এক
ক্যালিফোর্নিয়ার মেয়ে ৩৬ বছর বয়সী সারাহর চিকিৎসায় ব্যক্তিনির্ভর গভীর মস্তিষ্ক উদীপনন বা ডিপ ব্রেইন স্টিমুলেশন (ডিবিএস)এর ব্যবহার করা হয়। এ চিকিৎসা প্রকল্পে জড়িত ছিল সান ফ্রান্সিসকোতে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (ইউসিএসএফ)এর একটি অস্ত্রোপচার দল। পাতলা বিজলী-তারের এক প্রান্ত সারাহর মগজের গভীরে বসিয়ে দিল তারা। তারপর হালকা বিদ্যুৎ তরঙ্গ বইয়ে দেওয়া হলো। এটি দিনে ৩০০ বার সক্রিয় হয়ে উঠতো। প্রতিবার মাত্র ৬ সেকেন্ড তৎপর থাকত। এ সময় সারা মস্তিষ্কে বইয়ে দিতো অতি কোমল বিদ্যুৎস্পন্দন। এ তথ্য দিয়েছে ব্রিটিশ বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার মেডিসিনের চলতি সংখ্যা। এতে আরো বলা হয়েছে, যন্ত্রটি সক্রিয় হলে সারাহ তা মোটেও টের পেতেন না।
তবে এখনো এটি ঢালাওভাবে অবসাদের রোগীর ওপর ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়নি। বর্তমান অবস্থায় এ চিকিৎসার জন্য দুই দফা মস্তিষ্কের অপারেশন করার প্রয়োজন পড়ে। তারপরের কয়েকদিন কেটে যায়, রোগীর বিদ্যুৎ-তৎপরতা ধারণ করার কাজে। এ কাজগুলো একান্তভাবেই রোগীনির্ভর হয়ে থাকে। আর পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ ব্যয়বহুল।
তবে পারকিনসন্স এবং মৃগী রোগের ক্ষেত্রে ডিবিএসের প্রয়োগ বেশ গৎ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণটিও সহজ। এমন রোগীর মস্তিষ্কের কোন অংশে ডিবিএস বসাতে হবে সে কথা জানেন বিজ্ঞানীরা। অবসাদ আক্রান্তের মগজের তৎপরতা সম্পর্কে এখনো পরিষ্কার কোনো ছবি পাননি চিকিৎসা গবেষণায় জড়িত বিজ্ঞানীরা।
দুই
অবসাদ চিকিৎসায় ইউসিএসফের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি হলো একটি জৈবপ্রতীকচিহ্ন বা বায়োমার্কার (দেহের স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ার লক্ষণ, অথবা কোন বিশেষ অবস্থা বা রোগের চিহ্ন হিসাবে রক্ত, শরীরের অন্যান্য তরল পদার্থ বা কোষকলাতে প্রাপ্ত বিশেষ জৈবিক অণুই বায়োমার্কার বা জৈবপ্রতীকচিহ্ন হিসেবে পরিচিত। বিশেষ রোগ বা বিশেষ অবস্থা কিংবা চিকিৎসায় শরীর কতটা সাড়া দেয় তা দেখার জন্য বায়োমার্কার বা জৈবপ্রতীকচিহ্ন ব্যবহার করা হয়)। চিকিৎসকদের দলটি দেখতে পান যে, অবসাদ দেখা দিলে মস্তিষ্কের অ্যামিডালা নামের অংশে বিশেষ স্নায়ু তৎপরতা দেখা দেয়। সেখানে উদ্দীপনা সৃষ্টি করেও সারাহর অবসাদের ইতি ঘটাতে পারলেন না চিকিৎসকরা। কিন্তু অ্যামিডালায় তৎপরতা দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই ভেনট্রাল স্ট্রাইটাম নামের মস্তিষ্কের অন্য স্থানে স্বল্প মাত্রায় বিদ্যুৎ-স্পন্দন দেওয়া মাত্রই সেরে গেল সারাহর অনাকাঙ্ক্ষিত অনুভূতি। দিয়াশলাই বাক্সের আকারের যন্ত্রটি ব্যবহার করা হয়েছে বিদুৎপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে। মৃগীরোগ নিয়ন্ত্রণে এটি ব্যবহার হয় এবং বাণিজ্যিকভাবেই এটি উৎপাদিত হয়। এর দাম ৩০ হাজার ডলার।
অবসাদ সারাতে উদ্দীপনা বা উত্তেজনা অর্থাৎ স্টিমুলেশনের এই দারুণ প্রয়োগকে চিকিৎসা ক্ষেত্রের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বললেন ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডনের স্নায়ুবিজ্ঞান ও মানসিক স্বাস্থ্যের অধ্যাপক জোনাথন রোইজার। রোগী ভেদে মস্তিষ্কের এ কেন্দ্রের পরিবর্তন ঘটতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
এদিকে ইউসিএসএফ দলের নেতৃত্বদানকারী মনোবিদ ক্যাথারিন স্ক্যানগোস মারাত্মক অবসাদে আক্রান্ত আরো দুই রোগীসহ ১২ স্বেচ্ছাসেবীকে নিয়ে কাজ করছেন। তিনিও বলেন, অবসাদের নানা রূপ এবং ভিন্নতাসহ রোগী দেহে তার পার্থক্যের বিষয়ে চিকিৎসকদের জানার আরো বাকি রয়েছে।
