২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে ‘রূপকল্প ২০২১’ শিরোনামে আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছিল, তাতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল বিদ্যুৎ খাত। সরকার সেই লক্ষ্যে পৌঁছে গিয়েছিল, শতভাগ বিদ্যুতায়ন সম্পন্ন করে আরেকটি নির্বাচনে এ সাফল্য প্রচারের আগেই ইউক্রেইন যুদ্ধ ঘটাল ছন্দপতন। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
দেশের চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করার মতো কেন্দ্র থাকার পরও জ্বালানির অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি ফারাকে প্রায় হারিয়ে যাওয়া লোড শেডিং আবার এসেছে ফিরে।
গ্যাস আমদানি করতে গিয়ে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে দিতে সরকার হাঁপিয়ে উঠার পর সেখান থেকে সরে আসার উদ্যোগ নিতেই লাগল এ ঝঞ্ঝাট।
ভর্তুকি কমাতে হলে জ্বালানি আমদানির রাশ টানতে হবে। আর তাতে সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। আর বিদ্যুৎ সরবরাহ কমলে কমবে শিল্পোৎপাদন।
এই উভয় সঙ্কটের মধ্যে আবার ভর্তুকি দিয়ে উৎপাদন ধরে রাখতে গেলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিকল্প নেই। বর্তমানের চেয়ে দাম বাড়লে চড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির পারদ আরও চড়বে। তাতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়বে।
সব মিলিয়ে এক জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে সরকারকে। আপাতত তিন মাস ‘কষ্টকর’ পরিস্থিতি সামলে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পুরোদমে চালু এবং আমদানির বিদ্যুৎ এলে আবার সহনীয় পরিস্থিতিতে যাওয়ার আশায় রয়েছে সরকার।
তাই আপাতত বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থান বিদ্যুৎহীন রেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কোথায় কত সময় বিদ্যুৎ থাকবে না, তা নির্ধারণ করার জন্য কাজ চলছে। চিন্তা হচ্ছে, লকডাউনের সময়ের মতো হোম অফিস চালু এবং অফিসের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা যায় কি না?
ইতোমধ্যে আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ করা ও বিয়েশাদীসহ সব ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সম্পন্ন করা, এসি চালাতে সংযমী হওয়ার এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে সরকারের তরফ থেকে।
কিন্তু এসব পদক্ষেপ কী সঙ্কট মোকাবেলায় যথেষ্ট? সঙ্কটের গভীরতাই বা কতটুকু? যখন দেশে নিজস্ব গ্যাসের উৎপাদন দিন দিন কমছে এবং যুদ্ধের অভিঘাতে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম ক্রমশই চড়ছে, তারমধ্যে পরিস্থিতি সামাল দিতে আর কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে সরকার?
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী- জানতে চাওয়া হলে জ্বালানি নীতি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উত্তরণ ঘটানোর খুব একটা পথ এ মুহূর্তে নেই।”
বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় দেশজুড়ে ফিরে এসেছে লোড শেডিং।
তবে সাময়িক সময়ের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলোকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, “আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখেছি। জ্বালানি না পেলে কীভাবে চালাব? লোড শেডে কিছুদিন থাকতে হবে।”
ইউক্রেইন যুদ্ধ বিশ্বের জ্বালানির বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, তাতে ধনী দেশগুলোরও ভোগার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।
সঙ্কট যেখানে
