একের পর এক অসঙ্গতির পর অবশেষে ই-কমার্সের কার্যনির্বাহী কমিটি তাদের প্রতারক সদস্যদের বিরুদ্ধে শস্তিমুলক ব্যাবস্থা নিয়েছে। কিছু ক্রেতা প্রতারণার অভিযোগ আনার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় সংগঠনটি।
১,৬০০ সদস্যের সংগঠন ই-ক্যাব চারটি ই-কমার্স কোম্পানির সদস্যপদ স্থগিত করেছে এবং ভোক্তা প্রতারণার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আরও ১২টির বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে।
সদস্যপদ স্থগিত হওয়া স্থায়ী সদস্যরা হচ্ছেঃ ই-অরেঞ্জ লিমিটেড, ২৪টিকেটি ডটকম, গ্রিনবাংলা ই-কমার্স লিমিটেড এবং এক্সিলেন্ট ওয়ার্ল্ড অ্যাগ্রো ফুড অ্যান্ড কনজিউমারস লিমিটেড।
ই-ক্যাবের সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পর্যবেক্ষণে থাকা ১৬টি ই-কমার্স ব্যবসার মধ্যে তিনটির বিরুদ্ধে অভিযোগ তেমন গুরুতর নয়, আর একটির অভিযোগ সন্তোষজনক উত্তর দেবার পরিপ্রেক্ষিতে সমাধান করা হয়েছে।
যাচাই-বাছাই করা আরও নয়টি কোম্পানি হলো- ইভ্যালি ডটকম লিমিটেড, গ্লিটার্স আরএসটি ওয়ার্ল্ড, অ্যানেক্স ওয়ার্ল্ডওয়াইড লিমিটেড, আমার বাজার লিমিটেড, আলেশা মার্ট, ফাল্গুনী শপ ডটকম, ধামাকা শপিং, আদিয়ান মার্ট এবং সিরাজগঞ্জ শপ।
ই-ক্যাবের জেনারেল ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম শোভন বলেন, অ্যাসোসিয়েশন তাদের কার্যক্রমে অনিয়ম ধরা পড়ার পর সদস্যপদ স্থগিত করেছে।
তিনি বলেন, "২১ আগস্ট আমরা ভোক্তাদের অভিযোগ, ডিজিটাল বাণিজ্য নির্দেশিকা না মানা এবং এটি পরিবর্তনের পরে মালিকানার তথ্যের অভাবের কারণে 'ই-অরেঞ্জ'-এর সদস্যপদ স্থগিত করেছি।”
সাম্প্রতিক সময়ে, ই-অরেঞ্জ, ইভ্যালি এবং আলেশা মার্টের মতো ই-কমার্স প্লাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এই অন্যায়গুলো খুঁজে বের করতে কাজ করছে।
এদিকে, ই-ক্যাব বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, ১৬টি ই-কমার্স ব্যবসার মধ্যে নয়টি অভিযোগ নিষ্পত্তি ও ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা-২০২১ মেনে চলার প্রতিশ্রুতিসহ সময় চেয়ে নোটিশের জবাব দিয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শমি কায়সার এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওয়াহেদ তমাল স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "সেই নয়টি কোম্পানি আরও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সমিতির তত্ত্বাবধানে রয়েছে। কোনো সন্তোষজনক সমাধান না পেলে অ্যাসোসিয়েশন তাদের সদস্যপদও স্থগিত করতে পারে।"
কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো হচ্ছে- আর্থিক আত্মসাৎ, ভোক্তা বা বিক্রেতাদের অভিযোগের সমাধান না করা, ই-ক্যাব শোকেস বা সতর্কীকরণ নোটিশের জবাব না দেওয়া, ই-ক্যাব অভিযোগের সমাধান না করা, 'ডিজিটাল কমার্স গাইডলাইন-২০২১' না মেনে চলা, এবং এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা ইত্যাদি।
ভোক্তাদেরকে ই-কমার্স ব্যবসার অস্বাভাবিক অফার সম্পর্কে সতর্ক থাকার এবং ডিজিটাল কমার্স গাইডলাইন না মেনে তাদের কাছ থেকে ক্রয় না করার আহ্বান জানিয়েছে ই-ক্যাব। এছাড়া, ভোক্তারা কোনো ই-কমার্স ব্যবসার দ্বারা প্রতারিত বোধ করলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কাছে অভিযোগ জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশনটি ইতোমধ্যেই তাদের সকল সদস্যের সঠিক ব্যবসায়িক নিয়ম মেনে চলার এবং নতুন ব্যবসা করার ক্ষেত্রে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়াও তারা ক্রেতাদের অস্বাভাবিক অফার প্রদান বন্ধ করা, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা, ব্যাংক আমানতের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ না করা এবং ব্যবসার বিদ্যমান নিয়ম অনুসরণ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।
"ভুয়া ও বানোয়াট তথ্যের মাধ্যমে সমিতির বিরুদ্ধে অপপ্রচার" হলে তারা আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে বলে জানায় ই-ক্যাব।
এদিকে, ভ্যাট গোয়েন্দারা প্রকৃত বিক্রয় তথ্য গোপনের মাধ্যমে অনলাইন শপিং কোম্পানি ই-অরেঞ্জের ১৩ লক্ষ টাকার ফাকি সনাক্ত করেছে। গুলশান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীনে ভ্যাট অডিট, গোয়েন্দা ও তদন্ত শাখা এই ফাকি শনাক্ত করে। সংস্থাটি ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ পাওয়ার পর কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইন-২০১২ এর অধীনে একটি মামলা দায়ের করে।
রাজধানীর গুলশান-১ এ অবস্থিত সংগঠনটি বিআইএন-০০৩৬২৮০২৭-০১০১ অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত কমিশনে সঠিক ভ্যাট জমা দেওয়া থেকে বিরত ছিল বলে অভিযোগ করা হয়।
২০২১ সালের ৮ জুন, উপ-পরিচালক তানভীর আহমেদের নেতৃত্বে একটি ভ্যাট গোয়েন্দা দল "কর ফাঁকির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ" অনুসরণ করে সংগঠনটির তদন্ত করে।
দলটি কোম্পানি অ্যাকাউন্টের নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করে যাতে দেখা যায়, কোম্পানিটি তাদের প্রদেয় ১৯ লক্ষ টাকার বিপরীতে ভ্যাট হিসাবে ৬ লক্ষ টাকা দিয়েছে। একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে কোম্পানিটি ২৪৫ কোটি টাকার পণ্য কিনেছে এবং ২৪৯ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। এতে তারা ৩৮ লক্ষ টাকার কমিশন পেয়েছে যাতে ৫.০ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, "সংস্থাটি প্রকৃত বিক্রয় তথ্য গোপন করেছে"। ফাকি দেয়া অর্থ আদায় এবং পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জন্য ভ্যাট গোয়েন্দা মামলাটি ঢাকা উত্তর ভ্যাট জোনের কাছে হস্তান্তর করেছে।
বিভিন্ন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মন্তব্যের জন্য ই-অরেঞ্জের মুখপাত্রের সাথে যোগাযোগ করা যায়নি।
