বিমানবন্দর থেকে ফেরার পথে টোল প্লাজার কাছে ডাকাতি, ৩ প্রবাসীর মামলা ‘নেয়নি’ থানা


এফই অনলাইন ডেস্ক | Published: February 26, 2022 10:23:41 | Updated: February 26, 2022 10:40:24


একই রাতে পৃথক ডাকাতির শিকার হওয়া তিন প্রবাসী

বিমানবন্দরের থেকে রাত ১২টার দিকে চৌদ্দগ্রামের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়েন তারা তিন জন। রাত আড়াইটা থেকে ৩টার মধ্যে তাদের মাইক্রোবাস দুটি মেঘনা সেতুর টোল প্লাজার আগে যানজটে থাকা অবস্থায় হানা দেয় ডাকাতরা। অস্ত্রের মুখে তিনজনেরই স্বর্ণালঙ্কার, পাসপোর্টসহ সব জিনিস লুট করা হয়। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

এ তিনজন আবার পরস্পরের আত্মীয়। এদের মধ্যে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের জাহিদ হাসান পাঁচ বছর ধরে সৌদি আরব প্রবাসী। সম্প্রতি বিয়ে ঠিক হয় তার।

হবু স্ত্রীর জন্য ১৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কারসহ বেশ কিছু প্রসাধনও সৌদি থেকে এনেছিলেন তিনি, সঙ্গে এনেছিলেন বিয়ের খরচের জন্য ৩০ হাজার রিয়েল। কয়েক মিনিটের আকস্মিক হানায় সবই হারিয়েছেন তিনি।

তার গ্রামেরই আরও দুজন প্রবাসীসহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন জাহিদ। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রায় কাছাকাছি সময়ে রওনা হন তারা। এরপর টোল প্লাজায় ডাকাতদের কবলে পরে বিয়ের স্বর্ণালঙ্কারসহ সব কিছুই হারিয়েছেন জাহিদ। তার বাকি দুই আত্মীয়ও খুইয়েছেন সবকিছু।

ঘটনাটি গত ১৮ ফেব্রুয়ারির। শুক্রবার তারা তিনজন ঢাকায় এসেছিলেন বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে অভিযোগ দিতে। তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন আর্মড পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল হান্নান রনি। এরপর তাদের নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

তবে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, থানা কেন তাদের মামলা নেয়নি আমি সেটা দেখছি। আর ভুক্তভোগী ওই প্রবাসীদের শনিবার অফিসে আসতে বলেছি। তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই কথা হয় ডাকাতির শিকার তিন প্রবাসীর। ঘটনার আকস্মিকায় অনেক পরিশ্রমে জমানো সঞ্চয় থেকে দেশে আনা অর্থ ও জিনিসপত্র হারিয়ে খুবই মর্মাহত যেমন তারা, তেমনি থানা পুলিশের ভূমিকায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ। আবার ভয়ও পাচ্ছেন এসব বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে।

ডাকাতির শিকার হওয়া এ তিনজন হলেন- জাহিদ হাসান, গেয়াসউদ্দীন সবুজ ও কাজী জামালউদ্দীন। তারা পরস্পরের আত্মীয়। তিনজনেরই বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের আলকরা ইউনিয়নে।

তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডাকাতির পরদিন তারা নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা না করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দেয়।

পুলিশের কথায় ভুক্তভোগীদের একজন সোনারগাঁ থানায় পাসপোর্ট হারানোর জিডি করেছেন। আরেকজন পাসপোর্ট হারানোর জিডি করেছেন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানায়।

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে গেয়াসউদ্দীন বারবারই বলছিলেন, ভাই আমরা তো আবার বিদেশ যাইতে চাই। পাসপোর্ট তুলতে পরে ঝামেলা হইবো নাতো?

সৌদি আরবে জাহিদ হাসানদের পারিবারিক ব্যবসা আছে। তার ভাই সেখানে ২৫ বছর ধরে রয়েছেন। সেই সুবাদে বছর পাঁচেক আগে তিনিও সেখানে পাড়ি জমান। সম্প্রতি পরিবার থেকে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। সেজন্য দেশে আসেন তিনি। তার সঙ্গে একই উড়োজাহাজে ফেরেন তারই গ্রামের সবুজ ও জামালউদ্দীন।

জাহিদ বলেন, সেদিন (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টার দিকে ফ্লাইট ল্যান্ড করল। ইমিগ্রেশন শেষ করে ব্যাগ নিয়ে বের হতে হতে রাত ১২টা। গ্রাম থেকে একটা মাইক্রোবাস ভাড়া নিয়ে তাকে নিতে এসেছিলেন বাবা-মা। সেই গাড়িতে তিনি কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

আর গেয়াসউদ্দীন ও জামালউদ্দীন গাড়ি ভাড়া করেছিলেন রাজধানীর উত্তরা থেকে। ব্যাগ-বোঁচকা গাড়িতে তুলে তারা বিমানবন্দর রেস্তোঁরায় গিয়ে নৈশভোজ সারেন। এরপর রওনা দেন।

জাহিদের ভাষ্য, রাত আনুমানিক ২টা থেকে আড়াইটার দিকে তাদের মাইক্রোবাসটি মোগরাপাড়া মেঘনা সেতুর আগে যানজটে পড়ে। এসময় হঠাৎই গাড়ির কাঁচ ভেঙে ফেলে ডাকাতেরা। আক্রমণকারীরা সংখ্যায় ছিল আনুমানিক ১২ জনের মতো। তাদের হাতে ধারালো অস্ত্র ছিল।

এসব দিয়ে জিম্মি করে লাগেজ, টাকা-পয়সা, মুঠোফোন সব নিয়ে যায় ডাকাতেরা। লাগেজে ১৫ ভরি স্বর্নালঙ্কারসহ বেশ কিছু জিনিসপত্র ছিল। ৩০ হাজার নগদ রিয়েল ছিল। সবই নিয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ডাকাতেরা তার বৃদ্ধ বাবা-মা বাচ্চু মিয়া ও আনোয়ারা বেগমকেও মারধর করে দুজনেরই মুঠোফোন কেড়ে নেয়। এসময় বাচ্চু মিয়ার পকেট থেকেও সাত হাজার টাকা নিয়ে যায়।

তার অভিযোগ, ঘটনার পরপর সেখানে উপস্থিত দুজন পুলিশ সদস্যকে দেখতে পেয়ে তারা ঘটনা জানান। সাহায্য করার পরিবের্তে ওই দুই পুলিশ সদস্য তাদের সোজা বাড়ির দিকে চলে যেতে বলেন।

এরপর জাহিদ জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ এ ফোন করেন। ৯৯৯ এর কর্মী তাকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানায় গিয়ে অভিযোগ জানাতে বলেন। কিন্তু তার মা এতোটাই ভীত ছিলেন যে তিনি আর কোথাও যেতে চাননি। সরাসরি গ্রামে চলে যান তারা। পরদিন চৌদ্দগ্রাম থানায় পাসপোর্ট হারানোর জিডি করেন জাহিদ। গ্রামে গিয়ে জানতে পারেন সবুজ ও জামালউদ্দীনও ডাকাতের কবলে পড়েছিলেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সবুজ বলেন, তিনি ও জামালউদ্দীন উত্তরা থেকে একটি গাড়ি ভাড়া করেন। রাত আড়াইটা থেকে ৩টার মধ্যে তারা মোগরাপাড়া এলাকায় টোলপ্লাজার আগেই ডাকাতের কবলে পড়েন। জাহিদদের মতো একইভাবে দেশি অস্ত্র নিয়ে ডাকাতেরা হামলা চালায়।

তিনি বলেন, আমার কষ্টের টাকার মালামাল আমি ছেড়ে দিতে চাইনি। এসময় ডাকাতদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়।

এতে এক পর্যায়ে হাতও কেটে যায় জানিয়ে তিনি বলেন, ডাকাতেরা মুখোশ পরিহিত ছিল, কয়েকজনের মাথায় ছিল হেলমেট।

পরদিন তিনি সোনারগাঁ থানায় যান ডাকাতির বিষয়ে অভিযোগ দিতে। কিন্তু পরে হয়রানি হতে পারে বলে পুলিশ তাকে জিডি করার পরামর্শ দেন। এরপর থানায় পাসপোর্ট হারানোর জিডি করে এলাকায় ফিরে যান।

