পাহাড় ও সমুদ্রে ঘেরা হাওয়াই দেখে মুগ্ধ হয়েছেন তিনি। সন্ধান পেয়েছেন প্রকৃতির চিরচেনা রূপের।
ক্যামেরা হাতে সিজারের মতো দাপিয়ে বেড়িয়েছেন ইতালির রোমে। গিয়েছেন, মুসলিমদের সোনালী ইতিহাসের রাজ্য এনাতোলিয়ায়।
তিনি দেখেছেন কলকাতা শহর। মান্নাদের সুরে কফি হাউজের সেই আড্ডাটায় ক্যামেরা বন্দি করেছেন লাল ইট ও হলুদ ট্যাক্সির কলকাতাকে।
আর ঘুড়ে বেড়িয়েছেন ৪০০ বছরের জোওয়ান শহর ঢাকায়, যার সর্পিল রাস্তার আনাচে-কানাচে লেগে আছে মুঘল, ফ্রেঞ্চ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাহী সুবাস।
যার কথা বলা হচ্ছে, তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত ট্রাভেল ভ্লগার নাদির অন দ্য গো। দেশ-বিদেশ দাপিয়ে বেড়ানো নাদিরের চোখে বাইরের পর্যটন খাতের সাথে স্বদেশের পার্থক্য দেখার চেষ্টা করেছেন লেখক।
যানবাহন ও যোগাযোগ
ভ্রমণ ও ভ্লগিংয়ের জন্য রাস্তা ও পরিবহন ব্যবস্থা ভালো থাকা চাই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পর্যটন শিল্পের দিকে নজর দিয়ে পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করার চেষ্টা করে।
তবে নাদির একজন অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী ভ্লগার। পাহাড়, জঙ্গল ও সমুদ্রের প্রতিকূলতায় তিনি আনন্দ পান।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "আমি বরাবরই প্রতিকূলতার মাঝে ভ্রমণ করতে পছন্দ করি। কাজেই বলতে পারি, যে বিশ্বের সব জায়গায় মোটামুটি একই রকম। আমি দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গিয়েছি। বাংলাদেশ কোনো অংশে ওদের থেকে কম বা বেশি নয় বরং একই।"
"তবে আমার বন্ধুদের অভিজ্ঞতা শুনে এটুকু বলতে পারি, যারা বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থার সাথে অভ্যস্ত নয়, তাদের জন্য এখানে ভ্রমণ করা কিছুটা কষ্টসাধ্য।"
প্রসঙ্গ: খাবার
বাংলাদেশে ভ্রমণের জন্য মোক্ষম সময় শীতকাল। এই সময়ে হোটেল ও রেস্তোরাঁ গুলোতে থাকে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। তাই স্বভাবতই খাবারে দাম থাকে আকাশে। নাদিরের কাছে জানা গেল, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ব্যাপারটি একই।
"বিশ্বের যেকোন পর্যটন স্থান গুলোতে খাবারের দাম থাকে চড়া। যদিও খাবারে আমি এতো খরচ করি না," বলেন, নাদির।
ছবি: নাদির অন দ্য গো অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত।
দেশ-বিদেশের প্রকৃতির পাশাপাশি খাবারের স্বাদও ভরপুর নিয়েছেন এই তরুণ মার্কো পোলো। জর্জিয়ার পনির-রুটি ও তুর্কির কাবাব চেখে দেখেছেন তিনি। এসেছেন ঢাকার স্ট্রিট ফুডের তীর্থ স্থান টিএসসিতেও।
স্ট্রিট ফুডের সাথে স্বাস্থ্য জড়িত। নাদির মনে করেন পরিচ্ছন্ন খাবার নির্ভর করে হোটেল বা রেস্তোরাঁ কতটা গোছানো তার উপর।
"স্টকহোমের মতো জায়গায় আমার খাবার কীভাবে তৈরি করা হচ্ছে তা দেখার প্রয়োজন হয় না। তবে বাংলাদেশ-ভারত কিংবা তুর্কিতে আমাদের একটু সতর্ক থাকা উচিৎ, বিশেষ করে যদি তা স্ট্রিট ফুড হয়।"
ভ্রমণ, ভ্লগিং ও নিরাপত্তা
ভ্লগিং করার সময় নিরাপত্তার বিষয়টিকে খুব কাছে থেকেই পর্যবেক্ষণ করেছেন নাদির। তবে উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেই নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করেন না তিনি। তার মতে নিরাপত্তার জন্য আয়ের অসামঞ্জস্যতা সহ সংস্কৃতি, দারিদ্র্য, আরো অনেক কিছু দায়ী।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "আমি আইসল্যান্ড অথবা বলকান অঞ্চলের ডজনখানেক দেশের কথা ভাবতে পারি যেখানে একজন যুবক হিসেবে আমি খুব নিরাপদে ভ্রমণ করতে পেরেছি। কাজেই আমি মনে করি না নিরাপত্তা ব্যবস্থাই মূল।
বিদেশি অতিথিদের সাথে মানুষের আচরণের পরম্পরা, দারিদ্রতা ও অসামঞ্জস্য আয় এসব নিরাপত্তার জন্য আরো বেশি দায়ী।"
বাংলাদেশে ভ্রমণ করতে এসে অনেক সময় বিদেশিরা হেনস্তার শিকার হয়েছেন। সেন্ট মার্টিনগামী লঞ্চে এরকমই একটি ঘটনায় শাস্তিও পায় কয়েকজন।
বাংলাদেশ কোনদিকে আলাদা?
হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের উপর কয়েকটি এপিসোড করেছেন নাদির। তার মতে পৃথিবীর সুন্দরতম জায়গা গুলোর মধ্যে একটি হাওয়াই। তবে তার চোখেও বাংলাদেশ অনন্য। তার মতে বাংলাদেশ নিঃশ্বাস নেয় মানুষের আপন করে নেয়ার সংস্কৃতির মাধ্যমে।
"আমি মনে করি এই বিষয়ে বই লিখেও আমি প্রশ্নটির যথার্থ উত্তর দিতে পারবো না। যদি একটি বিষয়ের কথা বলতে হয় তবে আমি বলবো আমরা ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ এবং এ বিষয়টি আমাদের সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে।"
বাংলাদেশের বিশেষত্ব নিয়ে তিনি আরো বলেন, "আমাদের সমাজে মানুষ সরাসরি কথা বলতেই সচ্ছন্দ্য বোধ করে। পশ্চিমা দেশ গুলোর তুলনায় নিত্যদিন আমরা অনেক মানুষের সাথে দেখা করি, মিশি।"
আর এ কারণেই হয়তো বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ভ্রমণকারী সহজেই খুঁজে পেতে পারেন একজন কৌতূহলী কথা বলার সঙ্গী।
পর্যটন শিল্প ও বাংলাদেশের অবস্থান
বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে ২০১৯ পর্যন্ত পর্যটন খাত থেকে বাংলাদেশের আয় ছিল ৩৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। উপমহাদেশের ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলংকা সবগুলো রাষ্ট্র থেকেই পিছিয়ে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ এই খাতে পিছিয়ে আছে এটিই বর্তমান বাস্তবতা বলে স্বীকার করেন নাদির। তবে তিনি বিশ্বাস করেন বাংলাদেশের এই খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে এবং প্রচুর কাজ করার বাকি আছে।
প্রথমত তিনি প্রচারণার কথা বলেছেন। বাংলাদেশের উচিৎ পর্যটন স্পটগুলোকে বিশ্ববাসীর নিকট তুলে ধরা।

ছবি: নাদির অন দ্য গো অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত।
তিনি বলেন, "এখন পর্যন্ত যেসব বিদেশিদের আমি চিনি, যারা বাংলাদেশে এসেছেন তারা পরিকল্পনা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন। তবে বৃহত্তর পর্যটক গোষ্ঠীকে আকর্ষণ করার জন্য বাংলাদেশকে অবশ্যই পর্যটনীয় স্থানগুলোর সাথে বহির্বিশ্বের পরিচয় করাতে হবে, এই খাতে আরো বিনিয়োগ করতে হবে। সেটি গতানুগতিক ভাবেই হোক অথবা ট্রাভেল ভ্লগারদের আমন্ত্রণ করে।"
দ্বিতীয়ত তিনি মনে করেন যারা তার মতো অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী নয়, তাদের জন্য পুরো দেশটি সহজে ঘুরে দেখার ব্যবস্থা করতে হবে।
"আমি মনে করি যারা আরাম করে ভ্রমণ করতে চায়, তাদের জন্যও নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ ভ্রমণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।"
বাংলাদেশ ও ভারতে ভ্লগিং করা বেশ কষ্টসাধ্য কাজ বলে মনে করেন নাদির। পর্যটন কেন্দ্রগুলোর নিয়ম কানুনকে এজন্য দায়ী করেন তিনি।
"পর্যটন কেন্দ্রগুলো মান্ধাতা আমলের নিয়মে চলে। এসব স্থানে ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ নিষেধ তবে মোবাইল নিয়ে যাওয়া যায় যা ক্যামেরার চেয়েও শক্তিশালী।"
কলকাতা শহরের ভিডিওতে ফোর্ট উইলিয়াম দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন নাদির। তবে তা করতে পারেননি কারণ সেখানে পর্যটকদের প্রবেশ নিষেধ। ঢাকাতেও এরকম অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে প্রবেশাধিকার থাকলেও ভিডিও বা ছবি তোলা নিষিদ্ধ।
এছাড়াও তিনি মনে করেন, "এসব সমস্যা ছাড়াও নিরাপত্তা একটি বড় সমস্যা। কাজেই ব্যয়বহুল ইলেকট্রনিক ক্যামেরা নিয়ে ভিডিও করতে বের হওয়া নিয়ে আমি প্রায়ই দ্বিধায় থাকি।"
শুধু নাদিরের মতে নয়, বাংলাদেশে পর্যটন খাতে এই চিত্র যেকোনো পর্যটকই স্বীকার করবেন।
তবে প্রতিকূলতার মাঝেও এখানে ভ্লগিং করে আনন্দ পেয়েছেন নাদির। তিনি সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ পান এখানে যা বিদেশে তেমন সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, "সমস্যার অপরদিকে আমি মনে করি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ খুবই বন্ধুভাবাপন্ন। দেশের যেখানেই গিয়েছি সাধারণ মানুষের সাথে আমার কথোপকথন রেকর্ড করতে পেরেছি যা পৃথিবীর অন্য কোথাও বিরল।"
একটি রাষ্ট্র পর্যটন-বান্ধব কীভাবে হবে?
নিরাপত্তা, উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা ও সহজে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করার মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রকে পর্যটন-বান্ধব করা যেতে পারে বলে মনে করেন নাদির।
"এক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। তবে পর্যটক যারা আঞ্চলিক ভাষা বোঝে না, তাদের জন্য হালনাগাদ প্রয়োজনীয় তথ্য থাকা অত্যাবশ্যক। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।"
বিভিন্ন দেশের বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানা নাদিরকে ভ্রমণে অনুপ্রেরণা যোগায়। এটি মূলত একটি দেশকে পর্যটন বান্ধব এবং দেশের পর্যটন শিল্পকে জনপ্রিয় করার প্রধান মাধ্যমও বটে।
বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্য যথেষ্ট শক্তিশালী, বৈচিত্র্যময় এবং সমৃদ্ধ। এসব প্রচারের অভাবে বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না।
"আমি উৎসাহ অনুভব করি নিত্য নতুন জায়গায় ভ্রমণ করতে যেখানে আমি তাদের ভাষা বলি না। ভ্রমণ করে, নতুন সংস্কৃতি সম্পর্কে জেনে আমি যে আনন্দ পাই তা আর কোনো অভিজ্ঞতা থেকে পাই না এবং এটিই আমাকে ভ্রমণে অনুপ্রাণিত করে।"
ভ্রমণ ব্যাপারটাই তো এরকম। নতুনের সন্ধান, অজানায় হারাবার নেশা। প্রতিটা ভ্রমণপ্রেমীরই থাকে সে নেশা, যার মাঝে জীবনের স্বাদ আস্বাদান করেন তারা।
মাওইতে সার্ফিং করতে গিয়ে প্রায় ৯০ সেকেন্ড ডুবন্ত অবস্থায় ছিলেন নাদির। দুর্ঘটনা ঘটতেও পারতো, কিন্তু তাতেও কোনো আফসোস হতো না নাদিরের।
"কাল যদি আমি মারা যেতাম, আমার মনে হয় না জীবন নিয়ে আমার কোনো আফসোস থাকতো," এর মাঝেই নাদিরের অনুপ্রেরণা ও জীবনবোধ এসে মিলেছে।
mohd.imranasifkhan@gmail.com