খাদ্যপণ্যের দাম কমছে। তারপরও উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, দুনিয়ার খাদ্য উৎপাদন ও ক্ষুধার হার ২০২৩ সালে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
খাদ্যের চড়ামূল্য কি সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করেছে? ইউক্রেনের কৃষ্ণ সাগরের বন্দরগুলো ছেড়ে যাওয়ার সবুজ সংকেত দেয় গত সপ্তাহে কিয়েভ এবং মস্কোর মধ্যে জাতিসংঘের (ইউএন) মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত শস্য চুক্তি। কিন্তু এই সবুজ আলো জ্বলে ওঠার আগেই খাদ্যদ্রব্যের দাম কমে। মন্দার আশঙ্কা, রাশিয়ায় শষ্যের বাম্পার ফলন এবং পুনরুজ্জীবিত শস্য বাণিজ্য-প্রবাহের প্রত্যাশা –এই তিনে মিলে শস্যের দামকে টেনে নিচে নামিয়ে আনে।
দাম কমার মানে এই নয় যে খাদ্য সংকট কেটে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন যে অন্তর্নিহিত যে সব কারণ বাজারকে ঠেলে সর্বোচ্চ সীমায় নিয়ে গিয়েছিল তা রয়েছে। রয়েছে অপরিবর্তিত। যে বহুবিধ সমস্যা আগামী বহু বছর ধরে ক্ষুধার উচ্চ হার বজায় রাখবে। চলমান যুদ্ধটি সে সব সমস্যার অন্যতম।
বিভিন্ন কারণে যখন খাদ্যের দাম চড়া হয়ে উঠতে থাকে ঠিক তখনই বাধে ইউক্রেন যুদ্ধ। খাদ্যপণ্যের মূল্য চড়া করার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধানত খরা। খরার প্রভাবে পড়েছে প্রধান শস্য-উৎপাদনকারী দেশগুলোয়। বিশ্বমারি খাদ্য সরবরাহের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। কোভিড-১৯’এর লকডাউনে বিধ্বস্ত হয়েছে গরিব দেশসকল। এরমধ্যে যুদ্ধ কেবল বিরাজমান সংকটকে অধিকতর সংকটপূর্ণ করেছে।
খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত ক্যারি ফাউলার বলেন, “বর্তমান বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের পেছনে একাধিক প্রধান কারণ রয়েছে। আর এখানেই আগের অনুরূপ পরিস্থিতি থেকে বর্তমান পরিস্থিত স্বরূপটি আলাদা হয়ে গেছে।”
বিশ্লেষকরা মনে করেন, কারণগুলো মিলেমিশে যে সমস্যা তৈরি করেছে তার প্রকৃত প্রভাব হাড়েহাড়ে টের পাওয়া যাবে আগামী বছর। এমন কি এক বিশ্লেষক বলেন, "আমি ২০২২ এর চেয়ে ২০২৩’কে নিয়ে বেশি চিন্তিত।"
দিগন্তে অশনি সংকেত…
বিশ্ব খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে যুদ্ধ এক বড় বাধা হয়ে দেখা দিয়েছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই। ইউক্রেনের বন্দরগুলোকে অবরুদ্ধ করা হয়েছে। বিকল্প বাণিজ্য পথের ক্ষমতাও খুবই সীমিত। এতে রপ্তানির মাত্রা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। জুনে ইউক্রেন রপ্তানি করেছে ১০ লাখ টনেরও কম গম, ভু্ট্টা এবং বার্লি। ২০২১ সালের একই মাসের রপ্তানির তুলনায় এ পরিমাণ ৪০ শতাংশ কম। এ হিসাব প্রকাশ করেছে ইউক্রেনের কৃষি দপ্তর।
