ঈদ মানে আনন্দ। সে আনন্দ ভাগাভাগি করতে শহর থেকে গ্রামে, কিংবা গ্রাম থেকে শহরে ছুটে যায় মানুষ। আনন্দটা পরিপূর্ণ হয় যখন তা পরিবারের সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়। ঈদের আগে কেনাকাটা, ঈদের দিনের খাবার, ঈদের নামাজ, বন্ধু বা পরিবারের সাথে ঘুরাঘুরি - এই সব মিলিয়ে ঈদ হয়ে উঠে উৎসবমুখর।
কিন্তু যারা পড়াশোনা বা কাজের জন্য ভিনদেশে থাকেন তাদের কাছে পরিবার ছাড়া ঈদ এক ভিন্ন অনুভূতির নাম। পরিবার আর বন্ধুদের ছাড়া ঈদ যেন তাদের কাছে আনন্দ-বেদনায় মিশ্রিত একটা দিন।
পড়াশোনার প্রয়োজনে তিন বছর ধরে সৌদি আরবে থাকেন আবু তাহের। বৃত্তি নিয়ে দেশটির মদিনার তাইবাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে স্নাতকে পড়ছেন তিনি। তাহেরের কাছে পরিবার ছাড়া ভিনদেশে ঈদ এক কষ্টের অনুভূতির নাম। তাঁর ভাষায়, নিজের দেশে যখন ঈদ আসে সেটাকে কেন্দ্র করে কেনাকাটা করার যে আমেজ তা এখানে আমরা কল্পনাও করতে পারি না। শুধু অপেক্ষায় থাকি কখন প্রিয় মানুষগুলোর হাসি মাখা মুখগুলো দেখবো।
দেশ থেকে যখন ঈদের সকালে পরিবার থেকে ফোন আসে, সবাই জানতে চায় কি রান্না করেছি। তখন উত্তর দেইঃ এই তো মা, এখন নামাজ পড়ে আসলাম। গোশত আছে, পোলাও রান্না করবো। সেমাই রান্না করেছি, আবার খিচুড়ি রান্না করবো। এত আয়োজন থাকুক বা না থাকুক, পরিবারকে খুশি করার জন্য হলেও একটু বাড়িয়ে বলি। বিশেষ করে মায়ের চোখের কোণে যখন দেখি অশ্রু ঝলমল করছে তখন নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনা, বলেন তাহের।
তবে সৌদি আরবে ঈদ করার একটা তৃপ্তি তাহেরের আছে। মুসলমানদের পবিত্র স্থান মসজিদে নববীতে ঈদের জামাত আদায় করার তৃপ্তি। এখানে তাহেরের কাছে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয় মসজিদে নববীতে ঈদের জামাত আদায় করতে পারেন বলে।
তবে কষ্টও করতে হয় সেই জন্য। রাত ১২ টা বা ১টা থেকে গিয়ে গেটের বাহিরে অপেক্ষা করতে হয়। রাত দুইটা-আড়াইটার দিকে গেইট খুলে দিলে মানুষ হুমড়ি খেয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। সেখানেই তাহাজ্জুদ, ফজরের জামাতের পরে ঈদের সালাত আদায় করেন তিনি।
ওমানের আল বাতিনাহ এলাকায় থাকেন কুমিল্লার রকিবুল হাসান আসিফ। সেখানে চাচার দোকান দেখেন তিনি৷ দেশ থেকে দূরে পরিবার ছাড়া ঈদ আর দেশের ঈদ, তাঁর কাছে পুরোটাই আলাদা। তিনি বলেন, দেশের ঈদের সাথে বিদেশের ঈদে বিস্তর ফারাক। এখানের ঈদে কোনো আবেগ খুঁজে পাই না৷ গ্রামের, বাড়ির মানুষদের মনে পড়ে।
বিশেষ করে ছোটবেলা থেকে ঈদের দিন নিয়ে তার অন্যতম একটা স্মৃতি ছিল, দাদীকে সালাম করে সেলামি নেওয়া৷ গত বছর করোনার মধ্যে তার দাদী মারা যান। করোনার ঝুঁকিতে দেশে ফিরতে পারেননি তিনি৷ পুরো রোজাটাই দাদীকে মনে করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের আর্কানসাসে থাকেন মাহমুদা রহমান। ঈউনিভার্সিটি অব আর্কানসাসে পড়ছেন ও শিক্ষক সহকারি হিসেবে কাজ করেন তিনি। প্রবাসে ঈদের আনন্দ নিয়ে অনুভূতি জানাতে গিয়ে মাহমুদা বলেন, আমরা যেসব বাংলাদেশি এখানে থাকি তাদের কাছে রোজা একটা ভিন্নরুপ নিয়ে আসে। সবকিছু ঠিকঠাক, কিন্তু আমরা কয়েকজন রোজা থাকি। ভোরে উঠে সেহরি করি। নিজেরা নিজেরা ইফতারের আয়োজনও করি। দেশের বন্ধুরা মিলে কেনাকাটা করতে যাই। প্রায় সবকিছুই করা হয় আমাদের। কিন্তু কোনোভাবেই তা দেশের মতো না। দেশে রোজা শুরু হলেই যেমন উৎসবের আমেজ তৈরি হতো তা আর হয়না।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম বারের মতো ঈদ করছেন বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক রফিক চৌধুরী। পরিবার নিয়ে এ বছরের শুরুতে দেশটিতে গিয়েছেন তিনি। তার কাছে দেশটিতে ঈদের আনন্দ আলাদা অনুভূতি দিচ্ছে।
