সোহাগ চাঁদ বদনী ধ্বনি
নাচো তো দেখি
সোহাগ চাঁদ বদনী ধ্বনি
নাচো তো দেখি
বালা নাচো তো দেখি
বালা নাচো তো দেখি
মানুষের ভেতরকার স্বতঃস্ফূর্ততার জীবন্ময় বাহ্যিক অভিব্যক্তি হলো নৃত্য। যদি কতগুলো জটিল রীতির ছকে ফেলা হয়, তাহলে সেগুলো ঠাঁই পায় শাস্ত্রীয় নৃত্যের কাতারে। যার যদি বন্ধনহীন পাখির মতো গতিময় হয় তবে সেটি একটি জনগোষ্ঠীর আনন্দের বাহক হয়ে ওঠে খুব সহজে, তখনই তাকে লোকনৃত্য বা সাধারণের নাচ বলে।
নানা ঢঙে মনের আনন্দের, উদযাপনের প্রকাশ ঘটেছে বাংলার জনমানসে। জীবন ঘনিষ্ঠ মুহূর্তগুলি হয়েই এইসব লোকনৃত্যের উদ্ভব। এতে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র আর সাধাসিধে বেশবাস একেবারে মাটির কোলের কাছে নিয়ে গেছে।
খ্যামটা নাচ
সময়ের কিছুটা পিছে ফিরলে চোখে ভেসে উঠবে জমিদার বাড়ির ঝকমকে উঠান। বড় রাজপুত্তুরের বিয়া, তাই যে বড় ধুম! মেয়েদের দল সারি করে নাচছে কোমর দুলিয়ে । পায়ের ছন্দময় সঞ্চালন ও চোখে মুখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তিতে বোঝা যাচ্ছে নাচে নাচে রাই-কেষ্টের পালা হচ্ছে আসলে। এই নাচটা হচ্ছে খ্যামটা নাচ।
কিছুদিন আগেও বগুড়া জেলায় কিছু মানুষ ধরে রেখেছিল এই নাচ, তবে আজ তা একেবারেই বিলুপ্ত।
গম্ভীরা নাচ
গম্ভীরা গানের সাথে পরিবেশিত হয় এই নাচ। মঞ্চে ওঠেন নানা ও নাতি। নাতির পায়ে ঘুঙুর, নানা নাতির গানে থাকে সমকালীন সমাজ, রাজনীতি ও নৈতিকতার নানান কেচ্ছা। মঞ্চে গানের ধুয়া তোলে দোহার আর তখনই সহজ ভঙ্গিতে হাত পা নেড়ে নেচে ওঠে নানা আর নাতি। এটি রাজশাহীর বেশ কিছু অঞ্চলে এখনো চোখে পড়ে।
লাঠি নাচ
লাঠি নাচ কয়েকশো বছর পুরনো নাচ। নাচটা ছিল এককালের যুদ্ধ প্রস্তুতির অংশ। একেক অঞ্চলের জমিদারেরা তাদের শৌর্যের গুণকীর্তন বাড়াতে লেঠেল বা লাঠিয়াল বাহিনীর নাচের আসর বসাতেন। এখনো লাঠি নৃত্য হয় মানিকগঞ্জস, নেত্রকোণা ,ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, জয়পুরহাট, নড়াইল অঞ্চলে, তবে তা নিছক শারীরিক কসরত হিসেবে।
এই নাচে এক হাতে থাকে চার হাত লম্বা লাঠি, অন্য হাতে থাকে থালার মতন ঢাল। সাথে একদল ঢোল, কাঁসা ও করতাল বাজাতে থাকে। মানিকগঞ্জ এলাকায় আবার লাঠির সাথে বেঁধে দিতো ঘন্টা। ঘন্টা বাজার সাথে সাথে পা বদলাতেন লাঠিয়াল। এই নাচে লাঠিকে সামনে পিছনে, মাথার দুপাশে, পা উঠিয়ে নামিয়ে নীচে ঘুরানো হয়।
ঢাক নাচ ও ঢালি নাচ
ঢাক নাচ আর ঢালি নাচ দুটোই পুরুষালি নাচ। মানিকগঞ্জ অঞ্চলে এটি প্রদর্শিত হতো। ঢাক বাজিয়ে আর ঢাল ঘুরিয়ে যুদ্ধে আহ্বান করার ভঙ্গি করেই নাচটি করা হতো।
পদ্মার নাচনত
লখাইরে সাপে কাটিছে, রাক্ষুসী পদ্মা নিছে পরাণ। কান্দি কান্দি চক্ষের জলে ভাসে বেহুলা।'
এমনি করুণাঘন গল্পের পদ্মার নাচন। বোঝা যাচ্ছেই এর মুখ্য কলাকার গ্রামীণ লোক গাঁথার দেবী পদ্মা বা মনসা। কুষ্টিয়া জেলার কৃষিশ্রমজীবী মানুষেরা বাড়তি জীবিকা আয়ে এই নাচ করে থাকেন।
