Loading...

ব্যালে নাচের ইতিকথা - ইউরোপ থেকে বাংলাদেশে ব্যালেরিনার শিল্প

| Updated: January 31, 2022 12:06:03


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ব্যালে নৃতের ভঙ্গিমায় আলোচিত ব্যালে নৃত্যশিল্পী মোবাশ্বিরা কামাল ইরা। ছবি তুলেছেন চিত্রশিল্পী জয়িতা আফরিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ব্যালে নৃতের ভঙ্গিমায় আলোচিত ব্যালে নৃত্যশিল্পী মোবাশ্বিরা কামাল ইরা। ছবি তুলেছেন চিত্রশিল্পী জয়িতা আফরিন।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার রাজু ভাস্কর্যের সামনে এক নৃত্যশিল্পীর নাচের ভঙ্গিমার কিছু ছবি ভাইরাল হয়। তরুণ এই নৃত্যশিল্পী নওগাঁর বাসিন্দা মোবাশ্বিরা কামাল ইরা। ছবিগুলো তুলেছিলেন ফটোগ্রাফার জয়িতা আফরিন।

সে সময় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে বেশকিছু ব্যানার রাখা হয়েছিল রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে। ইরার এই আকর্ষণীয় নৃত্য ভঙ্গিমার সাথে সেসব বক্তব্যের মিশেলে ছবিগুলো তৈরি করে অন্যরকম তাৎপর্য।

এই মুভ বা ভঙ্গিমাগুলো মূলত ব্যালে নাচের অংশ। তাই স্বভাবতই নৃত্যরত ব্যালেরিনার ছবিগুলো দেখার সাথে সাথে অনেকের ভেতরেই তৈরি হয়েছে এই নাচ সম্পর্কে জানার আগ্রহ।

ব্যালে নাচের সূচনা ইতালি ও ফ্রান্স থেকে। ব্যালে কথাটা এসেছে ‘ব্যালোরে’ থেকে, যার অর্থ ‘নাচতে উদ্যত;’ এর সাথে রয়েছে ইউরোপীয় রেনেসাঁর সম্পর্ক।

১৫৭৩ সালের দিকে ইতালির অভিজাত কন্যা ক্যাথেরিন ডি মেডিসি বিয়ে করেন ফ্রান্সের রাজপরিবারের সদস্য দ্বিতীয় হেনরিকে। সে সময় ফ্রান্সের অভিজাতদের ভেতর প্রচলিত বল নাচের ধরণ থেকে  আরেকটু ভিন্ন একরকম নাচের প্রচলন করেন মেডিসি,  যা মূলত টো বা পায়ের গোড়ালির উপর নির্ভরশীল ছিলো।

এই নাচের ধরন পরিচিতি পেয়ে যায় ‘ব্যালে’ নামে৷ সে সময় পোল্যান্ডের একজন দূতের সম্মানে বিনোদনের জন্য হয়েছিল এই নাচের উদ্ভব।

সে সময় ব্যালে নাচের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিলো অপেরার। তবে ১৮৩০ সালের পর থেকে ফ্রান্স এক্ষেত্রে প্রাধান্য হারাতে থাকে। সে জায়গাটি আস্তে আস্তে দখলে নেয় রাশিয়া।

ক্লাসিকাল ব্যালে নাচ গোড়ালির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আঁট গড়নের সাদা লম্বা স্কার্ট ব্যবহৃত হতো এই নাচের জন্য। মূলত নাচের সুবিধার্থেই এই নকশা বেছে নেয়া হয়েছিল।

ক্লাসিকাল যুগ পেরিয়ে একসময় ইউরোপিয়ান কবিতার রোমান্টিকতা প্রবেশ করে ব্যালে নাচে। ১৮৪১ এর বিখ্যাত ব্যালে ‘জিসেল’ ছিল এক্ষেত্রে অগ্রদূত।  ব্যালে নাচ মূলত নারীদের জন্য হলেও রোমান্সের প্রসারের সাথে সাথে পুরুষেরাও এর অংশ হন।

