Loading...

বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কেন?

| Updated: January 24, 2022 18:59:04


বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কেন?

সম্প্রতি দেশে দুটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে গেছে। দুটি ঘটনারই চূড়ান্ত ভুক্তভোগী এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম - আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীরা। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদ ক্রিয়াশীল নয়, শিক্ষকরাও নানা দলে-উপদলে বিভক্ত এবং ছাত্রনেতারা দলীয় লেজুরবৃত্তিতে ব্যতিব্যস্ত, সেহেতু সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে কার্যত দাঁড়ানোর কেউ নেই।

১.
অসদাচরণের অভিযোগ তুলে গত ১৩ই জানুয়ারি শাহ জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রভোস্ট জাফরিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিসহ মোট তিনটি দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন।

নানা রকম তর্ক-বিতর্ক ও মিটিং-মিছিলের পর গত শনিবার বিকালে ছাত্র উপদেষ্টা ও প্রক্টরের উপস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন দ্বারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আক্রান্ত হন। এরপর আন্দোলন পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ছাপিয়ে গেলে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাতে সংহতি জানায়।

ছাত্রলীগের হামলার পর ছাত্রীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দাবি না মানা পর্যন্ত ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন অব্যাহত থাকবে। সর্বশেষ উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমদকে অবরুদ্ধ করে রাখেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।

বাগ্‌বিতণ্ডার একপর্যায়ে পুলিশ ২৭টি রাবার বুলেট ও ২১টি সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ার পাশাপাশি লাঠিপেটা করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে উপাচার্যকে মুক্ত করে তাঁর বাসভবনে নিয়ে আসে। এ সময় অন্তত ৫০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়টি অনির্দিষ্ট কালের জন্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

বলাবাহুল্য, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিটি আন্দোলনই দাবি-দাওয়া, আন্দোলন, আন্দোলন পন্ডে ছাত্রলীগের হামলা, উপাচার্যের অপসারণের দাবি, পুলিশি নির্যাতন ও পরে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্যে বন্ধ এই চক্রাকারে চলতে থাকে। জাবি, ঢাবি, চবি, রাবি ও ববি এর আন্দোলনগুলোতে এই বৃত্তটিই পরিলক্ষিত হয়েছে।    

কেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়?

বর্তমানকালের শিক্ষকেরা শিক্ষক কম প্রশাসক বেশি। একই যোগ্যতা সত্ত্বেও নির্বাহী বিভাগে চাকরি করে একজন প্রশাসক যে ক্ষমতাচর্চা করতে পারেন তা একজন শিক্ষক পারেন না।

তাছাড়া এখনকার শিক্ষকদের সম্মানি যে কম তা বলা যাবে না। কিছুকাল আগেও আমাদের প্রথিতযশা শিক্ষকেরা কোনো প্রশাসনিক পদে যেতে চাইতেন না। তারা দেশের জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে গবেষণা ও জ্ঞান দান করে গেছেন।

এখন অনেক শিক্ষক অনুরাগ থেকে শিক্ষকতায় আসেন না বরং অন্য কোনো পেশায় সুযোগ না পেয়েই এখানে জড়িত হন। তাই তাদেরকে ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স বা হীনমন্যতায় ভুগতে দেখা যায়। ফলে তাদের সীমিত ক্ষমতার বলির পাঠা হন সাধারণ ছাত্ররা।

এছাড়া শিক্ষকতা পেশার আদর্শিক ভিত্তিটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থা এর প্রধান অন্তরায়। শাবিপ্রবি উপাচার্য পূর্বে দুটি ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। কর্তৃপক্ষ তাকে উপাচার্য পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকে তার সফলতা বা ব্যর্থতার বিষয়টি আমলে নিতে পারতেন।

যিনি একটি ব্যাংকই ঠিকমত পরিচালনায় ব্যর্থ হলেন তাকে কিভাবে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো? দলীয় বিবেচনা, ঘুষ-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ খবরের কাগজে উঠে আসে প্রতিনিয়ত।

উপরন্তু, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন জ্ঞানের তেমন চর্চা নেই বললেই চলে। অন্যান্য পেশাজীবীদের মতো শিক্ষকদেরও সংগঠন করার অধিকার থাকতেই পারে। কিন্তু সেই সমিতির কার্যক্রম হওয়া উচিৎ ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীবান্ধব।

