বিউটি বোর্ডিং আজো চমৎকার


মোজাক্কির রিফাত | Published: June 06, 2022 12:52:21 | Updated: June 06, 2022 22:58:19


ছবি: কমনস উইকিমিডিয়া

কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, মান্নাদের বিখ্যাত এ গানের বদৌলতে স্মৃতিকাতরতা আর বন্ধুত্বকে উপলব্ধ হয় কফি হাউজের চরিত্রগুলোর অতীত আর বর্তমানের বর্ণনায়। কলকাতার কফি হাউজ এখনো মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু মান্না দের গানের কল্যাণ্যেই। ঠিক একই ভাবে ঢাকাস্থ বিউটি বোর্ডিং কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে।

পুরান ঢাকার বংশাল মোড় থেকে খানিকটা পথ এগিয়ে গেলেই ভিক্টোরিয়া পার্ক। সেখান থেকে খানিকটা পথ এগিয়ে গেলে বইয়ের দেশ বাংলাবাজারের সাথে লাগোয়া শ্রীশদাস লেন। এই লেনে ঢুকতে প্রথম বাড়িটিই বিউটি বোর্ডিং। অজশ্র সৃষ্টির সাক্ষ্য হয়ে জীর্ণ - শীর্ণ হলেও সমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রথম দর্শনে খুব আকর্ষণীয় মনে হয় না। ফটক দরজাকে কিছুটা সময়োপযোগী করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। ভেতরে ঢুকতেই একদম শৈশব - কৈশোরে পড়া গল্প উপন্যাসের ভুতুড়ে জমিদার বাড়ির মত একটি পুরনো দোতলা বাড়ি চোখে পড়ে। সামনে দিয়ে নিবিড় পরিচর্যায় বানানো একটা ছোট্ট ফুলের বাগান যার ভেতর দিয়ে আড্ডা দেওয়ার জন্য চেয়ার টেবিলে বসানো।

তবে এখনো এখানে থাকা যায় বোর্ডার হয়ে, আবার দর্শনার্থী হয়ে খাওয়া যায় দুপুর বা রাতের খাবারও। বোর্ডিংয়ের আরেকটু ভেতরের দিকে ঢুকলেই চোখে পড়ে খাবারের ঘর। সেখানে সারি সারি টেবিল চেয়ার পাতা। প্রতিটিতে স্টিলের বড় থালা আর গ্লাস রাখা। একসময় এখানে পিঁড়িতে বসে মেঝেতে থালা রেখে খাওয়ানো হত। তবে কালের বিবর্তনে এ রীতি আর নেই। খাবার ঘরটিতে ঢুকার সাথে সাথেই বাহারি সব খাবারের সুগন্ধে জিভে জল এসে যায়।

ভাত, ডাল, সবজি, শাক ভাজি, ভর্তা, বড়া, কোরাল মাছ, সরিষা ইলিশ, রুই, কাতলা, বাইলা, তেলাপিয়া, পলি, সরপুটি, চিতল, পাবদা, শিং, কৈ, মাগুর, ভাংনা, চিংড়ি, চান্দা, বোয়াল, আইড় মাছের ঝোল, মুরগি, মুড়িঘন্ট, খাসির মাংস এসব বাঙালি খাবার দিয়েই সাজানো বিউটি বোর্ডিং এর মেন্যুকার্ড। এ খাবারগুলো দুপুর এবং রাতের বেলা খাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

খাবারের সাথে রয়েছে বিউটি বোর্ডিং এ থাকার ব্যবস্থাও। এখানে রয়েছে রয়েছে সর্বমোট ২৭ টি ঘর। এর মধ্যে ১৭ টি সিংগেল বেড এবং ১০ টি ডাবল বেডের রুম। তবে সকল অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা না থাকায় এখন আর আগের মত বিপুল সংখ্যক বোর্ডার এখানে থাকতে আসেন না।

