‘লোকে বলে, কামাঠিপুরায় কোনোদিন অমাবস্যা হয় না, কারণ এখানে গাঙ্গু থাকে’ – বলিউডে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়ারী সিনেমার ট্রেইলারের প্রথম লাইনটির তর্জমা করলে এমনটাই দাঁড়াবে। মুক্তির আগে থেকেই আলোচনায় এসেছে এই চলচ্চিত্রটি।
সত্যিই গাঙ্গুবাই নামের এই নারীর জীবন অন্ধকার গলিতে হলেও, তিনি আপন গুণে তা আলোময় করে নিয়েছিলেন, গঙ্গার মতো শুষে নিয়েছিলেন সব কলুষ। বাস্তবের গঙ্গার জীবনলেখে কতখানি আলো ফেলতে পেরেছেন পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালি?
ফুটফুটে মেয়ে
আলো ঝলমলে শহরের এক রোশনাই ভরা পাড়ায় একটা গাড়ি থামলো। গাড়ির পেছনে বসা ১৬ বছর বয়সী চপলা এক বালিকার সাথে বয়স্কা এক ভারিক্কি চেহারার মহিলা। সামনের সিট থেকে তরুণ একটি ছেলে নেমে পড়লো, বয়স্কা মহিলার হাতে পাঁচশো টাকার নোট গুঁজে। মহিলা বালিকার হাত ধরে হেঁটে চললো সেই পাড়ার ভেতর। এতো আলো সত্ত্বেও পাড়াটিকে লোকে বলে অন্ধকারের গলি।
এভাবেই মুম্বাইয়ের বিখ্যাত গণিকা পাড়ায় পা পড়ে কাঠিয়াওয়ারের সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে গঙ্গার। গঙ্গা হরজীবনদাসের জীবনটা হতে পারতো আর বাকি মেয়েদের মতো। সে লেখাপড়া শিখে গুণীন হয়ে প্রতিষ্ঠা পেতে পারতো। কিন্তু বই খাতার জায়গায় তা মন পড়ে থাকতো বলিপাড়ার স্পটলাইটে। মন হতে চাইতো পর্দা কাঁপানো অভিনেত্রী।
গঙ্গাদের বাড়িতে নতুন কাজে আসে রমণিক লাল নামে এক যুবক। গঙ্গার কিশোরী মনে সে অচিরেই জায়গা করে। রমণিক গঙ্গার স্বপ্ন পূরণের প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই শুনে এক রাত্রে মায়ের গহনা আর জমানো টাকা নিয়ে রামনিকের সাথে মুম্বাই পাড়ি জমায়।
কিন্তু কে জানতো রমণিক যে তাকে স্বপ্নাহত করে ছেড়ে যাবে! বাড়িওয়ালি মাসির মুখে বিক্রির কথা শুনে তার সরল মন কিছুতেই মানতে পারছিল না। তবে ফিরে যাওয়ারও আর পথ ছিল না; গঙ্গা মেনে নিয়েছিল গরল ধারণের জীবন।
‘গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়ারী’ চলচ্চিত্রে গল্পটা এভাবেই প্রতিফলিত করে চলে গঙ্গার বহমানতা। যার নাট্যতার উৎস ছিল অনুসন্ধানী সাংবাদিক হুসেন জায়েদীর বই ‘মাফিয়া কুইন্স অফ মুম্বাই’। কেননা গঙ্গার জীবন সম্পর্কিত কোনো ঘটনা সেভাবে নথিবদ্ধ নেই কোথাও, অনেকটাই কিংবদন্তি আশ্রিত।
গঙ্গা থেকে গাঙ্গুবাই
গঙ্গা থেকে গাঙ্গুবাই হয়ে ওঠার যাত্রা পর্দার মতো এতখানি সহজ ছিল না। বাস্তব গাঙ্গুবাইয়ের জীবনে এসেছে বহু চড়াই - উতরাই। কিন্তু তিনি সাহসিকতার ছাপ রেখেছেন প্রত্যেক ধাপে।
রোজকার গ্রাহকদের মতো হঠাৎ এক রাতে গাঙ্গুর দুয়ারে কড়া নেড়েছিল প্রখ্যাত ডন করিম লালার সাগরেদ পারভেজ। টাকা তো দেই-নি তার ওপরে চালিয়েছিল পাশবিক নিপীড়ন, পরপর দুবার। আর এতোটাই যে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিল গাঙ্গুবাই। পারভেজের পরিচয় জেনে কারোর তোয়াক্কা না করে গাঙ্গুবাই পৌঁছে যায় করিম লালার কাছে। জবাব চায় এই কাণ্ডের।