কিন্তু কোনো শিক্ষক সমিতি শিক্ষাখাতে বাজেট বৃদ্ধি, গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি, ছাত্রদের আবাসন সমস্যার সমাধান ও ছাত্রদের কর্মবাজার উপযোগী শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্যে কোন আন্দোলন করেছেন বলে সাধারণত শোনা যায় না।

রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কর্মকান্ডের দুর্নীতির ভাগ-বাটোয়ারা ও নিজেদের প্রভাব বলয় তৈরিতেই শিক্ষকদের বেশি ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। সব শিক্ষকই যে এরকম করে থাকেন তা নয়। এখনও ভালো শিক্ষক আছেন। কিন্তু দুর্নীতিপরায়ণ শিক্ষকেরা ভাল শিক্ষকদের কোণঠাসা করে রাখেন।

শুধুই তা-ই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসনের যে স্পিরিট তা হারিয়ে ফেলেছে। রাষ্ট্র যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ দেবে, কর্মকান্ডে হস্তক্ষেপ করবে তখন দলীয় আনুগত্যের লোক শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাবেন, এটিই স্বাভাবিক।    

২.
গত ১২ জানুয়ারি, ২০২২ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি’র সামনে কাওয়ালি গানের আসর বসিয়েছিল একদল শিক্ষার্থী। এই অনুষ্ঠানে হামলা করে মঞ্চ ও চেয়ার ভাঙচুর এবং আয়োজক ও শিল্পীদের মারধরের জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করেছেন আয়োজকেরা।

পুরো বাংলাদেশে সভা-সমাবেশ করার অনুমতি সীমাবদ্ধ হয়েছে অনেক আগেই। যদি মূলধারার দুয়েকটা দল অনুমতি পেয়েও যায় সেখানে কিভাবে তা ভন্ডুল করা যায় তার ছক কষা হয় সূক্ষ্মভাবে। হামলা- মামলা, পূর্বের মামলা পুনরায় জাগ্রত করা, গায়েবি মামলায় আসামি বানিয়ে গ্রেফতার এগুলো ঘটে হর হামেশাই।

খোদ একটি রাজনৈতিক দল যেখানে অপর একটি রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম সহ্য করতে পারে না। সেখানে রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন অপরকে সহ্য করবে এটা ভাবা অবান্তর।

কাওয়ালী অনুষ্ঠানের হামলা বিতর্কে অনেকেই অনেক কথা বলেছেন, কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুর একটি উদ্ধৃতি দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন যেহেতু বঙ্গবন্ধু এটি পছন্দ করতেন সুতরাং এটি আয়োজন করা জায়েজ। আবার কেউ কেউ এটি ইসলামিস্টদের কাতারে ফেলতে চেয়েছেন ইত্যাদি।

কিন্তু সবাই যেই বিষয়টি সতর্কতার সাথে এড়িয়ে গিয়েছেন তা হল আধিপত্যের দ্বন্দ্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সারাদেশ থেকে ছাত্র আসে বলে, মিডিয়ায় আলোড়ন বেশি হয় বলে যেকোন ঘটনা আলোচিত হয় বলে, এখানে মত প্রকাশের মোটামুটি সুযোগ রয়েছে, সভা-সমাবেশও করা যায়।

তবে ঢাকার বাইরে আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে বা কোনো জেলা শহরে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের ছত্রছায়ার বাইরে গিয়ে যদি কেউ কোনো আয়োজন করতে চায়, তাহলেই সে আক্রমণের শিকার হয়। সেটি কাওয়ালীই হোক আর মাইজভান্ডারি, ভাটিয়ালি, ব্যান্ড দল বা অন্যকিছু। কাজেই, ধর্মীয় মতভেদ, উগ্রজাতীয়তাবাদের আলোচনা দূরে রেখে আসল ব্যাপারটিতে নজর দেওয়া জরুরি। 

 

লেখক সেন্টার ফর গভার্ন্যান্স স্টাডিজের বাজেট বিভাগের নির্বাহী কর্মকর্তা।
alif@cgs-bd.com

Share if you like

Filter By Topic