জুলাই মাস থেকে ইউক্রেনে ফসল তোলা শুরু হয়েছে। উৎপাদনকারীরা নতুন ফসল রাখার জায়গা হন্যে হয়ে তালাশ করছেন। খামারিরা যদি তাদের শস্য বিক্রি করতে না পারে তবে নতুন করে তার ধাক্কা পড়বে ২০২৩’এর ওপর। অন্যান্য সমস্যার সাথেও যুক্ত হবে এ সমস্যা। কারণ খামারিদের তখন বীজ বা সার কেনার তহবিল থাকবে না। এমন কি খামারিদের হয়ত নতুন কোনও শস্যও থাকবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন খাদ্য নীতি বিষয়ক এক কর্মকর্তা।
বসন্তকালে শেষে খাদ্যপণ্যের চড়া দাম অন্যান্য স্থানে উৎপাদন বাড়াতে প্রেরণা দিয়েছে। তবে শস্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের চড়া দাম হয়ত এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে সার ও পরিবহন এবং কৃষি যন্ত্রপাতি চালানোর কাজে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম বড় অন্তরায় হয়ে দেখা দিতে পারে।
শস্যের পুষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো নাইট্রোজেন সার। কিন্তু জ্বালানির দাম হু হু করে বাড়ছে। আসন্ন শীতে এ দাম আরও বাড়বে এবং এতে নাইট্রোজেন উৎপাদনেু বড় ধরণের সমস্যা হতে পারে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রধান অর্থনীতিবিদ আরিফ হোসাইন বলেন, আমরা যদি কৃষি উপকরণের সংকট সমাধান না করি বিশেষ করে সার সংকট তবে বর্তমানের ক্রয়ক্ষমতার সংকট আগামী বছর প্রাপ্যতার সংকট হয়ে দেখা দেবে।
এ অবধি খাদ্য নিয়ে প্রধান উদ্বেগ ছিল শস্য সরবরাহকে ঘিরে। বিশেষ করে এ উদ্বেগ ছিল গম এবং উদ্ভিজ্জ তেল নিয়ে। এ দুই খাদ্যপণ্যের অন্যতম বড় রপ্তানিকারক ইউক্রেন। তবে কোনও কোনও বিশ্লেষকের অন্তহীন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে এশিয়া জুড়ে খাদ্যের মূল ভিত্তি চালের দাম নিয়ে।
শীর্ষ স্থানীয় উৎপাদনকারী ভারত, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে ব্যাপক পরিমাণে চাল মজুদ রয়েছে। রপ্তানি নিয়ে বাধা-নিষেধকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ রয়েছে। গমের চড়া দামের ফলে অনেকেই হয়ত বিকল্প হিসেবে চালের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
দুনিয়ায় উৎপাদিত চালের মাত্র ১০ শতাংশই রপ্তানি করা হয়। কাজেই রপ্তানিকারকদের মধ্যে একটিমাত্র দেশও যদি এই রপ্তানির ওপর কোনও বাধা নিষেধ আরোপ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার বিপদজ্জনক প্রভাব পড়বে ।
২০০৭ এবং ২০০৮’এ বড় চাল রপ্তানিকারক দেশ ভারত এবং ভিয়েতনাম একযোগে এ খাদ্যপণ্যের রপ্তানির ওপর বাধা-নিষেধ চাপায়। ফলে আতংকিত হয়ে ফিলিপাইনের মতো বড় দেশগুলো চাল কিনতে শুরু করলে দাম দ্বিগুণের বেশি হয়ে যায়।
জাপানি বিনিয়োগ ব্যাংকের বিশ্লেষক নোমুরা বলেন, “চালের দামের ওপর গভীর নজর রাখা হয়েছে। যদি গমের দাম বৃদ্ধির কারণে বিকল্প হিসেবে চালের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে তবে চালের বিরাজমান মজুদ কমতে পারে। প্রধান প্রধান উৎপাদকরা বাধা-নিষেধ আরোপ করতে পারে। আর সব মিলিয়ে চালের দাম বেশি হতে পারে। এ ছাড়া এশিয়াতে চাল উৎপাদনের জন্য সার কতোটা পাওয়া যাবে সে দিকেও কর্মকর্তারা নজর রাখছেন।
[দ্য ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]
