Loading...

বাইডেন পররাষ্ট্রনীতির নতুন অধ্যায় খুলেছেন

আফগানিস্তান থেকে প্রায় নজিরহীন বিশৃঙ্খলার মধ্যে উড়োজাহাজের বহরে করে হটে এসেছে আমেরিকা। এরপরই ৩১ আগস্ট পররাষ্ট্রনীতির নতুন অধ্যায়ের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ।


| Updated: September 12, 2021 16:39:01


মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ও প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন – এফপি ছবি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ও প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন – এফপি ছবি

জো বাইডেনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান বলেন, “মার্কিন প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতির ‘দৃষ্টিভঙ্গ’-র ’মূলকথা’ তাঁর সিনেটে প্রথম দিনের দৃষ্টিভঙ্গির মতোই একই রয়েছে।” বাইডেনের এই পররাষ্ট্রনীতির মূল উপাদানগুলোকে তুলে ধরতে যেয়ে তিনি আরো বলেন, “একটি শক্তিশালী আমেরিকা যে অংশীদার এবং মিত্রদের নিয়ে অভিন্ন মূল্যবোধ রক্ষায় একযোগে দাঁড়াবে। অভিন্ন স্বার্থ নিয়ে এগিয়ে যাবে। ক্রমবর্ধমান  বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখেও যে দেখিয়ে দেবে যে গণতন্ত্রই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চারপাশের দুনিয়ার মানুষের জন্য সুফল দিতে পারে।”

আমেরিকার প্রাক্তন কর্মকর্তা এবং কূটনীতিবিদরা অবশ্য ভিন্ন কথা বলেন। তাদের বক্তব্য, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার যদি আরো সহজে কোনো ঝুট-ঝামেলা ছাড়া করা যেতো তা হলে এটি আরো ভরসাযোগ্য এবং সুলিভানের কথার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতো। কিন্তু তা হয়নি। বরং তালেবানের ঝড়ের গতিতে বিজয়ে মার্কিন মিত্রদের চোখ ঝলসে গেছে। তারা নিজ নাগরিকদের সরিয়ে আনার জন্য বৃথাই তালেবানের কাছে দেন-দরবার এবং কাকুতি-মিনতি করেছে। সব মিলিয়ে এতে আমেরিকার ওপর আস্থা অনেকটাই গেছে টলে।

আরেক ইউরোপীয় কূটনীতিবিদ বলেন, “আমরা জানতাম এটি ঘটবে। আমরা জানতাম এটি দ্রুতই ঘটবে। আমরা একযোগে কাবুল ছাড়ার ধারণাকে ভিত্তি করে প্রস্তুতি নেই। কিন্তু ঘটনাগুলো স্বাভাবিক মাত্রা ছাড়িয়ে  এতো দ্রুততার সাথে ঘটবে সে জন্য আমরা কেউ মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। ঘটনা যে ভাবে ঘটেছে তাতে আমরা হতবাক হয়ে গেছি এবং আমরা আরো সহযোগিতার আশা করছিলাম।”

আফগানিস্তান থেকে সরে আসতে সহায়তা করায় কৃতজ্ঞতা জানাতে  ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হারিস, পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি বিলিংকেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনসহ মার্কি শীর্ষ কর্তাদের উপসাগরীয় দেশগুলোসহ মিত্রদের কাছে তড়িঘড়ি ছুটতে হয়। মিত্রদের নিরাপত্তার প্রতি মার্কিন প্রতিশ্রুতি আবারো ব্যক্ত করেন তাঁরা।  জানান, নতুন তালেবান সরকারের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার তৎপরতায় সমন্বয় সাধন করা হবে।

সেন্টার ফর আমেরিকান প্রোগ্রেসের নীতি বিষয়ক সহ-সভাপতি মারা রুডম্যান বলেন, “আফগানিস্তান থেকে সরে আসার পর এগিয়ে যাওয়ার জন্য মিত্র ও প্রতিপক্ষদের মধ্যে একই ভাবে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা এবং তা বজায় রাখাই এই মার্কিন প্রশাসনের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।”

তবে আফগানিন্তানে মার্কিন ভূমিকাকে কেন্দ্র করে সব তর্ক-বিতর্ক বা বিরোধ দ্রুত মিটে যাবে কিনা তা এখনো স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।

ওই ইউরোপীয় কূটনীতিবিদ আরো বলেন, ভবিষ্যতে বড় অভিযান বলতে ঠিক কি বোঝানো হবে তা নিয়ে ন্যাটোসহ অন্যান্য ফোরামে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু করবে আমেরিকার পশ্চিমা মিত্ররা । তিনি বলেন, তা না হলে ‘পশ্চিমের সমাপ্তি’ ঘটেছে বলে সে কথা রাশিয়া চালু করেছে আন্তআটলান্টিক জোটের বাইরেও সে কথা বিশ্বাসযোগ্য হবে।” তাইওয়ান, ইউক্রেন বা অন্যান্য দেশ যারা আমেরিকার দেওয়া নিরাপত্তা নিশ্চয়তার উপর একান্তই নির্ভর করছে তাদের জন্য আরো বড় উদ্বেগ সৃষ্টি হবে।

নিজ দেশেরে বাইরে এখনো আমেরিকার দুই লাখ সেনা মোতায়েন রয়েছে। ব্রিটেন, জার্মানি এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ সবস্থানেই এ সব সেনা মোতায়েন রয়েছে।  এই বিশাল সামরিক বাহিনীর পেছনে আমেরিকাকে ৭০ কোটি ডলার প্রতিরক্ষা বাজেট বরাদ্দ করতে হয়।

আফগানিস্তানে মার্কিন সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং সাবেক কূটনীতিবিদ মাইকেল ম্যাককিনলে বলেন, সাধারণ ভাবে বলতে গেলে আফগানিস্তান থেকে “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে আসেনি।” আর আফগানিস্তান থেকে আমেরিকা চলে আসায় ‘গোটা দুনিয়ায় তার কোনো প্রভাব পড়বে না।’ তবে আফগানিস্তানে ব্যর্থ হওয়ায় পররাষ্ট্রনীতির অন্যান্য পর্বে বাইডেন প্রশাসনকে সফল হওয়াটা আগের থেকেও গুরুত্বের হয়ে উঠেছে। আমেরিকার অভ্যন্তরে সব লক্ষ্য অর্জন করাও একই সাথে গুরুত্বের হয়ে  উঠেছে।

এবারে পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন ম্যাককিনলে, “আসল প্রশ্ন হলো, সেই বৃহত্তর কর্মসূচির বাস্তবায়ন করা যাবে কি? জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি, বিশ্বমারি নিয়ে সাড়া দেওয়া এবং চীন ও রাশিয়াকে মোকাবেলার মতো আন্তরাষ্ট্রিক সমস্যার ক্ষেত্রে আমেরিকা নিজেকে কি সফলভাবে উপস্থাপন করতে পারবে? পারবে কি এ গুলো বাস্তবায়নে সুসংহত কৌশল গ্রহণ করতে?”

ইউরোপীয় দ্বিতীয় কূটনীতিবিদ মনে করেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই বা মানবাধিকার বাস্তবায়নের মতো “কিছু কিছু জিনিস আমেরিকা কখনোই ছেড়ে দেবে না।” তবে তিনি আরো বলেন, “আমেরিকা এখন স্বদেশের দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে তা দেখা যাচ্ছে।”

স্বদেশে বাইডেন অবকাঠামো উন্নয়নে ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার, সামাজিক খাতে ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করা, কোম্পানি এবং বিত্তবানদের কর বাড়ানোর মতো নিজ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অপরিসীম গুরুত্ব দিয়েছে। অর্থনীতির রণাঙ্গনে আমেরিকার আর্ন্তজাতিক প্রতিপক্ষদের রুখে দেওয়ার জন্য এ সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে আমেরিকার শক্তি-সামর্থ্য বা দুর্বলতা নিয়ে ধারণা গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে মার্কিন গণতন্ত্রের হাল-হকিকত। এ ক্ষেত্রে মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোলান্ড ট্রাম্পের প্রভাব, মার্কিন ঐতিহ্যবাহী সংস্থাগুলো এবং উন্মুক্ত নির্বাচনের প্রতি তাঁর একগুঁয়ে মনোভাবের কুফল রয়েই গেছে।

রোমের বৈদেশিক নীতি বিষয়ক থিংক ট্যাঙ্ক ‘ইস্তিতুতো আফারি ইন্টারনাজিওনালি’ (আন্তর্জাতিক ইনস্টিটিউট)’র  পরিচালক এবং হার্ভার্ডের কেনেডি বিদ্যালয়ের অনাবাসিক অধ্যাপক বা ভিজিটিং প্রফেসর নাথালি টোকি বলেন, বাইডেনের কৌশল দেখে মনে হচ্ছে “একটি পরাশক্তির তুলনামূলক ভাবে পতন ঘটছে।”

সামরিক পেশীশক্তি দেখাতে সাতপাঁচ ভেবে তবেই এখন এগোচ্ছে আমেরিকা। ইউরোপীয় দেশগুলো ‘ডাঙ্গায় বাঘ পানিতে কুমিরের’ মতো  যে উভয়সঙ্কটে পড়েছে তা এবারে ওয়াশিংটনের জন্য সত্য হয়ে দেখা দিতে পারে। এই অবস্থা ব্যক্ত করতে যেয়ে টোকি বলেন, “তুরস্কের বিষয়ে কি করতে হবে ইউরোপ তা জানে না। বেলারুশে কি করতে হবে তাও জানা নেই। এই পরিস্থিতি কেবল আফগানিস্তানের ক্ষেত্রেই ঘটছে না। দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপ এ রকম স্থানে কি করতে হবে তা জানে না। এমন প্রশ্নের কোনো জবাব ইউরোপের জানা নেই। তবে এর জবাব তাদেরকে পেতেই হবে।”

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলা রূপান্তর সৈয়দ মূসা রেজা]

আরো পড়ুন: বাইডেন তত্ত্ব: আমেরিকার সামরিক শক্তি সংযতভাবে প্রয়োগের আভাস

Share if you like

Filter By Topic