বাংলাদেশের ১৫২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ভারত থেকে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট আমদানি এবং ক্যাপটিভসহ মোট স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।
গত এপ্রিলে দেশে সর্বোচ্চ ১৪ হাজার ৭৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড হয়। আর ১ জুলাই থেকে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় ১৫০০ মেগাওয়াটের মত কম বিদ্যুৎ উপাদন হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার বৈঠকে উপদেষ্টা বলেন, এখন দৈনিক চাহিদা ১৪ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কৃচ্ছ্রতা সাধনের মাধ্যমে চাহিদা ১২ হাজার মেগাওয়াটে নামিয়ে আনা সম্ভব। আর তা করা গেলে দৈনিক হয়ত ৫০০ মেগাওয়াটের মত লোডশেডিং হবে। সেটা রেশনিংয়ের মাধ্যমে অতিক্রম করা যাবে।
বর্তমানে উৎপাদিত এই বিদ্যুতের ৫১ শতাংশই আসে গ্যাসচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে। এগুলোর জন্য যে পরিমাণ গ্যাসের প্রয়োজন, তা দেশে উৎপাদিত মোট গ্যাসের প্রায় কাছাকাছি।
পেট্রোবাংলার হিসাবে, বৃহস্পতিবার দেশে ২৩৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হয়েছে। বিপরীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চাহিদা ছিল ২২৫২ মিলিয়ন ঘনফুট।
কিন্তু পেট্রোবাংলা শিল্প, বাণিজ্য, পরিবহন, সার কারখানা, আবাসিকে গ্যাস সরবরাহ ঠিক রেখে চাহিদার ৪০ ভাগের মতো গ্যাস দিতে পারছে বিদ্যুতের জন্য।
গ্যাসের বিকল্প উৎস এখন আমদানি করা এলএনজি। দিনে প্রায় ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি হচ্ছিল, যে পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে।
গত ১ জুলাই থেকে স্পট মার্কেটের এলএনজি আমদানি বন্ধের পর গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে বিদ্যুতের জন্য। সেদিন থেকেই ফিরেছে লোড শেডিং।
হঠাৎ করেই এলএনজি আমদানি বন্ধ হল কেন?
বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, “যে এলএনজির দাম ছিল প্রতি ইউনিট ৫ ডলার, সেটা এখন ৪১ ডলার হয়ে গেছে। ৭১ ডলারের ডিজেল এখন ১৭৭ ডলারে উঠে গেছে। ব্লুমবার্গসহ কিছু মিডিয়া সেটা ৬০০ ডলারে পৌঁছে যাওয়ার আভাস দিচ্ছে।”
গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা মাথায় রেখে ২০১৮ সালের অগাস্ট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করে। এদিকে ২০১৬ সালের পর থেকে দেশে অভ্যন্তরীণ গ্যাসের উৎপাদন কমতে শুরু করে। চাহিদা বাড়তে থাকায় এলএনজি আমদানিও বাড়তে থাকে।
দেশে উৎপাদন কমায় স্বাভাবিকভাবেই এলএনজির উপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি কেনার চুক্তি রয়েছে। তেলের ওঠানামার উপর এই দাম নির্ধারণ নির্ভর করে।
কিন্তু চাহিদা বাড়তে থাকায় বাংলাদেশ এই চুক্তির বাইরে গিয়েও স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যের এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই দামি এলএনজিই এখন গলার কাঁটা হয়েছে। যুদ্ধের বাজারে গ্যাসের সঙ্কটে স্পট মার্কেটে দাম বাড়ছে হু হু করে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “স্পট মার্কেট থেকে যেটা আমদানি করতাম, সেটা হঠাৎ করে ৩/৪/৫ গুণ বেড়ে গেছে। এটা প্রাইসকে বিরাটভাবে এফেক্ট করে ফেলেছে। লংটার্ম গ্যাসে কিন্তু আমাদের প্রাইস ওরকম এফেক্ট করে নাই।
“রাশিয়ানরা গ্যাস বন্ধের হুমকি দেওয়ার ফলে ইউরোপের দেশগুলো স্পট থেকে কিনতে শুরু করল। তখনই দাম বাড়তে শুরু করল।”
দীর্ঘমেয়াদের চুক্তি থাকায় কাতার ও ওমান থেকে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে কোনো সঙ্কট নেই বলে দাবি করেন তিনি।
দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমছে
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে দেশে গ্যাসের বার্ষিক উৎপাদন ছিল ৭০৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন কিউবিক ফিট (বিসিএফ)।
পুরোনো কূপগুলোর সংস্কার, কমপ্রেসার বসিয়ে উৎপাদন বাড়ানো ও বেশ কিছু নতুন কূপ আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে ২০১৫-২০১৬ অর্থবছর পর্যন্ত উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। ওই বছর বার্ষিক উৎপাদন ৯৭৩ দশমিক ২ বিসিএফ হয়েছিল। অর্থাৎ ওই বছর গ্যাসের দৈনিক গড় উৎপাদন ছিল ২৬৭৩ দশমিক ৬২ মিলিয়ন ঘনফুট।
পেট্রোবাংলার হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে বার্ষিক উৎপাদন কমতে শুরু করেছে। ওই বছর ৯৬৯ দশমিক ২ বিসিএফে নেমে আসে। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ৯৬৮ দশমিক ৭ বিসিএফ, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৯৬১ দশমিক ৭ বিসিএফ এবং ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ৮৮২ দশমিক ৬ বিসিএফে নেমে আসে।
সংস্থাটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে দৈনিক গড় উৎপাদন ছিল ২৪২৪ দশমিক ৭২ মিলিয়ন ঘনফুট।
সর্বশেষ গত ৬ জুলাইয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন ছিল ২৩৫৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরের দৈনিক গড় উৎপাদনের তুলনায় এদিন উৎপাদন কমেছে ৩১৯ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ঘনফুট।
নসরুল হামিদ বলেন, “২০০৯ থেকে বিভিন্ন কূপ খনন করে আমরা ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পেরেছিলাম। কিন্তু বৃদ্ধি যেটা পেয়েছে সেটা খুব বড় সিগনিফিক্যান্ট অ্যামাউন্ট না। স্থানীয় গ্যাস ২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু কমবেশি ২০১৮-১৯ পর্যন্ত পেয়েছি।
“৩৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদা ধরে ৭০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের যে গ্যাপ, সেটা আমরা আমদানি করে মেটাতাম। কিন্তু এরমধ্যে স্থানীয় উৎপাদন ২৭০০ থেকে কমে ২৩০০ হয়ে গেছে। ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট আমরা নিয়মিত আমদানি করতাম। কিন্তু গত বছরখানেক ধরে বিশেষ করে যুদ্ধ লাগার পরেই এই গ্যাসের প্রাইস জাম্প করেছে। স্বাভাবিকভাবে স্পট মার্কেট থেকে কেনা বন্ধ করতে হয়েছে।”
বৃহস্পতিবার উপদেষ্টার নেতৃত্বে বৈঠকে জ্বালানি সচিব মাহবুব হোসেন বলেছেন, ২০২৫ সালের মধ্যে তারা দেশের গ্যাস আরও ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছেন।
ম তামিম বলেন, “আমাদের নিজস্ব গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির পরিকল্পনা, যেটা এখন পেট্রোবাংলা নিচ্ছে, সেটা যদি গত ৪/৫ বছর আগেই নিত, তাহলে বর্তমানে যে এক্সট্রিম ডিফিকাল্টি সেটার মধ্যে হয়ত আমাদের পড়তে হত না। সেখানে অবশ্যই পেট্রোবাংলা ও তার কোম্পানিগুলো ব্যর্থ হয়েছে।”
গ্যাস সরবরাহও ২০১৬-২০১৭ সালের পর্যায়ে রাখার ব্যাপারে পেট্রোবাংলা ব্যর্থ হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সেই কাজটি এখন তারা করছে। এখন তারা বলছে যে, ২০২৫ এরমধ্যে আরও ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিব।
“কিন্তু ৬০০ মিলিয়ন গ্যাস দেওয়ার পরিকল্পনা ২০১৬ সালেই হয়েছিল। সেই সময়ই তাদের উদ্যোগটা নেওয়ার দরকার ছিল।”
ভর্তুকি না মূল্য সমন্বয়
২০২১-২০২২ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ ব্যয়ের প্রাক্কলন বেড়ে ৬৬ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা হয়েছে, যা জিডিপির ১.৭০ শতাংশ।
এরমধ্যে এএলজি আমদানি করতে গিয়ে সরকারকে ২৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি গুণতে হচ্ছে বলে মন্ত্রণালয়ের তথ্য।
