ব্রাজিলে আসবে তৃতীয় ধারার প্রার্থী!


এফই অনলাইন ডেস্ক | Published: October 06, 2021 12:25:25 | Updated: October 06, 2021 18:08:38


ব্রাজিলের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোরানোর কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন কয়েকজন ব্রাজিলীয়

[ব্রাজিলের গণতন্ত্র মেরুকরণ এবং উগ্রবাদের বাগজালে জড়িয়ে পড়েছে। ক্ষমতাসীন বোলসোরানো এবং আগামী নির্বাচনের অন্যতম জনপ্রিয় প্রার্থী এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলা উভয়ই রাজনীতিতে নিজেদের রক্ষা কবচ হিসেবে এই প্রবাহকে ধরে রাখতে চাইছেন। এখনো তাদের এ প্রবণতাই দেশটিতে শেষ কথা হয়ে উঠতে পারেনি। তৃতীয় ধারার কথাও ব্রাজিলে শোনা যাচ্ছে।]

ব্রাজিলের রাজনীতির মেরুকরণের সুফল ভোগ করছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোরানো এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা উভয়ই। তৃতীয় ধারার যে কারো উত্থানকেই তাঁরা দুজনে নিন্দা জানাতে এগিয়ে আসেন।

অথচ ব্রাজিলের রাজনীতিতে যে বাতাস বইছে তাতে তৃতীয় ধারার প্রার্থী হিসেবে নাম উঠে আসছে অনেকেরই। বিষয়টা বেশ বিস্তৃতি পেয়েছে। এ তালিকায় রয়েছেন দক্ষিণের রাজ্য রিও গ্র্যান্ড ডো সালের গভর্নর এডুয়াডো লেইতে, মধ্য-বাম রাজনীতিবিদ সিরো গোমেজসহ অনেকেই। তবে জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে এখনো তাঁরা সবাই এক অঙ্কের ঘরেই দাঁড়িয়ে আছেন।

এদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রথম সারিতে যেতে হলে ও প্রার্থী হিসেবে সবার আগে থাকতে চাইলে তাঁকে মধ্য-ডান সিটিজেন পার্টির সিনেটর আলেসান্দ্রো ভিয়েরা এবং ব্রাজিলের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের মধ্য-ডান রাজনীতিবিদ কিম কাতাগুরিসহ দেশটির রাজনৈতিক কেন্দ্রের সমর্থন টানতে হবে। পাশাপাশি তাঁকে পেতে হবে ফারিয়া লিমা নামে পরিচিত ব্রাজিলের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের সমর্থনও। সাও পাওলোর প্রধান অর্থনৈতিক লেনদেনের কেন্দ্র ফারিয়া লিমার নামেই এটি পরিচিতি লাভ করেছে।

ব্রাজিলের অর্থনৈতিক এলাকা ফারিয়া লিমা এখনো দেশটিতে গণতান্ত্রিক এবং উদার কর্মসূচির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একজন মানুষ পাওয়ার আশায় রয়েছে। ব্রাজিলের বিনিয়োগ কোম্পানি আলবিওন ক্যাপিটলের প্রধান নির্বাহী পাওলো টডারো এ কথা বলেন। বোলসোনারোকে সমর্থন করেন না আর লুলাকে নিয়ে রয়েছে তাঁর সংশয়। দ্রব্যমূল্য চূড়ায় ওঠার মধ্য দিয়ে ২০১০-এ লুলা দায়িত্ব ত্যাগ করেন। অবশ্য সে সময়ও তাঁর জনসমর্থন ছিল ৮৭ শতাংশ। ব্রাজিলের কোনো প্রেসিডেন্ট এমন জনপ্রিয়তা পায়নি। কিন্তু ফেডারেল পুলিশ অব ব্রাজিল পরিচালিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অপারেশন লাপা জাতো বা অপারেশন কার ওয়াশের বছরব্যাপী তদন্তে ব্রাজিলের জাতীয় তেল কোম্পানি পেট্রোব্রাসে ঘুষের বিনিময়ে ঠিকাদারি পাওয়ার বিশাল কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়ে যায়। খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ এবং নামকরা নির্মাণ কোম্পানিগুলোর যোগসাজশে দুর্নীতির এ বিশাল চক্র দেশটিতে গড়ে উঠেছিল। দুর্নীতিতে লুলার জড়িত থাকার বিষয়ও প্রকাশ পায় এ তদন্তে। বিচারে তাকে প্রায় দুবছর কারাবাসও করতে হয়। আইনি জটিলতার প্রেক্ষাপটে তাঁর দণ্ডাদেশকে চলতি বছর নাকচ ঘোষণা করে ব্রাজিলের সুপ্রিমকোর্ট।

পাওলো টডারো বলেন, ব্রাজিলবাসীরা এখন জানে না লুলার মনোভাব কী? কারাগারে কাটানোর পর কী লুলার ক্ষোভ বাড়বে এবং তিনি কী বামের দিকে জোরালো মোড় নেবেন?

ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা

ট্রেড ইউনিয়নের সাবেক নেতা লুলার মনোভাব নিয়ে ব্রাজিলের অর্থনৈতিক জগতের দ্বন্দ্ব কিন্তু ভিন্ন আভাস দিচ্ছে। আর তা হলো, অর্থনৈতিক জগত এরই মধ্যে এক ধরণের সমঝোতায় পৌঁছেছে যে সাবেক সেনা (অর্থাৎ বোলসোনারো) দেশটির ব্যবসায়িক ক্ষেত্রের জন্য ভালো হবেন না। বোলসোনারো তাঁর প্রশাসনের শুরুতেই কর ব্যবস্থা আমূল সংস্কারের গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দেশটির প্রশাসনিক সংস্কারসহ সরকারের উদার অর্থনৈতিক সংস্কারের কিছু কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে। আর অধিকাংশই রাজনৈতিক ঘৃণার শিকার পরিণত হয়েছে।

ব্রাজিলে বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ রয়ে গেছে। সুদের হার বেড়ে সেপ্টেম্বরে ৬.২৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে। মার্চের তুলনায় এ হার বেড়েছে ২ শতাংশ। বার্ষিক মূল্যস্ফীতি আগস্টে প্রায় ১০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। এ সবই ভোটারদের পকেটে ছোবল মারছে। একই সাথে ভাটার টান পড়ছে বোলসোনারোর জনপ্রিয়তায়।

বিশ্বমারির নিষ্ঠুর আঘাত সহ্য করেছে ব্রাজিল। কোভিড-১৯ বিশ্বমারিতে ব্রাজিল হারিয়েছে প্রায় ছয় লাখ প্রাণ। অর্থনীতির ধকল কাটিয়ে ওঠার প্রাথমিক গতিও এতে থেমে গেছে। ব্যাংকগুলো আগামী বছরের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।

বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গায়েভা ইনভেসমেন্টের প্রধান নির্বাহী অ্যারমিনিও ফ্রাগার বলেন, ব্রাজিলের ব্যবসা জগত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের প্রতি তাদের সমর্থন তুলে নিয়েছে। এটি একটি নতুন ঘটনা।

তিনি আরো বলেন, আগামী বছরের নির্বাচনে ব্রাজিলের বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। যে কোনো কারণেই হোক না কেনো যদি বোলসোনারোর জন্য নির্বাচনে সমর্থন বাড়তে থাকে তবে তাকে দুঃসংবাদ হিসেবে নেবে বাজার। বিনিয়োগ প্রবাহ এবং বিনিময় হারের ওপর নির্বাচনের প্রভাবের ইঙ্গিত করে এ কথা বলেন তিনি।

ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ

এদিকে, গেটেলিও ভার্গাস ফাউন্ডেশনের অধ্যাপক ড্যানিলিয়া ক্যাম্পেলো বলেন, ব্রাজিলের অর্থনীতি ক্রমেই নিম্মগামী হচ্ছে। হঠাৎ করে রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনা নেই ফলে এই প্রবণতা বোলসোনারোর নির্বাচনী আশাবাদকে কালো ছায়ায় ঢেকে দেবে।

প্রশাসন এ বিষয়টি ভালোভাবেই জানে। অসিলিও ব্রাজিল বা ব্রাজিল সহযোগিতা নামে বহু কোটি ডলারের সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচি তৈরির চেষ্টা চলছে। এ খাতে বাজেট থেকে তহবিল বরাদ্দের চেষ্টাও হচ্ছে। ব্রাজিলের সবচেয়ে গরিব জনগোষ্ঠীকে এর মাধ্যমে আরো নগদ টাকাকড়ি দেওয়া হবে। এ কর্মসূচিকে ভিন্ন চোখে দেখছেন সমালোচকরা, তারা একে ভোট কেনার নগ্ন তৎপরতা হিসেবে উল্লেখ করছেন।

বোলসোনারোর অনুগত সমর্থকরা মতামত জরিপকে ভুল বলে তুলে ধরতে চাইছেন। তাদের দাবি, আগামী বছর নির্বাচনে নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বোলসোনারোর পক্ষে এগিয়ে আসবে। বোলসোনারো প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত এর্নেস্তো আরাউহো বলেন, একপেশে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বেঠিক মতামত জরিপ অতীতেও দেখা গেছে। রাজপথে যা ঘটছে তার সঙ্গে এই মতামত জরিপগুলোর কোনো মিল নেই।

আরাউহো আরো মনে করেন, বোলসোনারোর আক্রমণাত্মক ভাষণ-বিবৃতি ব্রাজিলের গণতন্ত্রের জন্য কোনো হুমকি নয়। তিনি এবং তাঁর মতো কট্টর ডানের সমর্থকরা আরো মনে করেন, ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের অগণতান্ত্রিক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত নাকগলানো বন্ধে এবং স্বাধীনতা রক্ষায় এসবের প্রয়োজন রয়েছে।

ব্রাজিলের আদালত সম্প্রতি বোলসোনারোর কয়েকজন খ্যাতনামা মিত্রকে গণতন্ত্র-বিরোধী বক্তব্যের জন্য গ্রেফতারের নির্দেশ জারি করেছে। ভুয়া সংবাদের বিরুদ্ধে আদালত ব্যাপক তৎপরতা দেখিয়েছে। ২০১৮-র নির্বাচনে বোলসোনারোর শিবির ব্যাপকভাবে এসব খবর ব্যবহার করেছে। ফলে প্রেসিডেন্ট সমর্থকদের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে আদালত।

আদালতের সঙ্গে বোলসোনারোর টানাপড়েন প্রসঙ্গে আরাউহো বলেন, আদালত নজিরহীন অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে, বিশেষ অধিকারের অপব্যবহার করেছে আর প্রেসিডেন্ট কেবল এমন সব তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। রাজনৈতিক পরিবেশে এতে টানটান উত্তেজনা দেখা দিলেও এতে প্রেসিডেন্ট তাঁর সাংবিধানিক সীমানার বাইরে চলে গেছেন সে কথা বলা যাবে না।

একই কথার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে সাবেক পরিবেশমন্ত্রী এবং বোলসোনারোর গুরুত্বপূর্ণ মিত্র রিকার্ডো স্যালিসের মুখেও। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টের গরম গরম বক্তব্য হয়ত উত্তেজনা তৈরি করছে। তবে তিনি গণতন্ত্র বিরোধী তৎপরতা বেছে নেননি। কেবল কথা বলার জন্যেই মানুষকে অপরাধী বলা বা সাজা দেওয়া যায় না। এটাই হলো রাজনীতি।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলা রূপান্তর সৈয়দ মূসা রেজা]

আরো পড়ুন:

ঈশ্বরই শুধু প্রেসিডেন্টের পদ থেকে আমাকে সরাতে পারবেন

মেরুকরণ এবং উগ্রবাদের বাগজালে ব্রাজিল

Share if you like