেই শুরু করি।”
বগুড়া, কুমিল্লা, যশোরের এমন কয়েকজন লোক আনিয়েছিলেন তিনি। তবে দেখেন এখানে তাদের মন টেকেনি। তারা যে পরিবেশে বড় হয়েছেন, মিষ্টি বানিয়েছেন; ভিন্ন পরিবেশে গিয়ে সেটা ওভাবে হয়ে উঠছিল না। তখন নিজের বুদ্ধি থেকেই শুরু করলেন মিষ্টি বানানো।
হোটেলের সবচেয়ে বিখ্যাত আইটেম কাশ্মীরি হালুয়া৷ এখানে কিছু পরিমাণ ঘি ব্যবহারও করা হয়ে থাকে। নানারকম মসলার প্রয়োগ আছে এতে। আর আছে লাল-সবুজ রঙের জেলি। সিঙ্গেল প্লেট ষাট টাকা করে রাখা হয়৷
জাফরানি ভোগ তাদের আরেকটি বিখ্যাত মিষ্টি। ঘন দুধের তৈরি রস থাকে মিষ্টিটির সাথে। সেখানে মিশে থাকে জাফরানি সুবাস। হলুদাভ কমলা বর্ণের মিষ্টির উপরে অল্প করে দেয়া হয় দুধের সর। প্রতি পিসের দাম ৬৫ টাকা।
তাদের আরেকটি বিখ্যাত আইটেম মালাই চপ। উপরে দেয়া থাকে বিভিন্নরকম বাদাম। এই মিষ্টির৷ রসটা বেশ ঘন করা হয়। বারংবার জ্বাল দেয়ার ফলে এর ঘন রস ও নরম সুন্দর স্বাদ পরোটার সাথে স্বাদের খুব ভালো মিশেল তৈরি করতে পারে।
এছাড়া আছে ঘন দই, কালো জাম, রসগোল্লাসহ আরো বিভিন্ন মিষ্টান্ন।
বিশেষ একরকম হালুয়াও আছে তাদের- নাম 'মাস্কট হালুয়া।' এটির প্রতি পিস মাত্র ২০ টাকা করে। চমৎকার লালবর্ণের এই হালুয়াকে প্রথম দেখায় গাজরের হালুয়া বলে মনে হতে পারে। তবে দোকান দেখার দায়িত্বে থাকা স্বপন বললেন, "এটা আলাদা। গাজরের হালুয়া নয়। রেসিপিটা সিক্রেট, আমরা বলতে চাইনা। তবে হালুয়াটা মুখে দিয়ে দেখেন। অনেক নরম। ভালো লাগবে।"
প্রতিদিন দুর-দুরান্ত থেকে প্রচুর মানুষ আসেন তাদের মিষ্টির স্বাদ নিতে৷ স্থানীয় অনেকের বৈকালিক বা সান্ধ্য আড্ডার নিয়মিত স্থান এই দোকান। পুরির সাথে মিষ্টি আর গরুর দুধ দিয়ে বানানো চমৎকার চা-র সাথে জমে ওঠে আড্ডা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্যও প্রতিদিন প্রচুর অর্ডার পান তারা।
ওয়াজির আহাম্মদ আজ থেকে ছেচল্লিশ বছর আগে যে স্বপ্ন নিয়ে তার দোকান শুরু করেছিলেন, সময়ের পরিক্রমায় আজ তা বাস্তব৷ তিনি মনে করেন, ব্যবসা ঠিক রাখতে গেলে কর্মীবান্ধব হওয়া দরকার। করোনার সময়েও তিনি কর্মীদের ছাঁটাই করেননি। বেতন ঠিকভাবে দিতে চেষ্টা করেছেন৷
আর কর্মীরাও নিজেদের সেরাটা দিয়ে কাজ করছে সবসময়। তাই এতদিন পরও খাবারের মান ধরে রাখতে পেরেছেন তারা। আলুপুরি বা ডালপুরিতেও তারা আলু বা ডাল ঠিকমতো দেন। এক্ষেত্রে ক্রেতাদের সাথে প্রতারণায় নেই তিনি।
আর তাই প্রতিষ্ঠার ছেচল্লিশ বছর পরও ক্রেতাদের কাছে আস্থার এক নাম হয়ে রয়েছে মদিনা মিষ্টান্ন ভান্ডার।
মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
mahmudnewaz939@gmail.com