জানা যায়, রিয়াজউদ্দিন মালিথা এই নাচের স্রষ্টা। সাধারণত শ্রাবণের শেষের দিকে এর আয়োজন বসে। নাচটা অনেকটা পালার আবহে ঘটে। থাকে গান থাকে সংলাপ। দুইজন বক্তা গান করেন। বাকি কুশীলবেরা নাচের সাথে আসর ঘোরেন।
ধামাইল নাচ
প্রাণ সখিরে
ঐ শোন কদম্বতলে বাঁশি বাজায় কে।
বাঁশি বাজায় কে রে সখি, বাঁশি বাজায় কে ॥
এগো নাম ধরিয়া বাজায় বাঁশি, তারে আনিয়া দে।
বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের কিছু গোষ্ঠী মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে ধামাইল নাচ করেন। দলে থাকে বিশ হতে পঁচিশ জন নাচুনি। কোনো পুরুষ এতে অংশ নিতে পারেন না। তালি মেরে নাচের শুরু হ। নাচটির সাথে রাঁধারমণের গানের অধিক প্রচলন দেখা যায়। একটি কাহিনীর ছন্দে নাচ গড়াতে থাকে।
সাঁওতাল নাচ
বসন্তের আবহে দোল পূর্ণিমায় ফুলে ফুলে সাজেন সাঁওতাল রমণীরা। তারপরে দল বেঁধে একে অপরের হাত ধরে নাচেন। একে বলে বাহা নাচ বা ফুলের নাচ। দিনাজপুর জেলার সাঁওতালিদের মধ্যে দেখা যায় বাহা নাচ।
এছাড়া সাঁওতাল তরুণীরা করেন দাসাই নাচ। এই নাচে মাথায় কাপড়ের ফেটি বেঁধে তাতে গুঁজে নেয় পাখির পালক আর পায়ে পরে ঘুঙুর।
ছয় জন নাচিয়ে দুই সারিতে পরস্পরের সামনাসামনি হয়ে আড়াই ফুট ফাঁকা রেখে বাজনার ছন্দে একসাথে তিন পা এগিয়ে পিছিয়ে নাচেন। তারপরে সারি দুটি ডান ও বাম দিকে ঘুরে যায়। কখনো আবার তারা বৃত্তাকারে ঘড়ির কাটার বিপরীতে ঘুরে ঘুরে নৃত্য পরিবেশন করেন।
মণিপুরী নৃত্য
বাংলার সকল লোকনৃত্যের যেন শিরোমণি মণিপুরী নাচ। লোকনৃত্য হয়েও শাস্ত্রীয় নৃত্যের সমপর্যায়ভুক্ত। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলার অনুসরণে এই নৃত্য। শিল্পীদের একজন সাজেন কৃষ্ণ তার সাথে এক জন রাঁধা । এই রাঁধাকৃষ্ণকে ঘিরে গোল করে নেচে যায় গোপীর দল। মণিপুরীরা নিজেদের ভাষায় একে জাগোই নাচ বলে । এই নাচটি আকর্ষণীয় সাজসজ্জা, বেশবাস ও উচ্চমার্গীয় নৃত্য শৈলীর জন্যে সবার প্রাণের আরাম। সিলেটের মাছিমপুরের মণিপুরী নৃত্য ধন্য করেছিলেন কবি নয়ন। তারপরই কবিগুরু এই নাচটি শান্তিনিকেতনে আশ্রমে আনার ব্যবস্থা করেন।
হুমদা নাচ
দেশে খুব অনাবৃষ্টি। নাচ প্রসন্ন করতে হবে হুমদা দেওকে, তিনি বৃষ্টির দেবতা। তাহলেই কেটে যাবে সব দুর্ভাগ্য। এই বিশ্বাস প্রচলিত আসবে রংপুরের রাজবংশীদের মধ্যে। সেই কৃষক রমণীরা সূর্য ডুবে গেলে দেবতাকে খুশি করতে হুমদা নাচ করেন।
বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এদেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির নানা উপাদান, এসব উপাদানের, ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার মৃত্যু ঘটে উদাসীনতায়। এই উদাসীনতা লোপ পাক, বাংলাদেশের লোকনৃত্যগুলোর ইতিহাস যেন চর্চিত হতে থাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করছেন।
susmi9897@gmail.com
