সরকারি দেনার উচ্চহারের কারণে বিদেশি ঋণের অঙ্ক ২০২০ সালে নতুন রেকর্ড গড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুসারে, গত বছরের ডিসেম্বরে মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭,০৭০ কোটি ইউএস ডলার, যা সে বছরের মার্চ মাসের ঋণের অঙ্কের প্রায় ১৬ গুণ বেশি।
অর্থনীতিবিদরা জানাচ্ছেন, মেগা প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন, মন্থর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, রাজস্ব আদায়ের নিম্নহার এবং সরকারের কোভিড-সংক্রান্ত ব্যয়ের কারণে বিদেশি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। তবে ঋণ করে গড়ে তোলা তহবিলের যথাযথ ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা, যাতে ঋণ পরিশোধে খেলাপী হবার ঝুঁকি না থাকে। ঋণ শোধ করতে না পারলে বিষয়টি দেশের ঋণ পরিশোধ ক্ষমতাকে (ক্রেডিট রেটিং) প্রভাবিত করবে বলেও মনে করেন তাঁরা।
গত বছরের মার্চে বিদেশি ঋণের মধ্যে সরকারি খাতের অংশ ছিল ৪,৪৮০ কোটি ইউএস ডলার, যেটি ডিসেম্বরে বেড়ে হয়েছে ৫,২২০ কোটি ইউএস ডলার। তবে সরকারি খাতে গৃহীত বিদেশি ঋণের বেশিরভাগ দীর্ঘমেয়াদী।
অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে গত মার্চে গৃহীত ঋণের অঙ্কটি ডিসেম্বরের মধ্যে বারো শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১,৪৮০ কোটি ইউএস ডলার। বিদেশি ঋণের প্রধান ভাগ হল ক্রেতাদের ঋণ। মোট ঋণের মধ্যে, রিভিউকালীন গ্যারান্টেড বা সভরেন ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩৮০ কোটি ইউএস ডলারে।
২০২০ সালে স্বল্পপরিমাণে রাজস্ব আদায় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মন্থরতায় ঋণের অঙ্কের এই রেকর্ড হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। কোভিড-১৯ মহামারীর বিপ্রতীপ প্রভাব দেশের অর্থনীতিকে ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকায় রাজস্ব আদায় কমে গিয়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
বিদেশি উৎস থেকে এধরণের উচ্চহারে ঋণের ঝুঁকির বিষয়ে সতর্কও করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁরা বলেন, সীমিত সম্পদের সাহায্যে এ-ঋণের দায়ভার মেটাতে দেশ হিমশিম খেতে পারে।
বাংলাদেশ পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআর্আই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন, জিডিপির বিবেচনায় এই ঋণ এখনও কম। কিন্তু বাংলাদেশের সীমিত সম্পদ দিয়ে ক্রমবর্ধমান এই ঋণের দায়দেনা মেটানো কঠিন হতে পারে।
যক্তরাষ্ট্রের দেনা সেদেশের জিডিপির প্রায় সমান, এ কথা উল্লেখ করে আহসান মনসুর বলেন, কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওই অর্থনীতিতে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে কর সংগৃহীত হয়। সেজন্য ঋণ শোধ করতে ওদের কোনো সমস্যা পোহাতে হয় না।
বিপরীতে, বাংলাদেশের কর আদায়ের হার এখনও অনেক কম। তাই, তাঁর মতে, দুটি দেশের মধ্যে তুলনার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
ড. মনসুর জানান, এই ঋণের বড় একটি অংশ হয়েছে দেশজুড়ে চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য। বিদেশি ঋণ দিয়ে অনেকগুলো বড় প্রকল্পের অর্থায়ন হচ্ছে, যার ফলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটছে।
এই অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেন, চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগ থেকে আর্থিক সুবিধা মিলবে না। ফলে ঋণের বোঝা বাড়বে।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ২০২০ সালে কোভিড-১৯-এর কারণে বাংলাদেশের ঋণ বেড়েছে, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ)ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ২০০ কোটি ইউএস ডলারের ঋণ-সহায়তা নিয়েছে বাংলাদেশ। এই ঋণের বড় অংশ নেওয়া হয়েছে কোভিড মহামারীর ফলে সৃষ্ট দুর্বলতার উপশম করতে, এ কথা জানিয়ে ড. জাহিদ বলেন, ঋণ নেবার উদ্দেশ্যটা ঠিক আছে। কিন্তু এই অর্থ ঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে দেশের অর্থনীতির উপর অযথা একটি বোঝা বাড়বে।
বিদেশি দেনা কমানোর জন্য পদক্ষেপ নেবার এটাই সেরা সময়, এ কথা জানিয়ে ইন্সটিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স এন্ড ডেভলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফা কে মুজেরি বলেন, নইলে এটা জাতির জন্য বড় বোঝা হয়ে উঠবে।
অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ করায় বাংলাদেশের দেনার পরিমাণ বাড়ছে বলে জানান তিনি। এসব দেনার যথাযথ ও সুদক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার উপর তিনি জোর দিচ্ছেন।
ড. মুজেরি বলেন, এ ধরণের ঋণের অপব্যবহারের পুরনো অনেক নজির রয়েছে।
তিনি মনে করেন, ঋণের দায়দেনা শোধের যেকোনো ব্যর্থতা দেশের ঋণশোধ ক্ষমতার অবনমন ঘটাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একসময়কার প্রধান অর্থনীতিবিদ তাই মনে করেন, ঋণ টেকসই হবার বিষয়টি নির্ভর করে প্রকল্পগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন ও অর্থের যথাযথ ব্যবহারের উপর।