চলতি অর্থবছরে বাজেটে ভর্তুকির প্রাক্কলন আরও বাড়ানো হলেও এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি কমানোর পথে হাঁটতে চাইছে সরকার।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, “স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ করতে হবে। ভর্তুকি এত দেওয়া যাবে না।”
আর এ ভর্তুকি বৃদ্ধির প্রধান কারণ এলএনজি কেনা ও বিক্রির মধ্যে বিস্তর ফারাক।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমরা যে দামে গ্যাস কিনছি, সেই দামে যদি বিক্রি করি, তাহলে কারও পক্ষে সম্ভব হবে না এটা অ্যাফোর্ড করা।
“স্পট ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এই দুই বাজার থেকে কিনলে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম পড়ে ৫৯ টাকা। আর আমাদের গ্যাসের সঙ্গে মিক্সড করলে এটা ২৮ টাকা হয়। কিন্তু আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে গ্যাস দিচ্ছি ৫ টাকা করে। বিরাট টাকার একটা পার্থক্য হয়ে যায় না?”
তাহলে কি সরকার ভর্তুকি থেকে বেরিয়ে আসবে?
ম তামিম বলেন, “সরকারের কাছে এর বিকল্প হল বিদ্যুতের দাম বাড়ানো। উচ্চমূল্যে জ্বালানি কিনে ভর্তুকি দেওয়ার তো একটা সীমা আছে। এই সীমা আসলে অতিক্রম করেছে। গত ৪/৫ মাস ধরে সরকার কিন্তু অনেক ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুৎও সরবরাহ করেছে এবং বিদ্যুতের দামও বাড়ায়নি।”
কিন্তু এখন এটা চলতে থাকলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের উপায় নেই বলে মনে করেন এই অধ্যাপক।
“দুটো অপশন আছে। একটা বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো। সেটা প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়তে পারে। আরেকটা হল ট্যারিফ না বাড়িয়ে লোড শেডিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা।”
ফখরুদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, “আমি আশা করি, সরকার যেহেতু লোড শেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ট্যারিফটাকে একই রাখবে, বাড়াবে না। এ কারণে কস্ট অব লিভিং অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির উপর চাপটা কম থাকবে। অন্তত জ্বালানির কারণে মূল্যস্ফীতি হবে না।”
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আমদানির দিকে তাকিয়ে সরকারসেপ্টেম্বর থেকে পরিস্থিতি উন্নতির যে আশার কথা শুনিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, তা মূলত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দিকে তাকিয়েই তিনি বলেছেন।
তিনি বলেন, “সেপ্টেম্বরে অনেকগুলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হবে। রামপালের ইউনিট চালু হবে, আদানি গ্রুপের একটি, এস আলম গ্রুপের একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হবে। বড় পুকুরিয়া কয়লাখনিকে কেন্দ্র করে যে বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, সেখানে উৎপাদন বাড়বে। ফলে সেপ্টেম্বরের পর দেশে হয়ত বিদ্যুতের সঙ্কটটা থাকবে না।”
পায়রায় ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলেও সঞ্চালন লাইন সম্পূর্ণ না হওয়ায় কেন্দ্রটির অর্ধেক ক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
বাগেরহাটে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মৈত্রী সুপার বিদ্যুৎ কেন্দ্রও প্রায় নির্মাণ শেষের পথে। ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি গ্রুপের ১৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরকার ২৫ বছরের জন্য বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করেছে।
বড়পুকুরিয়ায় কয়লা স্বল্পতার কারণে ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তিনটি ইউনিট থেকে আসছে অর্ধেক বিদ্যুৎ।