তিনি বলেন, জীবনে প্রথম বারের মতো দেশের বাইরে ঈদ করতে যাচ্ছি। এখানে ঈদ আমাকে ভিন্ন ও নতুন এক অভিজ্ঞতা দিচ্ছে। গতকাল নিজের ও পরিবারের সবার জন্য শপিং করেছি। পুরো রোজায় পরিবারের বাকি সদস্যদের মিস করেছি। ঈদের দিনও করতে হবে। তবে এখানকার বাঙালি ও মুসলিম কমিউনিটির মানুষদের সাথে ঈদটা উপভোগ করার চেষ্টা করবো।
কাজী হাসান আল মামুন মালয়েশিয়ায় পড়তে গিয়েছেন। তাই ঈদও সেখানে করতে হয়। তিনি বলেন, এই দেশে তুলনামূলক মুসলমান বেশি থাকায় ঈদের সময় এক অন্যরকম আবহ তৈরি হয়। আমার সহপাঠীদের অধিকাংশই মুসলমান। তাদের সাথে ঈদ উদযাপন করতে বেশ ভালো লাগে। তবে তা অবশ্যই দেশের মতো অনুভূতি দেয় না।
ঈদের নামাজ শেষে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মালয়েশিয়ায় পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীরা। ছবিটি গত বছর আন্তর্জাতিক ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া'র কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে তোলা। ছবিতে (বা থেকে) মোহাম্মদ (কম্বোডিয়ান), মাহতাব, আবুবকর (নাইজেরিয়ান), মেহেদী, শিব্বির আহমেদ, কাজী মামুন, আসিফ (বাংলাদেশি), একজন চীনা নাগরিক, নাহিদ, মোনায়েম, হানিফ (বাংলাদেশি)
মামুন আরও বলেন, ঈদের দিন বাড়ির কথা মনে ভীষণভাবে দাগ কাটে। স্মৃতিগুলোর কথা মনে পড়ে। মায়ের হাতের রান্না করা ফিরনি-পায়েস খেয়ে ঈদের মাঠে যাওয়া। ঈদের মাঠ থেকে ফিরে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়া ভীষণ মিস করি।
ইউরোপের দেশ জার্মানিতে ৬ বছর ধরে থাকেন রিফাহ ফারহানা জামান। তিনি ও তাঁর স্বামী দেশটিতে এসেছিলেন পড়তে। এখন তাঁর স্বামী চাকরি করলেও তিনি গৃহিণী। ঈদকে ঘিরে তাঁর থাকে অনেক পরিকল্পনা। তাঁর ভাষায়, বহুদিন ধরে দেশের বাইরে ঈদ করতে করতে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আগের মতো অতোটা খারাপ লাগেনা এখন। ঈদের ৫/৭ দিন আগেই কেনাকাটা করে ফেলি।
ঈদের দিন সকালে উঠে সেমাই, ফিরনি রান্না করি। অনেকসময় দেশ থেকে আম্মা পিঠা বানিয়ে পাঠান। সেসবও খাওয়া হয়। ঈদের দিন বন্ধুরা দাওয়াত করে। এছাড়া ঈদের দিন আমরা জার্মানির বিভিন্ন শহরে ঘুরতে যাই। আসলে এখানে ঈদ উদযাপনের অভ্যস্ততা আসলেও দেশের ঈদই সেরা। সবসময় প্রিয় মানুষদের খুব মনে পড়ে। আবার কবে তাদের সাথে ঈদ করতে পারবো সে অপেক্ষায় থাকি।
তাহের, আসিফ, মাহমুদা, মামুন বা ফারহানার মতো অনেকেই পড়াশোনা বা জীবিকার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে থাকেন। ঈদে বাড়ি ফেরা হয়না তাদের। তাই দূর দেশেই পরিবার ছাড়া অনেকে কোনোরকম ঈদটা সেরে নেন। আবার অনেকের সুযোগ হয় ভিনদেশেই থাকা পরিবারের সদস্যদের সাথে ঈদ উদযাপনের। তবুও ঈদে তাদের অধিকাংশের মন পড়ে থাকে দেশে, দেশের মানুষের কাছে।
ফরহাদুর রহমান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী।