Loading...

ভিনদেশী এক রাপুঞ্জেলের অজানা গল্প


ব্লাঞ্চ মোনেই, বন্দীত্বের আগে (বামে) ও উদ্ধারের পর (ডানে)। ব্লাঞ্চ মোনেই, বন্দীত্বের আগে (বামে) ও উদ্ধারের পর (ডানে)।

“রাপুঞ্জেল, রাপুঞ্জেল

তোর চুল নিচে ফেল

রুপকথায় উঁচু টাওয়ারে বন্দী রাপুঞ্জেলকে এমনি করেই ডাকতো ডাইনি বুড়ি। তারপরে তার চুল বেয়ে উঠে আসতো উপরে। জন্মের পরে থেকে ডাইনির কাছে থাকে রাজকন্যা রাপুঞ্জেল। একসময় এক ভিনদেশি যুবক তাকে ভালোবেসে ছাড়িয়ে নিয়ে যায় ডাইনির খপ্পর থেকে।

গ্রীম ভাইদের রূপকথার স্বর্ণকেশী রাপুঞ্জে্লের নাম কমবেশি সবারই জানা। কিন্তু বাস্তবের এক এক রাপুঞ্জেলের বেদনাবিধুর গাঁথাও শিউরে দিয়েছে মানুষকে, বন্দীত্বের বীভৎস বাস্তবতা তুলে এনেছে সামনে।

ব্ল্যাঞ্চ মোনেইয়ের (Blanche Monnier) বাস ছিল ফ্রান্সের পতিয়ে নামে একটি ছোট্ট শহরে। উনিশ শতকের সম্ভ্রান্ত পরিবারের একমাত্র কন্যা, সাথে পরমা সুন্দরী। তাই তার ছিল শহরজোড়া খ্যাতি। পাণিগ্রাহীরা মোনেই মহলের দুয়ারে আবেদন নিয়ে আসতো কিন্তু তাদের ফিরে যেতে হতো আশাহত হয়ে। ব্ল্যাঞ্চের মা লুইস মোনেই কাউকেই মেয়ের জন্য আদর্শ বলে ভাবতে পারছিলেন না। তিনি চাচ্ছিলেন মেয়েকে নিজেদের থেকে অনেক উঁচু ঘরে পার করবেন। কিন্তু এদিকে বইল উল্টো হওয়া।

২৫ বছর বয়সী ব্ল্যাঞ্চের হৃদয়ে হঠাৎ আসন গেড়ে বসে তার থেকে খানিক বয়েসী এক উকিল পাত্র। উকিলটি ছিল উপার্জনহীন। তবুও ব্ল্যাঞ্চ মায়ের রোষকে তুচ্ছ করে, গভীর ভালোবাসায় ডুবে পড়ল। কিন্তু তার স্বপ্ন অধরা থেকে রইল আজীবন। ভালোবাসা কাল হয়ে এল জীবনের। এই গল্পের ডাইনি বুড়ি হলো ব্ল্যাঞ্চের মা ম্যাডাম লুইস মোনেই।

মোনেই মহলের চিলেকোঠায় বন্দি হলো ব্ল্যাঞ্চ। তার মা তিনি ঠিক করে ফেললেন মেয়েকে কোনো দিন আর কারোর সাথে দেখা করতে দিবেন না।

ব্ল্যাঞ্চ বন্দী হবার কিছুদিন পরে আকস্মিকভাবে তার প্রেমিকের মৃত্যু হয়। তবুও ম্যাডাম লুইস তাকে মুক্তি দেননি।

এইভাবে দিনের পরে দিন, মাসের পরে মাস, বছরের পরে বছর করে গোটা ২৫টা বছর ব্ল্যাঞ্চ মোনেই বন্দি হয়ে রইলেন নিজের বাড়িতেই। কোনো যত্ন-আত্তি তো দূর, ঠিক মতো খাবার পর্যন্ত দেয়া হতো না। মাঝেমাঝে কোনো কাজের লোক এসে বাড়ির বেঁচে যাওয়া কিছু খাবার ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যেত।

ব্ল্যাঞ্চকে বন্দি রেখে মা আর ভাই স্বাভাবিক জীবন নির্বাহ করে যাচ্ছিলো। বাবা এমেল মোনেই পতিয়ে আর্ট ফ্যাকাল্টির পরিচালক ছিলেন, সমাজসেবী হিসেবে বহু কাজ করেছেন। তাই তার মৃত্যুর পরেও মোনেই পরিবার ‘জনদরদীএকটি পরিবার হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত ছিল। সবাই বেশ সমীহ করে চলত তাদের।