ইউসিএসএফের পাশাপাশি টেক্সাসের বেইলর কলেজ অব মেডিসিনেও ডিবিএস নিয়ে কাজ চলছে। দুই গবেষণা প্রকেল্পেই রোগীদের ওপর ডিবিএসের তৎপরতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা যদি ডিবিএসের পক্ষে যায়, যদি প্রমাণ পাওয়া যায় এ প্রযুক্তি সারাহর মতো অন্যান্য রোগীকেও সারিয়ে তুলতে পারবে; তারপরও কথা থেকে যাবে। ডিবিএস বসাতে মস্তিষ্কে অপারেশন করতে হয়। সেটিও বেশ জটিল। তাই গবেষণায় পূর্ণ সফলতা পেলেও এ চিকিৎসা পদ্ধতি কেবল অবসাদের মারাত্মক রোগীদের দেওয়া হবে বলে জানান রোইজার।
তিন
ইউসিএসএফের স্নায়ু শল্যচিকিৎসক বা নিউরোসার্জন এ্যাড চ্যাং অবশ্য ভিন্ন সুরে কথা বলেন। তিনি বলেন, ডিবিএস প্রযুক্তির উন্নয়নের বড় সুযোগ রয়েছে সামনে। বর্তমানে ডিবিএস তৈরিতে ব্যবহার হয়েছে ৩০ থেকে ৪০ বছর আগের কার্ডিয়াক পেসমেকার তৈরির ইলেক্ট্রনিক সার্কিট। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ ক্ষেত্রে আরো ভালো জিনিস আসবে। বর্তমানে আমরা যা ব্যবহার করছি সে দৃষ্টি থেকে এই যন্ত্রকে আদিমই বলতে পারি।
ইউসিএসএফ বিজ্ঞানীরা পেটেন্ট বা মেধাস্বত্ব অধিকারের কথাও নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করেছেন। চ্যাং বলেন, চিকিৎসায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি নির্মাণকারী কোম্পানিদের সহায়তায় অবসাদ চিকিৎসার যন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা শুরু করতে চাইলে মেধা স্বত্ব বা পেটেন্টের দরকার পড়বে। তারা এ খাতে প্রচুর অর্থ, কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। কাজেই এটা দরকার হবে। তিনি আরো বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে ইউসিএসএফের গবেষকরা। ভবিষ্যতে অবসাদের চিকিৎসায় এমন যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখতে চায় এই গবেষক দল।
গবেষক দলটি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, তাদের গবেষণায় হয়তো বিনা অস্ত্রে বা অপারেশনে ব্যবহারযোগ্য ডিবিএস তৈরির দরজা খুলবে। চ্যাং মনে করেন, অবসাদ চিকিৎসার ডিবিএসের পথ ধরে এখনো চিকিৎসা জগতে নেই এমন সব নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভব ঘটবে ভবিষ্যতে।
মস্তিষ্কের যে অংশে ডিবিএসের মাধ্যমে বিজলী প্রবাহ করা হয় তার বেড় মাত্র এক থেকে দেড় মিলিমিটার। অপারেশন না করে বাইরে থেকে এমন অংশে বিদ্যুৎ প্রবাহ করা অতিমাত্রায় কঠিন। তবে আশার কথা হলো যে, আলট্রাসাউন্ড বিম বা অতিশব্দ স্তম্ভ হয়তো এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনা হয়ে দেখা দিতে পারে।
অবসাদ নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে বিনা অস্ত্রে দুই ধরণের বিদ্যুৎ চিকিৎসার চল আছে। ইলেক্টোকনভালসিভ চিকিৎসা (ইসিটি)তে যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয় তার চেয়ে অনেক কম মাত্রায় বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় এ দুই ক্ষেত্রে। দুইটি চিকিৎসায় অনেক রোগীরই উপসর্গ দূর হয়। কিন্তু মারাত্মক বা বেয়াড়া অবসাদ এ দুই চিকিৎসাকে কাঁচকলা দেখিয়েই রোগীর মনে টিকে থাকে।
এই দুই চিকিৎসা থেকে তুলনামূলক জোরালো বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয় ট্রান্সক্রানিয়াল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশন বা টিএমএসতে। দ্বিতীয় পদ্ধতিকে সংক্ষেপে টিডিসিএস বলা হয়। পুরো নাম, ট্রান্সক্রানিয়াল ডাইরেক্ট কারেন্ট স্টিমুলেশন। এতে খুবই দুর্বল বিদ্যুৎ পাঠানো হয় মগজে।