এ সময় থেকে বিভিন্ন লোকগাথা ও গল্পকে ব্যালের রূপ দেয়া হয়। যেমন- স্লিপিং বিউটি, সিন্ডারেলা, বিউটি এন্ড দ্য বিস্ট। গ্ল্যামারের অংশ হিসেবে ব্যালের পোশাকে রঙ-বেরঙ ও কারুকাজের বৈচিত্র‍্য ও পোশাক সংক্ষিপ্তকরণের ব্যাপারটিও আসতে থাকে।

আরেকটি ধরন বিকাশ লাভ করে বিংশ শতাব্দীতে- নিওক্লাসিকাল ব্যালে। ক্লাসিকাল ভিত্তি ঠিক রেখে সমসাময়িক বিভিন্ন ব্যাপারকে কিছুটা বিমূর্তভাবে প্রকাশের তাগিদ থেকেই এই ধারা বিকাশ লাভ করে।

এই ঘরানার প্রবর্তক ছিলেন জর্জ ব্যালানকাইন। ১৯২৮ সালে তার ‘অ্যাপোলো’ নামের ব্যালেটি এই ধারায় করা প্রথম কাজ।

এছাড়া বিশেষভাবে বলতে হয় রাশিয়ান নির্মাতা সার্গেই দায়াঘিলভ এর কথা। লেনিনের বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত রাশিয়ায় দায়াঘিলভ ব্যালের জোয়ার নিয়ে আসেন। বিষয় ভাবনায় ও নির্দেশনায় একে সমসাময়িক ও জীবনঘনিষ্ট করে তোলেন তিনি।

বলা যায় আরেক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক ইয়াকোবসন এর কথা। পঞ্চাশ-ষাট দশকের অবরুদ্ধ সোভিয়েতে যখন তারকোভস্কি বা লারিসার মত চলচ্চিত্র পরিচালকরা মুক্তভাবে শ্বাস ফেলতে পেরে ওঠেননি, তখন তিনি ব্যালেকে করেছিলেন বক্তব্যধর্মীতার বড় এক আয়না। ইয়াকোবসন তাঁর ব্যালে দল নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও আমেরিকায় ভ্রমণ করেন ও ব্যালেকে পরিচিত করে তোলেন।

যা হোক, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যালে নিয়ে অনেকরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে ও হচ্ছে৷  বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।  তরুণ কিছু নৃত্যশিল্পী এখানে কাজ করছেন ব্যালে নিয়ে। ব্যালে বাংলাদেশ বা রিদোমস গ্রুপ যার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

তবে এখনো সেটা নিরীক্ষা বা প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে। রিদোমোস মূলত কনটেম্পোরারি বিভিন্ন থিমে নাচ করে থাকে। এর প্রতিষ্ঠাতা তাহনুন আহমেদী জিমন্যাস্ট বা ব্যালের বিভিন্ন কৌশলকে নাচে প্রয়োগ করেছেন।

তাহনুন ভারত থেকে এ বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। আধুনিক জীবনের জটিলতা, নানাবিধ সংকট, এমনকি নারী নির্যাতন, রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও তারা কাজ করেছেন।

ভাইরাল হওয়া সেই ব্যালেরিনা ইরার গল্পটাও চমকপ্রদ। ২০২০ এ লকডাউনের সময়টায় বাসার ড্রয়িংরুমে ইউটিউব দেখে ব্যালে নাচ শুরু করেন তিনি।

পরে ঢাকায় প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী লুবনা মরিয়মের প্রতিষ্ঠান 'সাধনা'-য় শিখতে শুরু করেন। ব্যালেতে পারদর্শিতা বাড়ে এখান থেকেই।

এছাড়া তিনি অ্যাথলেট ছিলেন। সেটাও তার দক্ষতা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। তবে এখনো ব্যালে নাচ বাংলাদেশে সামাজিকভাবে অতটা সুদৃষ্টি পায়নি। আশা করা যায়,  তরুণ এই শিল্পীদের হাত ধরেই ব্যালে এগিয়ে যাবে আরো বহুদূর।

 

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic