বাংলাদেশ শিল্পচর্চার যেসব শাখায় সবচেয়ে বেশি উৎকর্ষ লাভ করেছে তার ভেতর প্রথম সারিতে যে শাখাটির নাম চলে আসতে পারে তা হলো মঞ্চনাটক। সাধারণত নাটক বলতে অনেকের চোখে ভেসে ওঠে টিভির পর্দায় হতে থাকা সিরিয়াল বা কোনো একক নাটক, তবে অভিনয়ের একেবারে ভিত্তিমূল তৈরি ও একে উৎকর্ষ দেবার চূড়ান্ত জায়গাটি হলো মঞ্চনাটক।
সে সময়ের মঞ্চ নাটকের কিছু কথা
স্বাধীনতা লাভের পূর্বেই ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নাটকের দল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়। সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী ফতেহ লোহানীর বাসায় আতাউর রহমান (মঞ্চসারথি) ও জিয়া হায়দার - এর উদ্যোগে প্রথম এই দলটি গঠিত হয়।
আসাদুজ্জামান নূর, আলী যাকের, সৈয়দ শামসুল হক, আবুল হায়াত, লাকী ইনাম, খালেদ খান থেকে শুরু করে বিপাশা হায়াত, আফসানা মিমি, অপি করিম, ইন্তেখাব দিনার বা রওনক হাসান - অনেকেই এই দলে একসময় নিয়মিত অভিনয় করেছেন বা করছেন। নাগরিক মূলত বিদেশি বিভিন্ন নাট্যকারদের লেখাকে অনুবাদ করেছে। যেমন- মলিয়ের, শেকসপিয়ার, ব্রেখট (ব্রেশট), আলবেয়ার কাম্যু, আন্তন চেখাই।
তবে তাদের প্রথম প্রযোজনা ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ। নির্দেশনায় ছিলেন আতাউর রহমান। তাদের আরেকটি বিখ্যাত নাটক দেওয়ান গাজীর কিসসা, ব্রেখটের রচনা অবলম্বনে যেটির নির্দেশনা দিয়েছেন আসাদুজ্জামান নূর।
এদিকে ১৯৭৩ সালে যাত্রা শুরু করেছিল আরেকটি সুপরিচিত নাটকের দল - ঢাকা থিয়েটার। মৌলিক নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে বাংলা নাটকের মুক্তি - এমন স্লোগানকে সামনে রেখে তারা কাজ শুরু করেছিলেন। এখানে পুরোধা হিসেবে ছিলেন সেলিম আল দীন ও নাসিরউদ্দীন ইউসুফ। ১৯৭৩ সালে যুগল নাটক প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে তারা যাত্রা শুরু করেন।
নাটকগুলো ছিল - সংবাদ কার্টুন (নাসিরউদ্দীন ইউসুফ) ও সম্রাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীগণ (হাবিবুল হাসান)।
এখানে বিভিন্ন সময় অভিনয় করেছেন হুমায়ূন ফরীদি, রাইসুল ইসলাম আসাদ, শিমুল ইউসুফ, আফজাল হোসেন, শহীদুজ্জামান সেলিম, রোজী সিদ্দিকী, শমী কায়সারসহ অনেকেই।
তাদের উল্লেখযোগ্য নাটকের ভেতর আছে কীত্তনখোলা, মুনতাসির ফ্যান্টাসি, কেরামত মঙ্গল, শকুন্তলা, পঞ্চনারী আখ্যান (সর্বাধিক মঞ্চায়িত), চাকা ইত্যাদি।
১৯৭২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মামুনুর রশীদের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয় আরণ্যক নাট্যদল। মুনীর চৌধুরীরকবরছিল তাদের মঞ্চস্থ করা প্রথম নাটক।
এই দলে তিনি ছাড়াও কাজ করেছেন সালাহউদ্দিন লাভলু, ফয়েজ জহির, আজাদ আবুল কালাম, বৃন্দাবন দাস, তমালিকা কর্মকার প্রমুখ। চে-র সাইকেল তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত মঞ্চ প্রযোজনা।
১৯৯৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কয়েকজন তরুণ তুর্কী প্রতিষ্ঠা করেন প্রাচ্যনাট। ২০০১ সালে প্রাচ্যনাট স্কুল ফর এক্টিং এন্ড ডিজাইন চালু হয়। এখানে ছিলেন ও আছেন আজাদ আবুল কালাম, তৌফিকুল ইসলাম ইমন, শতাব্দী ওয়াদুদ, স্নাতা শাহরিন, রাহুল আনন্দ প্রমুখ।
তাদের উল্লেখযোগ্য নাটকের ভেতর আছে - সার্কাস সার্কাস, এ ম্যান ফর অল সিজনস, রাজা এবং অন্যান্য, কিনু কাহারের থেটার, খোয়াবনামা ইত্যাদি।
প্রথিতযশা বিভিন্ন নাটকদলের পাশাপাশি সারাদেশে ৩০০ - এর বেশি নাটকের দল সক্রিয় আছে। রয়েছে গ্রাম থিয়েটার ও গ্রুপ থিয়েটার। আবদুল্লাহ আল মামুন, মমতাজউদ্দীন আহমদ, ফেরদৌসী মজুমদার, রামেন্দু মজুমদার, এস এম সোলাইমানসহ আরো অনেক গুণী ব্যক্তিত্বের পদচারণায় মুখরিত হয়েছে এই অঙ্গন৷
আন্দোলন- সংগ্রামে ভূমিকা
'৮০ এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে এদেশের মঞ্চনাটক ও পথনাটক।
যেমন - নুরলদীনের সারাজীবন - এ যখন শোনা যেত - 'আবার নুরলদীন একদিন আসিবে বাংলায়/ আবার নুরলদীন একদিন কাল পূর্ণিমায় দিবে ডাক- জাগো বাহে কোনঠে সবায়'; তখন বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামগুলোতেও তৈরি হয়েছিল স্বৈরাচারবিরোধী তীব্র মনোভাব। এভাবে বাংলাদেশের মঞ্চনাটক বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়া ঢাকায় গ্রুপ থিয়েটার, গ্রাম থিয়েটার ফেডারেশন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যতত্ত্ব বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র
আশির দশক থেকে এদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও পড়ানো হচ্ছে নাট্যতত্ত্ব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার ও পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. আশিকুর রহমান লিয়ন জানালেন, সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি, রাষ্ট্র এবং জীবন পাঠের এক শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম হলো থিয়েটার। ৮০'র দশকের প্রারম্ভ হতে বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চায় একাডেমিক বা প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যচর্চার সম্পৃক্ততা পরিলক্ষিত হয়। ভারতের ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা হতে নাটকের উপর পড়াশুনা শেষ করে একগুচ্ছ তুরুণ বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় যেন এনে দিল নতুন জোয়ার। যে জোয়ার নাট্যদর্শক বুঝলেন যে, নাট্যশিল্প উপস্হাপনে অভিনয়, নির্দেশনা, ডিজাইন-এ পেশাদারিত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এসকল তরুণদের মাঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের (তৎকালীন নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগ) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ জামিল আহমেদ, প্রথিতযশা অভিনেতা, মঞ্চনাট্য নির্দেশক তারিক আনাম খান, আবৃত্তি শিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিনেতা এস এম মহসীন, অভিনেতা ও নির্দেশক আশীষ খন্দকার প্রমুখ উল্লেখযোগ্য বলে জানান তিনি।
নাটমন্ডল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।ছবি: সংগৃহীত
এই সময়কালের মধ্যেই বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিষয়ে পাঠদান আরম্ভ হয়। যথা- ধারাবাহিকভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যাল ত্রিশাল, ময়মনসিংহ এবং সর্বশেষ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
এসকল বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটকলা বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নাট্য নির্দেশনা, অভিনয়, ডিজাইন, নাট্য রচনা, উন্নয়ন নাট্য, শিক্ষাদানে নাট্য ও নাট্য বিষয়ক ইতিহাস-বিবর্তণ-প্রকার ইত্যাদি বিষয়ে তত্বীয় ও ব্যবহারিক পাঠদানের পাশাপাশি নানাবিধ আন্তঃবিষয়ক বিষয়াদি পাঠদান করা হয়। যথা: নৃ-বিজ্ঞান, মনস্তত্ব বিদ্যা, রিসার্চ মেথোডলজি, টেলিভিশন নাট্য নির্মাণ, সমাজতত্ব ইত্যাদি। আদতে নাট্যকলা বিষয় পেশাদারী প্রক্ষাপটে বহুঅক্ষীয় দিক উন্মোচনে সচেষ্ট।
বাংলাদেশের নাট্যচর্চার গন্ডির দিকে তাকালে যে প্রক্ষাপটগুলো খুঁজে পাওয়া যায়, তা হলো- গ্রুপ থিয়েটার ভিত্তিক নাট্যদল সমূহ, বিবিধ রেপার্টরি নাট্যদল সমূহ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রযুক্ত নাট্য বিষয়ক কর্মকান্ড এবং এনজিও ভিত্তিক প্রয়োগিক নাট্য যথা- উন্নয়ন নাট্য, ফোরাম থিয়েটার, শিক্ষাদানে নাট্য ইত্যাদি।এসকল প্রক্ষাপটে প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমিক নাট্যকর্মী, নির্দেশক, অভিনয়শিল্পী, ডিজাইনার, গবেষক, ফেসিলিটেটরের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
নাট্যচর্চার প্রচলিত প্রেক্ষাপটসমূহে বিশ্ববিদ্যালয় হতে পাশ করা ব্যক্তিবর্গের অংশগ্রহণে বাংলাদেশের নাট্যচর্চা হয়েছে বেগমান এবং পেশাদারী। কারন নাট্য নির্দেশনা হতে আরম্ভ করে অভিনয় এবং ডিজাইন প্রতিক্ষেত্রে একাডেমিক নাট্যকর্মীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন কর্তৃক ঢাকা তথা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় আয়োজিত নাট্য বিষয়ক বিবিধ তত্ত্বীয় ও প্রায়োগিক কর্মশালাসমূহ বিশ্ববিদ্যালয় হতে পাশ করা ব্যক্তিবর্গ পরিচালনা করেন এবং পাঠদান করেন। ফলে বাংলাদেশের বিবিধ অঞ্চলে নবীন-প্রবীণ নাট্যকর্মীবৃন্দ থিয়েটারচর্চাকে প্রথাসিদ্ধ ও পেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার শিক্ষা পাচ্ছেন।
আশিকুর রহমান লিয়ন আরো যোগ করেন, একটি দেশের শিল্প-সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের গুরুত্বকে বোঝার জন্য এবং ধরে রাখার জন্য গবেষনার বিকল্প নেই। আর এই কাজগুলো করে থাকেন নাট্যচর্চায় একাডেমিক ব্যক্তিবর্গ। তবে বাংলাদেশের শিল্প, সংস্কৃতি, নাট্যের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন, এসকল বিষয়ে সরকারের নীতি নির্ধারণী কর্মযজ্ঞে একাডেমিক ব্যক্তিবর্গের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ।"
নাট্যতত্ত্বের শিক্ষার্থীদের বিভাগ সংশ্লিষ্ট প্রায়োগিক ক্ষেত্রের বিষয়ে তিনি বলেন,
"বাংলাদেশে থিয়েটার চর্চাকে পেশা হিসেবে নেয়ার মত অবস্হান তৈরি হয়নি। যার ফলে বিভাগ হতে পাশ করা ছাত্রছাত্রীবৃন্দ থিয়েটারে ফ্রিল্যান্স কাজ করার পাশাপাশি কেউ কেউ- টেলিভিশন চ্যানেলের চাকরি, কেউবা এ্যাড এজেন্সিতে, কেউবা টেলিভিশন/ফিল্মে অভিনয়, ডিজাইনিং , আবার অনেকে স্কুল/কলেজে নাটক বিষয়ে শিক্ষকতা, কেউবা বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠানে ফোরাম থিয়েটার/ উন্নয়ন নাট্য ইত্যাদির পরিচালক বা ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে কাজ করছেন। তবে সর্বক্ষেত্রে নাট্যকলার শিক্ষার্থীবৃন্দের অংশগ্রহণ থাকে সাবলীল এবং চৌকষতাপূর্ণ"৷
কেন্দ্রীয় বার্ষিক নাট্যোৎসব ও যাত্রাপালার আঙ্গিকে রবীন্দ্রনাথ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে বার্ষিক নাট্যোৎসব। এ বিষয়ে থিয়েটার ও পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের সহকারি অধ্যাপক তানভীর নাহিদ খান বলেন, "আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগীয় নাট্যোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২০০৬ সাল থেকে। এই বিভাগে সারাদিন অর্থাৎ, সকাল ৮ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত কাজ হয়। আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থীরা বৈচিত্র্যময় ও নিরীক্ষাধর্মী অনেক কাজ শেখেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এস এম হল বা জগন্নাথ হলে নাটক হতো। এস এম হলের অডিটোরিয়ামটি মঞ্চনাটক চর্চার বেশ উপযোগী ছিল। এখানে সে সময় মুনীর চৌধুরী বা মুস্তাফা মনোয়ার নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। কাজেই প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখানে নাট্যচর্চার কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
নাটমণ্ডলে এই কেন্দ্রীয় বার্ষিক নাট্যোৎসব হয় সবার জন্য। টিএসসিতেও যেমন নাটক হলে প্রচুর দর্শক হয়, এখানেও সেটা হয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের বৈচিত্র্যময় ভাবনা ও নিরীক্ষা সবার মাঝে তুলে ধরাই তাদের উদ্দ্যেশ্য। সর্বশেষ নাট্যোৎসব ১৫ তম কেন্দ্রীয় বার্ষিক নাট্যোৎসব গত ২১ মার্চ থেকে ১লা এপ্রিল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে।
.jpg)
যাত্রাপালা আঙ্গিকে মঞ্চস্থ হয়েছে রবি ঠাকুরের নাটক 'বিসর্জন'।ছবি: লেখক
সম্প্রতি তিনি যাত্রাপালার আঙ্গিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিসর্জন নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি৷
এ নিয়ে তিনি বলেন, যাত্রা গণপর্যায়ে খুব জনপ্রিয় একটি ফর্ম। তবে এখন তৃণমূল পর্যায়ে নিম্নমান ও বিকৃত কাজের কারণে বর্তমানে এর সার্বজনীন দর্শক নেই। তবে ভালো কাজের আবেদন যাত্রায় আছে। রবীন্দ্রনাথের এই নাটকটির অভিনয় ধরণ উচ্চকিত হওয়ায় এটি যাত্রার অভিনয় ধরণের সাথে মেলে। নাটকটি ধর্মীয় কুসংস্কার ও ধর্মের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে। উগ্র সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্নদের সাথে উদার মানবতাবাদী মানুষদের চিরন্তন দ্বন্দ্ব বিদ্যমান থাকায় চলমান সময়েও নাটকটির যথেষ্ট প্রাসঙ্গিকতা আছে।''
বর্তমানে থিয়েটারে পালাবদল
এ সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় থিয়েটার দল 'ওপেন স্পেস থিয়েটার।' ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে এম আরিফুর রহমান ও মাহজাবীন চৌধুরী এটি প্রতিষ্ঠা করেন।
মার্কিন নাট্যকার রেজিনাল্ড রোজের বিখ্যাত লেখা টুয়েলভ এংগ্রি মেন (যেটি মূলত ছিল টিভি স্ক্রিপ্ট হিসেবে লেখা) এর প্রদর্শনী দিয়ে তারা যাত্রা শুরু করেন। এছাড়া অ্যান্ড দেন দেয়ার ওয়্যার নান ও আর্সেনিক এন্ড ওল্ড লেইস নাটক দুটোও তারা মঞ্চে এনেছেন। এক্ষেত্রে মূল প্রকাশনার কপিরাইট অনুমতিও সংগ্রহ করেছেন।
ওপেন স্পেস থিয়েটারের সুপরিচিত নাটক 'টুয়েলভ এংগ্রি মেন' এর একটি দৃশ্য। ছবি: ওপেন স্পেস থিয়েটার
ভাষার সাবলীলতা ও সহজবোধ্যতার জন্য তাদের রয়েছে আলাদা পরিচিতি। সমসাময়িক সময়ের থিয়েটার চর্চা চলমান সময়কে তুলে ধরতে পারছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, "আমার মনে হয়, না। কারণ, থিয়েটার যদি সফলভাবে চলমান সময়কে তুলে ধরতেই পারতো, তার প্রতিফলনটাও সমাজ জীবনে দেখা যেত। সেটা অনেক এডভান্সড পর্যায়। আমাদের এখানে থিয়েটার এখনো দৈনন্দিন জীবনের অংশ নয়। এখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থিয়েটার এর বক্তব্য যাই হোক না কেন, অভিনয়ের মান, পরিবেশনায় রক্ষণশীল মানসিকতা দর্শককে থিয়েটারের প্রতি অনাগ্রহী করে তোলে। থিয়েটারের সাথে দর্শক যখন নিজেকে মিলাতে পারে তখনই মানুষ থিয়েটারে আসতে শুরু করে এবং থিয়েটার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে। থিয়েটার নিজে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারলেই এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবকিছুই তখন প্রাসঙ্গিক হয়ে যায় এবং সেই ধরনের চর্চায় চলমান সময়ের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।"
থিয়েটার চর্চাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন তিনি। বললেন, "আমি দশ বছর প্রকৌশলী হিসেবে টেলিকম কোম্পানিতে কাজ করেছি। তারপর চাকরি ছেড়ে থিয়েটারকে পেশা হিসেবে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। আর মাহজাবীন তার পেশাগত জীবন শুরুই করেছেন ওপেন স্পেস থিয়েটারের সাথে। গুণগত বিনোদনের অভাবের শহরে থিয়েটারে সাবলীলভাবে মানুষকে যুক্ত করে গল্প বলতে পারার আত্মবিশ্বাস থিয়েটারকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে অনুপ্রেরণা যোগায়। নাটক অনুবাদ বা নির্দেশনার কাজ যখন করছি ; তখন একটা বিষয় কীভাবে তুলে ধরছি কিংবা মানুষ সহজে বুঝতে পারছেন কিনা এটা খেয়াল রাখি। চলমান তিনটি প্রযোজনার অনেক প্রদর্শনী হয়েছে ও হচ্ছে, সামনে আরো অনেক প্রযোজনা আসবে।"
সবশেষে থিয়েটার নিয়ে তার প্রত্যাশার কথা বলতে গিয়ে বললেন, "একটা সংস্কৃতি তৈরি হবে যেখানে থিয়েটারে কি হচ্ছে তা নিয়ে মানুষের মনে উত্তেজনা থাকবে, কাজগুলোর আলোচনা-সমালোচনা আড্ডায় জায়গা পাবে, শিল্পীরা তাদের কাজের মূল্যায়ন পাবেন। থিয়েটারে কাজ শিখে বড় মাধ্যমে সুযোগ এমন মানসিকতা থেকে সরে এসে থিয়েটারকেই বড় একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হবে। স্বতস্ফূর্তভাবে থিয়েটার চর্চা নিশ্চিত করার জন্য সরকারি, বেসরকারি উদ্যোগ ও পৃষ্টপোষকতা থাকবে। নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে না থেকে থিয়েটারের হল ছড়িয়ে পড়বে সবখানে, শিল্পীরা স্বাধীনভাবে তাদের সৃষ্টিশীল কাজগুলো দিয়ে মানুষের জীবনে জায়গা করে নিবেন।
মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
mahmudnewaz939@gmail.com