Loading...

বিশ্ব খাদ্য সংকট: অশনি সংকেত ও মানুষের প্রভাব

| Updated: July 31, 2022 15:35:24


বিশ্ব খাদ্য সংকট: অশনি সংকেত ও মানুষের প্রভাব

ইউক্রেনে রাশিয়া আগ্রাসন চালানো অনেক আগেই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা রেকর্ড মাত্রায় গিয়ে ঠেকেছিল। বিশ্বমারি, খরা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে ২০২১ দুনিয়ায় ৭৭ কোটি মানুষকে অনাহারে দিনগুজরান করতে হয়েছে। ২০০৬ সালের পর এতো বেশি সংখ্যক মানুষকে আর না খেয়ে কাটতে হয়নি বলে জানায় জাতিসংঘ খাদ্য কৃষি সংস্থা বা এফএও

এফএও পূর্বাভাস মোতাবেক, ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে চলতি বছর অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা এক কোটি ৩০ লাখ গিয়ে ঠেকবে। ২০২৩ সালে অর্থাৎ আগামী বছর সংখ্যা এক কোটি ৭০ লাখ স্পর্শ করবে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, খাদ্যপণ্যে দাম এক শতাংশ বাড়লে বাড়তি আরও এক কোটি মানুষ চরম দরিদ্র অবস্থায় যেয়ে পড়েন

 আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়ার বেশির ভাগ এলাকাই প্রধান খাবার হিসেবে যে সব খাদ্যপণ্য ব্যবহার হয় সেগুলোর উৎপাদনের হারের চেয়ে ভোগের হার অনেক বেশি। কমোডিটি ডেটা গ্রুপ গ্রো ইন্টেলিজেন্স অনুসারে, এই এলাকার দেশগুলোকে বিশ্বব্যাপী মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ধকল সইতে হয়। ক্রমবর্ধমান খাদ্য মূল্যের ধকলে অনেক উদীয়মান অর্থনীতিকে নিজেদের মুদ্রার মূল্য পতনের বাড়তি বোঝা ঘাড়ে করে বইতে হচ্ছে

মধ্যপ্রাচ্য আফ্রিকার যেসব দেশ ইউক্রেন রাশিয়া থেকে আমদানির ওপর নির্ভরশীল তাদেরকে প্রকট প্রভাবের মোকাবেলা করতে হচ্ছে। সাহায্যের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে হাত পেতেছে মিশর। তুরস্কে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৮০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। লেবাননের সংকটকে গত ১০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হিসেবে তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক

এমনকি যে দেশগুলো রাশিয়া বা ইউক্রেন থেকে কিনছে না কিন্তু কৃষিপণ্যের উচ্চ হারে আমদানি করে তাদেরও চড়া আমদানি ব্যয়ের বোঝা বইতে হচ্ছে। রুটি, পাস্তা এবং রান্নার তেলের মতো প্রধান খাবারের দাম বাড়ছে দ্রুত। বুলগেরিয়ায় একটি রুটির দাম এক বছরের আগের তুলনায় জুন মাসে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। স্পেনে রান্নার তেলের ব্যয় এক বছর আগের তুলনায় এখন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আর পোল্যান্ডে চিনির দাম চড়েছে ৪০ শতাংশ

নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ভোক্তাদের ব্যয়ের একটি বড় অংশ যায় খাদ্যপণ্যে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের ধকল সামলাতে বা  ক্ষতিপূরণ করতে যেয়ে দিশেহারা মানুষ। কারণ মৌলিক খাদ্যপণ্যের তালিকা থেকে বাদ দেবে কোনটি! মিশরে খাদ্য এবং (অ্যালকোলমুক্ত) পানীয় খাতে গৃহস্থালি খরচের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি ব্যয় হয়। দেশটিতে মানুষ ২৪ শতাংশ বৃদ্ধির খাদ্য মূল্য বৃদ্ধির মুখে পড়ছে। ইথিওপিয়ায় খাদ্যের বাজেট আরও বেশি, সেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৩৮ শতাংশ

"কেউ যদি এমন একটি দেশে বাস করেন যেখানে, একটি ভাল দিনে, খাবারের জন্য তার ব্যবস্থা বা নিষ্পত্তিযোগ্য আয়ের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি ব্যয় করতে হয়, তাহলে এই মাত্রার ধকল মোকাবেলার জন্য খুব বেশি অবকাশ থাকে না," বললেন হুসেন

জাতিসংঘের কৃষি উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক তহবিলের সভাপতি গিলবার্ট হাউংবো বলেন, বিশেষ করে আফ্রিকায়আগামী বছর দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি রয়েছে।তিনি আরও যোগ করেন, এতে দেখা দিতে পারে সামাজিক অস্থিরতা এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক অভিবাসন

২০০৭-  এবং ২০১০-১১ সালে খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধির ফলে বিশ্বজুড়ে দাঙ্গা দেখা দিয়েছিল। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে তার অন্যতম প্রধান কারণ খাদ্যের আকাশচুম্বী দাম। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ অন্যান্য সরকার পর্যন্ত ভর্তুকি ব্যবহার করে সামাজিক অস্থিরতাকে ধামাচাপা দিতে পেরেছে

বার্কলেসের বিশ্লেষক মাইকেল পন্ড বলেন "এটা এক ধরণের  ব্যান্ড-এইড বা পট্টির কাজ করছে কিন্তু কখনো কখনো চাপ খুবই বেড়ে যায় সে সময় যে সরকারগুলো এই পট্টি দিতে পারে না সেখানে টগবগ করে ফুটতে থাকে সবকিছু।” 

স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা হবে না

সংকট আরও তীব্র হবে সে কথা সবাই মনে করেন না। জুলাই মাসের শুরুর দিকে, মরগান স্ট্যানলি খাদ্য মূল্যের ভবিষ্যত সম্পর্কে একটি আশাবাদী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ২০২৩ মূল্যবৃদ্ধি যে আশঙ্কা করা হয়েছে তার চেয়ে কম হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তেজনা কমে এলে কৃষকদের দিয়ে শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। ইউক্রেনেও কাজ করতে হবে। এতে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি কমবে

যদিও কিছু আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীরা আশাবাদী। তার মনে করছেন, ইউক্রেনের শস্য রপ্তানির জন্য কৃষ্ণ সাগরের বাণিজ্য পথ পুনরায় চালু করার মানে হলো "কার্যত যুদ্ধবিরতি" শুরু করার সংকেত। তবে রাশিয়ার মতলব নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইউক্রেনের বন্দরগুলোর আশেপাশের অঞ্চলে রাশিয়া এখনো হামলা চালিয়ে যাচ্ছে

এমনকি যুদ্ধ যদি আগামীকালও শেষ হয়ে যায়, তবে ইউক্রেনের কৃষি  বন্দর অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করা দরকার পড়বে। এবং এর উপকূলে পেতে রাখা মাইনগুলো সরাতে হবে। এদিকে দেশটির কৃষকরা নিজ নিজ জমিতে কাজ করতে ফিরে আসতে সক্ষম বা ইচ্ছুক নাও হতে পারেন

অনেক পশ্চিমা সরকারী কর্মকর্তা এবং বিশ্লেষক আশা করছেন বর্তমান খাদ্য সংকট বছরের পর বছর ধরেই থাকবে। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্বমারির পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে অন্যান্য সংঘাতও দেখা দিচ্ছে। পন্ড বলেন, "এই কারণগুলির যে কোনও একটিও খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে উঁচুতে ঠেলে দেয়াকে অব্যাহত রাখতে পারে।

শস্য এবং উদ্ভিজ্জ তেলের জন্য ইউক্রেনের উপর নির্ভরশীল দেশগুলো আমদানির উত্সগুলোকে বিবিধমুখী করতে পারে। তবে এর অর্থ হলো যে দাম দীর্ঘ সময়ের জন্য চড়াই থাকবে। এখানে কাহিনিটি জ্বালানি ক্ষেত্রের মতোই হবে বলে চাথাম হাউসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো লরা ওয়েলেসলি মনে করেন। "সামগ্রিক যে চিত্রটি দেখা যাচ্ছে  তা হলো, একদিকে  সরবরাহে টানাপোড়েন থাকবে এবং অন্যদিকে চড়া মূল্য বজায় থাকবে। শীঘ্রই থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না।

ভোক্তাদের স্থায়ীভাবে খাদ্যের চড়া মূল্য বৃদ্ধিতে অভ্যস্ত হতে হবে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা। লন্ডনভিত্তিক অর্থনৈতিক বিষয়ক স্বতন্ত্র গবেষণা সংস্থা  ক্যাপিটাল ইকোনমিক্স পূর্বাভাস দিয়েছে যে  অর্থনৈতিক আবহাওয়ার অস্থিরতার কারণে বাজার "ঐতিহাসিকভাবে চড়া মূল্যে থাকবে" গবেষণা সংস্থার প্রধান পণ্য অর্থনীতিবিদ ক্যারোলিন বেইন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের গত ফলে কয়েক বছরে ধরেই "অনস্বীকার্যভাবেই আমরা কম ফলন এবং কম ফসল দেখতে পাচ্ছি।

কোনও কোনও বিশ্লেষক বিস্ময় প্রকাশ করে বলেনবিশ্বের সব কোণে কম দামে খাদ্যপণ্যসহ পণ্য সরবরাহ করার যে বাণিজ্য ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল ইউক্রেন যুদ্ধ সে বাণিজ্য ব্যবস্থাকে ভেঙে  চুরমার করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে কিনা!

ওয়েলেসলি বলেন যে বিশ্বব্যাপী খাদ্য ব্যবসায়িক ব্যবস্থা যার মাধ্যমে আমাদের সব ধরণের খাবার আনানেওয়া করতে পারতাম তা  শীঘ্রই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে না। "এর ফলে সম্ভবত  খাদ্য সারের  চড়া দাম অব্যাহত থাকবে এবং বাণিজ্য নির্ভরতার পুনর্বিন্যাস করতে হবে। সম্ভবত আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে আরও বেশি নজর দেওয়ার কথা ভাবতে হবে।

[দ্য ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]


আরো পড়ুনঃ

বিশ্ব খাদ্য সংকট: ভবিষ্যত কতোটা ভয়াবহ হবে?

Share if you like

Filter By Topic