জীবনমঞ্চে বক্তা বা শ্রোতা হতে হতে, কখনো কখনো কৃত্রিম মঞ্চেও মাইক্রোফোন হাতে দু'টো কথা বলার ফুরসত আমরা পাই। তখন কেউ কেউ রীতিমতো বনে যায় দর্শকপ্রিয় বক্তা, আর কেউ কেউ হয়তো তার চমৎকার কথাগুলো ভেতর থেকে বাইরে আনতে ব্যর্থ হয়। কথা থেকেও তা উপস্থাপন করতে না পারার এ অসহায়ত্ব সত্যিই কষ্টকর এক অনুভূতি। কিন্তু, তা কাটিয়ে ওঠা মোটেও বিরাট কোনো দুঃসাধ্য কর্ম নয়। বরং, নিত্য-নৈমিত্তিক কিছু অভ্যাস বা মনোযোগী স্বভাবে, খুব সহজেই মুশকিল আসান সম্ভব।
আমরা আমাদের আজকের লেখার মাধ্যমে মঞ্চভীতি কাটানোর কিছু উপায় বলে এই নাছোড়বান্দা সমস্যাটি সমাধানে আপনাদের পাশে থাকতে চাই।
আমরা মূলত জীবনের বেশিরভাগ সময়ই পরিবার,বন্ধু বা কাছের লোকেদের সাথে বেশি কাটাই। কিন্তু খেয়াল করে দেখা যায়, আমরা আমাদের ব্যক্তিগত যেকোনো ভীতির ব্যাপারে খুব সহজেই তাদের বলতে পারি না। এর অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি হতে পারে, 'ওরা কী ভাববে' গোছের ভাবনা। কিন্তু কাছের লোক যদি কিছু একটা ভেবেও বসে, তা নিশ্চয়ই অপরিচিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ কারোর কিছু একটা ভাবার চাইতে উত্তম?
আর তাইতো, মঞ্চভীতি কাটিয়ে ওঠতে, অবশ্যই পরিবার বা বন্ধুর সাথে ব্যাপারটি ভাগ করা দরকার। যথাসাধ্য সাহায্য নেয়া দরকার তাদের কাছ থেকে। এবং, প্রস্তুতির প্রাথমিক শুরু ওদের সাথে ঘটলে খুব সহজেই নিজেকে আত্মবিশ্বাসী হিসেবে ভাবা যায়। প্রস্তুতির ধরন হয়তো ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। তবে সর্বজনীন হিসেবে বলতে গেলে, যেকোনো একটি বিষয়ের উপর পরিবার সম্মুখে অথবা বন্ধুমহলে কথা বলার চর্চা, মঞ্চভীতি কাটিয়ে ওঠায় খুব ভালো সহায়ক হয়।
প্রায় প্রতিটি শহর কিংবা গ্রামে, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংগঠন হরহামেশাই চোখে পড়ে। যেখানে বহু ছেলেমেয়ে একত্রে বিভিন্ন ইতিবাচক কাজ করে। মঞ্চভীতি কাটাতে এই সংগঠনগুলো যে কারো জীবনে দারুণ ভূমিকা রাখে। কারণ, সংগঠনভিত্তিক বিভিন্ন কাজের প্রয়োজনে বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে মিশতে হয়। ফলে, ধীরে ধীরে আমাদের হীনম্মন্যতা বা কথা বলার ক্ষেত্রে যে ভীতি কাজ করত, তা ক্রমশ সঠিক হতে থাকে।
আধুনিক জামানায় মুঠোফোনের কদর বাড়ছে বৈ কমছে না। এই বাড়বাড়ন্ত বস্তুটিকে মঞ্চভীতি কাটাতেও ব্যবহার করা যায়। যেকোনো বিষয়ে কথা বলার সময় তা ফোনে ভিডিও করে পরে নিজেই নিজের ত্রুটিগুলো সংশোধনে কাজ করতে পারি।
ভীতি সৃষ্টির সব কারণ কখনোই হয়তো এক নয়। তবে যে বিষয়টি প্রায় সব মানুষের মধ্যেই ভীতির উদ্রেক ঘটায়, আর তা হলো- পর্যাপ্ত জানার অভাব। কেউ যখন কোনো বিষয়ে কিছু একটা বলতে যায়, তখন সে বিষয়ে যথেষ্ট জানা থাকলে; কখনোই তা ভীতিকর কোনো মুহূর্তের জন্ম দেয় না।
তাই, বেশি বেশি জ্ঞান আহরণ করা আর তা সময়মতো প্রয়োগে চৌকস হওয়ার চেষ্টা, আমাদের মঞ্চভীতি কাটিয়ে তুলতে দারুণ সহায়তা করে।
এতক্ষণ মঞ্চে দাঁড়ানোর পূর্বভীতি নিয়ে আলাপ হলো। কিন্তু, আমরা অনেকেই মঞ্চে ওঠার পর আত্মবিশ্বাস খুইয়ে ফেলি, কিংবা, উপস্থাপনে সাবলীল হতে পারি না। এ নিয়ে কিছু না বললেই নয়।
একটি মজার বিষয় হচ্ছে, মঞ্চে যাবার প্রাক্কালে, আমরা হয়তো ভরপেট হয়ে নিজেকে প্রস্তুত করি বা করতে চাই। ভাবি, পেটপুরে খাওয়া-দাওয়া বুঝি আমাদের কথা বলায় আরও বেশি শক্তি যোগাবে। আদতে তার উল্টোটাই ঘটে। এরচেয়ে বরং মঞ্চে স্বস্তি আনয়নে হালকা খাদ্য, যেমন: কলা, লেবুর শরবত ইত্যাদি গ্রহণ খুব ভালো কাজ করে। আবার, কেউ কেউ মঞ্চে যাবার আগে খুব বেশি ক্যাফেইন জাতীয় খাদ্য গ্রহণ করে, যা কিনা মঞ্চে বক্তাকে আরও বেশি বেকায়দায় ফেলে দিতে পারে।
যেকোনো কিছু ভালোভাবে সম্পাদনে আমাদের ইতিবাচক মানসিক অবস্থা একটি অন্যতম উপাদান। মঞ্চে যাবার দিনে তাই, নিজেকে যতটা পারা যায় হাস্যোজ্জ্বল রাখা উচিত। বিভিন্ন মজার মজার হাস্যকর ভিডিও বা আনন্দদায়ক যেকোনো কিছু দেখে আমরা চাইলেই খুব সহজে আমোদে ডুব দিতে পারি।
কথা বলতে বলতে হয়তো আমরা অনেকসময় নিজেদের তৈরি স্ক্রিপ্টের কোনো একটি বাক্য স্মরণে আনতে পারি না। ফলে, থেমে যাই বা নিজেদের মনে না আনতে পারার ব্যাপারটি অদ্ভুত কিছু কর্ম দ্বারা শ্রোতা মহলে জ্ঞাত করি। বিষয়টি মোটেও একজন চৌকস বক্তার লক্ষণ নয়। আপনার স্ক্রিপ্ট তো আর শ্রোতাদের সবাই দেখেনি,তাই যদি কোনো একটা বাক্য বাদ পড়েও যায়, থেমে যাবেন না। বরং সেটুকু সামলে নিয়ে সামনে এগোতে থাকুন।
এমন অনেকেই আছে, যারা মঞ্চে দাঁড়ানোর পরপরই খুব দ্রুতগতিতে কথা বলতে শুরু করে। এতে ভীতি বাড়ে বৈ কমে না। তাই, মঞ্চে উঠে, ধীরস্থির কায়দায় বক্তব্য প্রদান করা ভালো। এতে আপনার পরিশ্রমও যেমন কম হয়, তেমনি ভেতরের ভয়টাও শ্রোতামহলে প্রকাশ পায় না।
অন্যদিকে, অনেকসময় আমরা অন্যকে অনুকরণ করতে গিয়ে নিজেদের মৌলিকত্ব নষ্ট করে ফেলি। এতে জন্ম নেয় আরো অস্বস্তি। কারণ, আপনি যখন আপনি না হয়ে অন্য কেউ হতে চাইবেন, তখন সে চেষ্টা মূলত ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই দিতে সক্ষম নয়। আর এর প্রভাব আপনার মঞ্চ বক্তব্যেও বেশ নেতিবাচক হয়।
উপরিউক্ত কৌশল ছাড়াও, আরামদায়ক পোশাক পরিধান ও দর্শকদের সাথে প্রশ্ন বিনিময় ইত্যাদি ব্যাপারগুলো মঞ্চভীতি কাটিয়ে তুলতে অত্যন্ত সাহায্য করে। প্রস্তুতি আর চর্চা ছাড়া কোনোকিছুই সহজলভ্য হয় না, তাই, ভীতি জয় কিংবা নিজেকে জয়- সবটুকুতেই দরকার একরোখাভাবে লেগে থাকা।
আপনার মঞ্চযাত্রা স্বস্তি ও করতালিময় হোক!
সঞ্জয় দত্ত বর্তমানে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।
sanjoydatta0001@gmail.com