রোইজার বলেন, টিএমএস এবং টিডিসিএস উভয় পদ্ধতিকে অবসাদ চিকিৎসায় আরো সুফলদায়ী করার গবেষণা-সমীক্ষা চলছে। তবে এখনো নতুন ডিবিএস তৈরির কাছাকাছি যাওয়া যায়নি বলেও স্বীকার করেন তিনি।
চার
মস্তিষ্ক-কম্পিউটার ইন্টারফেস (বিসিআই) হলো আরেক স্নায়ুপ্রযুক্তি বা নিউরোটেকনোলজি। তবে মনোচিকিৎসায় এ প্রযুক্তি এখনো ববহার করা হয়নি। ডিবিএস চিকিৎসায় যন্ত্র চালাতে যে পরিমাণ উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণ শক্তি বা ড্যাটা প্রসেসিং পাওয়ার লাগে, বিসিআইর ক্ষেত্রে লাগবে তার চেয়ে অনেক বেশি।
মস্তিষ্ক-কম্পিউটার ইন্টারফেসের প্রতীকী ছবি
এ খাতে এখনো যে গবেষণা চলছে তার মাধ্যমে স্নায়ু তৎপরতা বা নিউরাল অ্যাকটিভিটি বাইরের যন্ত্রে ধারণ করার ওপর মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। এটি হলো একমুখো তৎপরতা। ধরুন, বিসিআইয়ের মাধ্যমে জানা গেল একটি অঙ্গ নাড়ানোর ইচ্ছা হচ্ছে। মারাত্মক প্রতিবন্ধী রোগী সে ক্ষেত্রে নিজ মেরুদণ্ডের আঘাতপ্রাপ্ত অংশকে এড়িয়ে নিজের পেশীকে উদ্দীপ্ত করতে পারবে। কিংবা রবোটিক বাহুকে চালাতে সক্ষম হবে। কোনো কোনো রোগীর মগজের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। তাদের পক্ষে অন্য কোনোভাবেই যোগাযোগ করা সম্ভব নয়। এমন সব রোগীর জন্য যোগাযোগের নতুন জানালা হয়ে আসবে বিসিআই।
মস্তিষ্ক এবং কম্পিউটারের মধ্যে দ্বিমুখী যোগাযোগ করা গেলে মনো এবং স্নায়ু রোগের মানুষগুলোর সহায়তার নতুন সুযোগ পাওয়া যাবে। বিসিআই ব্যবসায়ে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয়ে গবেষণা করছে ইলন মাস্কের নিউরোলিংক। নিউরোলিংক বলছে, এ গবেষণার মাধ্যমে তারা উভয় হাত এবং পা অবশ হয়ে যাওয়া রোগীদের যোগাযোগে সহায়তা করবে। পাশাপাশি নানা মস্তিষ্কব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও চিকিৎসায় সহায়তা করবে। আগস্টে সিরিজ সি ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে আরো সাড়ে বিশ কোটি ডলার অর্থ যোগাড় করেছে বলে নিউরোলিংক জানায়।
তবে এর সবই এখনো ভবিষ্যতেরই শয্যায় সুপ্তিমগ্ন। রোইজার বলেন, বিসিআই এখনো উন্নয়নের সূচনা পর্বেই হামাগুড়ি দিচ্ছে। মানুষের স্নায়ু সংকেত সহজে পাঠের বিষয়টি অতি দূর ভবিষ্যতেরই অংশ।
পাঁচ
ডিবিএস যন্ত্রের মাধ্যমে অবসাদহীন নতুন জীবন পেয়ে আনন্দে আটখানা হয়েছেন সারাহ। অবসাদের ঘেরাটোপে বাধা পড়েছিল আমার জীবন। চলাফেরা একটু আধটু করতে পারতাম, কিন্তু অন্য কোনো কিছুই প্রায় করতে পারতাম না। এখন আমাকে চলাফেরা থেকে শুরু করে যা করতে পছন্দ করতাম সবই নতুন করে শিখতে হচ্ছে।
অবসাদ বা বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হতভাগাদের ঘিরে নানা অপবাদ, নিন্দা এবং কলঙ্ক রেখা আঁকা হয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসাদ চিকিৎসা প্রকল্প এই অধ্যায়ের ইতি টানবে। মনে প্রাণে এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সারাহ। তিনি বলেন, আমাদের সমাজের চারপাশে এ রোগে যারা ভুগছেন তাদের কাছ থেকে যে সব কথাবার্তা শোনা যায় তাতে মন ভেঙ্গে যায়।
সারাহর মনোচিকিৎসক স্ক্যানগোস বলেন, অবসাদের প্রকৃতি সম্পর্কে না জানার কারণেই এমন কলঙ্ক লেপা হয়। রোগটি সম্পর্কে জানতে পারলে কুধারণা থাকবে না। ইউসিএসএফের গবেষণা সমীক্ষায় এ রোগের জৈবস্তরগুলো সম্পর্কে জানতে পারবো। একবারে একটি করে রোগীকে নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে এটি জানতে পারবো বলে আশা করছি।
[ফাইনান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে]
আরো পড়ুন: অবসাদ সারবে বিদ্যুৎ-চিকিৎসায়!