বিউটি বোর্ডিংয়ের কালের সাক্ষী হয়ে ওঠার সূচনা অনেক পুরনো। দেশভাগের আগে ঢাকাস্থ এক জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের জমিদারবাড়িতে সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় বের হতো 'সোনার বাংলা' সাপ্তাহিক পত্রিকা, একই সাথে সেখানে গড়ে তোলেন ছাপাখানাও। পত্রিকা আর ছাপাখানা থাকার দরুণ তখন থেকেই বাড়িটি হয়ে ওঠে শিল্প - সাহিত্যের মানুষদের আনাগোনায় মুখর। কবি শামসুর রাহমানসহ বাংলা সাহিত্যের অনেক প্রথিতযশা লেখক, কবিদের প্রথম লেখা ছাপা হয় এখান থেকেই সোনার বাংলা পত্রিকায়।

দেশভাগের সময় সুধীর চন্দ্র দাস চলে যান কোলকাতায়। ১৯৪৯ সালে বাড়িটি ভাড়া নেন মুন্সিগঞ্জের দুই সহোদর নলিনী মোহন সাহা ও প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা। ছোট ব্যবসাকে বড় করার পরিকল্পনা থেকে এ বাড়িটি কিনেও নেন একসময় দুই ভাই মিলে। বলে রাখা ভালো, নলিনী মোহন সাহার বড় মেয়ের নাম বিউটি ছিলো তাই এ বোর্ডিং এর নাম রাখা হয় বিউটি বোর্ডিং। সে সময় থেকেই এখানে সাহিত্যিক, কবি, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রশিল্পীদের আনাগোনা শুরু হয়। অবশ্য আনাগোনার আরো বড় কারণ হলো পাশে থাকা বাংলাবাজার দেশবিভাগের পর বাংলার প্রকাশনা শিল্পের রাজধানী হয়ে ওঠে।

চল্লিশের দশকে এ আড্ডা পুরান ঢাকায় সুখ্যাতি লাভ করে। কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, কাইয়ূম চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, সদ্য প্রয়াত আব্দুল গাফফার চৌধুরীসহ অনেক বিখ্যাত মানুষ এখানে আসতেন। আবদুল জব্বার খান এখানে বসেই লেখেন বাংলার প্রথম সবাক ছবি মুখ ও মুখোশের পাণ্ডুলিপি। বিখ্যাত সুরকার সমর দাস বহু গানের সুর তৈরি করেছেন এখানে বসে। খাবার ঘরে টানানো আছে এখানে আড্ডারত অবস্থায় বিখ্যাত সব মানুষদের কিছু আলোকচিত্রও।

তবে ১৯৭১ সালে সেই আড্ডায় ছেদ পড়ে। পাকহানাদারবাহিনী জেনে যায় বাঙালির এই সাহিত্যসংস্কৃতির মানুষদের মিলনমেলার কথা। ২৮ মার্চ এখানেই শহিদ হন প্রহ্লাদ সাহাসহ আরও ১৭ জন। এরপর আর আগের মত জমজমাট না হলেও চলেছে বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডা। তবে ইদানিংকালে একেবারেই আর জৌলুস নেই আড্ডার। মানুষ কেবল কালের সাক্ষী হয়ে থাকা এ বোর্ডিং দেখতে দর্শনার্থী হয়েই যায়। খাবার খেতেও একটা অংশের মানুষের ভীড় জমে এখানে। বিশেষ দিবস ও ছুটির দিন গুলোতে অন্যান্য দিনের তুলনায় উপস্থিতি থাকে আরো বেশি।

যেভাবে যাওয়া যায়

ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে গুলিস্তানে আসতে হবে। এখান থেকে বাসে চড়ে ৫ টাকায় অথবা রিকশায় ২০ থেকে ৩০ টাকায় বাহাদুর শাহ ভিক্টোরিয়া পার্ক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এসে যে কাউকেই জিজ্ঞেস করল দেখিয়ে দেবে বিউটি বোর্ডিং।

মোজাক্কির রিফাত বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।

anmrifat14@gmail.com

Share if you like