চট্টগ্রামে ১২২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রটিও এ বছরের মধ্যে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
এছাড়া বরিশালে ৩০৭ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শেষের পথে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে সেটিও উৎপাদনে আসার কথা।
মিতব্যয়িতা ও শিল্প উৎপাদন
জ্বালানি সঙ্কটে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে ব্যাঘাত ঘটছে, তা সামাল দিতে লকডাউনের সময়ের মতো হোম অফিস চালু করা, অফিসের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা, এসি ব্যবহারে সংযমী হওয়াসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে বলে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী জানিয়েছেন।
ওই রাতেই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দেশে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, কমিউনিটি সেন্টার, শপিং মল, দোকানপাট, অফিস, বাসাবাড়িতে আলোকসজ্জা না করার নির্দেশ জারি করা হয়।
এ পরিস্থিতিতে আপাতত সাশ্রয়ী হওয়া ছাড়া বিকল্প দেখছেন না তৌফিক ইলাহী।
তিনি বলেন, “সব বিতরণ সংস্থাসহ খাত সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসে আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছি। যা বোঝা গেছে, একমাত্র বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার মাধ্যমেই পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করা যায়।”
তবে শিল্প ও সার উৎপাদনে সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নসরুল হামিদ।
শীতের সময়ের থেকে গরমের সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে ৫০০০ মেগাওয়াটের বেশি। এর প্রধান কারণ এসি ও ফ্যানের ব্যবহার।
পিডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, “শীত ও গ্রীষ্মকালের বিদ্যুতের চাহিদার যে পার্থক্য, তার মূল কারণ হচ্ছে গরমে ফ্যান ও এসির ব্যবহার বেড়ে যাওয়া। এরমধ্যে এসিতেই বেশি বিদ্যুৎ যায়।”
ম তামিম বলেন, “আমি এফোর্ড করতে পারি। এসি আমি ১৮ ডিগ্রিতে সেট করে যতই বিল আসুক আমি দিব। সেইটা কিন্তু ইস্যু না। যাদের এসি আছে তাদের বুঝতে হবে যে সারাদেশের মানুষ সাফার করছে।
“গরমকালে ৪০০০/৫০০০ মেগাওয়াটের যে অতিরিক্ত চাহিদা, এটা মূলত এসি/ফ্যানের লোড, যেটাকে কুলিং লোড বলা হয়। এটা যত মিনিমাইজ করা যায় তত ভালো। তত কম লোড শেডিং হবে। এজন্য জনগণের সহযোগিতা করতে হবে।”
জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারতের মতো দেশে জ্বালানির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার কথা উল্লেখ করে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমাদের প্রায়রিটি সারে, প্রায়রিটি শিল্পে, আর বাসা-বাড়ি, শপিংমল, এদের মনে হয় রেশনিং হওয়া দরকার। তারা যদি বিদ্যুৎ কম ব্যবহার করে, তাহলে আমাদের লোড কম পড়বে।”
ম তামিম বলেন, “সরবরাহ কমানোর ফলে শিল্প কারখানায় উৎপাদনে ডিসটারবেন্স (ব্যাঘাত) হতে পারে। সেক্ষেত্রে শিল্পখাতে বা দেশের শিল্পাঞ্চল যেটা আমরা বলছি, দিনের বেলায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে যেন সরবরাহ ঠিক থাকে সেই ব্যাপারে সরকার যেন একটু সতর্ক থাকে।”
নসরুল হামিদ বলেন, “তবে এই পরিস্থিতি বেশিদিন থাকবে না। দুই/তিনমাস পরেই কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আসতে থাকবে। রামপাল আসলে, পায়রার পুরোটা সিস্টেমে আসলে, আদানিরটা নভেম্বরে আসলে আমার মনে হয় অলটারনেটিভ ফুয়েলে চলে গেলাম। গ্যাসের উপর ভরসা করতে হল না।
“গ্লোবালি কানেক্টেড হওয়ায়, পৃথিবীর কোনও জায়গায় কিছু অ্যাফেক্টেড হলে আমাদের এখানেও প্রভাব পড়বে। যারাই জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল তারাই রেশনিং করছে।”