১৯০১ সাল। ভিয়েনের এটর্নী জেনারেলের দপ্তরে গেলো একটি বেনামি চিঠি। তাতে লেখা ছিল - 'মোনেইদের বাড়িতে একজন মহিলা বন্দি আছেন, যিনি এখনো বেঁচে আছেন এক কথায় শুধু বর্জ্যের উপর।'

মোনেই পরিবারের সম্পর্কে এমন একটি অভিযোর কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না। চিঠিতে সত্যতা যাচাই করতে বাড়ি তল্লাশিতে এলো পুলিশ। কিন্তু তারা তখনও জানতো না, তাদের সামনে কি সত্য বের হয়ে আসতে চলেছে। 

একখানি ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘর। কোথাও কিছু দেখার জো নেই। অসম্ভব দুর্গন্ধ ছিল ঘর জুড়ে, যার জন্যে দুদন্ড দাঁড়িয়ে থাকাও বড্ড দুষ্কর। একজন নির্দেশ দিলেন তাড়াতাড়ি জানালা খোলার ব্যবস্থা করতে।  

জানালার জায়গাটায় পর্দাগুলি বহুকাল ধরে ধূলিস্নান করেছে, আংটাগুলি নাড়া দায়। ভীষণ কষ্টে - সৃষ্টে অবশেষে জানালা খোলা হলো। দীর্ঘ ২৫ বছর পরে ঘরটিতে ঢুকল রবির কর।

দেখতে পাওয়া গেলো একটি ছেড়া নোংরা খড়ের বিছানায় আলুলায়িত কেশের দীর্ঘদেহী এক শায়িত নারীকে। দেহটি আবরণহীন, রোগক্লিষ্ট জীর্ণ। ঘরের চারকোণ ময়লা আবর্জনায় ভর্তি। কিছু মল ঠাসা ব্যাগ। ছড়ানো ছিটানো বাসি পাউরুটি আর পচা মাংস। বিছানার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে শামুক আর পোকা। কোণায় কোণায় ইঁদুরের আড্ডা। এরকম একটি দৃশ্য যে কেউ আঁতকে উঠবে!

ব্ল্যাঞ্চকে এই দুর্বিষহ অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত প্যারিস হাসপাতালে পাঠানো হয়। আর ওদিকে গ্রেফতার হন বৃদ্ধা লুইস মোনেই এবং ব্ল্যাঞ্চের ভাই মার্সেল মোনেই। গ্রেফতারের কিছুদিন পরেই মারা যান লুইস। তবে জানা যায়, শেষ সময়ে নিজের উইলটি পরিবর্তন করে সেখানে কন্যার চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা বরাদ্দ করে যান।

নিয়তির খেলা বড়ই জটিল। উদ্ধার হওয়া ব্ল্যাঞ্চ মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিকল ছিল। সে কথা বলতে পারতো না। দীর্ঘ অপুষ্টিতে ওজন চলে এসেছিল ৫৫ পাউন্ডের নিচে। তিনি হয়ে উঠেছিলেন জীবন্ত কঙ্কাল (living skeleton). ক্ষুধামন্দার পাশাপাশি তিনি সিজ্রোসফ্রেনিয়া সহ বহু মানসিক বিকৃতিতে আক্রান্ত হন।

ম্যাডাম লুইসের মৃত্যুর পর মামলার আসামি করা হয় মার্সেলকে। তাকে কারাদন্ড দেয়া হয়। কিন্তু পেশায় আইনজীবী মার্সেল কোর্টের বিরুদ্ধে আপিল জানান। তিনি জানান বোনকে বন্দি করার সাথে তার কোনো সংযুক্তি নেই বরং তিনি বন্দী বোনকে বিভিন্নভাবে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন, কাজের লোককে দিয়ে সেই ঘরে খাবার দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। ফ্রান্সের প্রচলিত আইন অনুসারে কেউ যদি বন্দিকর্তা না হয় , তাহলে তাকে মুক্ত না করবার জন্যে সে দায়ী নয়। সেই শর্তে মুক্তি পান মার্সেল।

ব্ল্যাঞ্চ আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি কখনোই। মুক্তির পরে ফ্রান্সের ব্লইসের মানসিক হাসপাতালে  ১২ বছর চিকিৎসাধীন থেকে ১৯১৩ সালে ব্ল্যাঞ্চ মোনেই মারা যান। পৃথিবীতে রয়ে যায় করুণ এক বন্দীজীবনের গল্প।

সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

susmi9897@gmail.com

 

Share if you like

Filter By Topic