পাসপোর্ট হারানোর জন্য সোনারগাঁ থানায় করা জিডিতে সবুজ উল্লেখ করেছেন, মেঘনা সেতুর টোল প্লাজার আগে তার পাসপোর্টটি হারিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সেটা পাওয়া যায়নি।

সুবজ ও জামালউদ্দীন দুজনই সৌদি আরবে গাড়ি চালান। সবুজ বলেন, ভাই আমি সেই কবে থিকা বিদেশ খাটতাছি। কিন্তু কিছুই করবার পারিনি। বাড়িতে যে একটা ঘর দিমু সেইডাও পারিনি। এর মধ্যে আমার সব মালামাল ডাকাতি হইছে শুইনাই মা অসুস্থ হইয়া গেছে। দুইদিন হ্যারে নিয়া হাসপাতারে দৌড়াদৌড়ি।

তার সঙ্গে জামালউদ্দীনও গিয়েছিলেন সোনারগাঁ থানায়। সেই অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে জামালউদ্দীন বলেন, থানায় আমাদের বলছে তোমরা এইখানে কেইস কইরা কী করবা। যেইডা হওয়ার হেইডা হই গ্যাছে। আমরা বলছি আমাগো জিনিসপত্র তো সব লই গ্যাছে, আমরা একটা নিরাপত্তা চাইতিছি।

আমরা প্রবাসী, দেশে আইসা যদি নিরাপত্তাটা না পাই নিরাপত্তাডা কে দেবে? পুলিশ বলছে, তোমরা এখন মামলা কইরো না, তোমাগো পাসপোর্ট যখন নিয়া গেছে পাসপোর্ট হারায় গেছে বলে একটা জিডি কর।

তার প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকার মালামাল ডাকাতেরা লুটে নিয়ে গেছে বলে জানান তিনি।

তারা যে গাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন, সেটরি চালক মোজাম্মেল হকের ফোনটিও নিয়ে যায় ডাকাতেরা। পরে চালক নতুন সিমকার্ড তুলেছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, মোগরাপাড়া সেতুর টোলের আগে তারা জ্যামে পড়েন। আশপাশে আরও অনেক গাড়ি ছিল। এরমধ্যেই ১০-১২ জন ডাকাত ধারালো অস্ত্র নিয়ে এসে গাড়িতে কোপাতে শুরু করে। ডাকাতেরা কোনোভাবে গাড়ির লক ভেঙে দরজা খুলে যাত্রীদের ব্যাগ-বোঁচকা টেনে নিয়ে চলে যায়। এসময় ডাকাতদের অস্ত্রের আঘাতে মোজাম্মেলের হাতও কেটে যায়।

পরদিন মোজাম্মেলও থানায় গিয়েছিলেন বলে জানান সবুজ। তবে পুলিশের কাছে কোনো প্রতিকার পাননি।

জানতে চাইলে বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মহাসচিব নূর খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ডাকাতির মতো ফৌজদারী অপরাধে জিডি নেওয়ার কোনও সুযোগই নেই।

অপরাধীর বিরুদ্ধে পুলিশ পদক্ষেপ নেবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের পুলিশ এমন একটা ব্যবস্থা চালু করেছে যাতে তারা অপরাধের ঘটনাগুলো দেখেও না দেখার ভান করে এড়াতে চায়। তিনি বলেন, অপরাধের শিকার ব্যক্তিরা থানায় গেলে পুলিশ এমন সব পরামর্শ দেয় তাতে মানুষের এমন মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে ওই অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশের কোনো আন্ডারস্ট্যান্ডিং আছে। দীর্ঘদিন ধরে এমন ব্যবস্থা চলছে।

এর একটা কারণ হতে পারে যে, কোনো থানায় ডাকাতির মামলা নিলে পুলিশের ওপর তা উদঘাটনের একটা চাপ তৈরি হয়। এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ইন্ডিকেটরে ওই থানার অবস্থান নিচে নেমে যায়। যার কারণে তারা মামলা নিতে চান না। কিন্তু এ ব্যবস্থাকে বদলাতে হবে।

Share if you like