আন্ডার ওয়ার্ল্ডের ডন হলেও করিম নারীদের সম্মান দিতেন। কিন্তু গাঙ্গুকে ঘরে বসানোর আন্তরিকতা দেখাতে অপারগ ছিলেন। গাঙ্গু দিয়ে দিলেন সাহসী উত্তর, "যদি আমাকে ঘরে না বসিয়ে ছাদে বসাতে পারেন, তাহলে আমিও আপনার রসুই ঘরের কোনো বাসন এঁটো করবো না।"
করিম বুঝলেন মেয়ের দম আছে। তিনি ঘটনার বিচার করার আগ্রহ দেখান। গাঙ্গু জানায় এমন জীবনে আসার পরে তিনি প্রথম করিমের কাছে নিজেকে এতটা নিরাপদ অনুভব করলেন, তাই আপ্লুত হয়ে রাখি বেঁধে দেন করিমের হাতে।
গাঙ্গুবাই এবারে পল্লীর সব নিষিদ্ধ বালাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করলেন। হয়ে উঠলেন কোঠেওয়ালী (সর্দারনী)। এইসকল পল্লীতে হাতে হাত রেখে চলে মাদক চালানের আড্ডা। গাঙ্গু ধীরে ধীরে জড়িয়ে যান তাতে। পেয়ে যান মাফিয়া সম্রাজ্ঞীর তকমা।
কিন্তু মুভিতে আলো আঁধারীতে ঢাকা পড়ে গেছে তার জীবনের এই দিকটি। বিপরীতে নাটকীয়তা বাড়াতে তাকে স্থানীয় সর্দারণী হওয়ার নির্বাচনে অংশ নিতে দেখা যায় রাজিয়া বাই নামে কাল্পনিক চরিত্রের বিপক্ষে।দেখা যায় কিছু আবেগঘন মুহূর্তে দর্জি আফসানের সাথে। যুক্ত হয় সাংবাদিকদের পেছনে পড়ে থাকা। আসলে সবই ছিল তার জীবনচাঞ্চল্যতাকে রুপালি পর্দায় ফুটিয়ে তুলবার প্রচেষ্টা।
গঙ্গা মা
জীবন আঁধারে ভরা ছিল, কিন্তু তিনি চাঁদের মতো আলো ধার করে আনেননি। নিজেকেই আলোকবর্তিকা করে নিয়েছিলেন।
নিজের মতো অভাগীদের উদ্ধারে নেমে আসেন। কোনো মেয়েকে তার মর্জির বিরুদ্ধে আনা যাবে না পল্লীতে। পাশাপাশি তিনি পল্লীর দুস্থ মেয়েদের পড়াশুনার ব্যবস্থা করেন। এদের অধিকার নিয়েও লড়েছেন প্রচুর। যখনই উৎখাতের দাবি উঠেছে, তিনি ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। হয়ে গেছিলেন গাঙ্গুবাই থেকে গাঙ্গু মা।
আজাদ ময়দানে উঁচু গলায় জানান, “আমাদের জন্যই আজকের দিনেও মেয়েরা কিছুটা হলেও নিরাপদে পথে ঘাটে চলে।” গিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরুর কাছে। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করলেন ,আপনি তো অন্য জীবন বেছে নিতে পারতেন। উত্তরটা এলো বেশ সাহসী কণ্ঠে, “যদি আমায় বিয়ে করেন, তবে আমি এই মুহূর্তে এই পেশা ছেড়ে দেবো।” প্রধানমন্ত্রী নীরব, যেন উচিৎ জবাব পেলেন - কথায় সব সহজ, কিন্তু কাজে কঠিন।
প্রিয় অভিনেত্রী আশা পারিখ ও হেমা মালিনীর মতো সিনেমা পোস্টারে জায়গা পেতে এসেছিলেন মুম্বাই শহরে, আজ তিনি নিজেই একখানা সিনেমা হয়ে রইলেন সেই বলিউডে। অসহায়ত্বের দিনগুলি একটু কাটাতেই ছেড়ে দিয়েছিলেন দেহ বিক্রয়। আর পাঁচটা সাধারণ গণিকার মতো ছিলেন না। ঠাট-বাট নিয়ে নিজের পয়সায় কেনা ব্র্যান্ডেড গাড়িতে চলতেন। গায়ে চড়াতেন দামি আতর আর শাড়ি। তবে আপন করে নিয়েছিলেন সাদা রঙকে।
১৯৭৭ সালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া থেমে মাত্র ৩৯ বছরে বয়সে নিভে যায় গাঙ্গুবাইয়ের জীবন প্রদীপ। এখনো কামাঠিপুরার অনেক গণিকার ঘরে ফুলের মালায় শোভা পায় তাদের গঙ্গা মায়ের ছবি। দিয়ে থাকে দেবীর মতোই সম্মান।
সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
susmi9897@gmail.com
