অস্ট্রেলিয়ান মাস্টারশেফে বাংলাদেশি-বংশোদ্ভূত প্রতিযোগী কিশোয়ার চৌধুরীর সেই খিচুড়ি প্ল্যাটারের কথা মনে আছে? বাঙালির রান্নাঘর থেকে খিচুড়ি তুলে নিয়ে এসেছিলেন রান্নার সেই মহামঞ্চে, খিচুড়ির সাথে আরও ছিল মাছ ভাজা, বেগুন ভর্তা। দেশীয় সংস্কৃতি হৃদয়ে ধারণ করে চলতে থাকা অসাধারণ কিশোয়ারের 'সাধারণ' এই খাবার মন জিতে নেয় বিচারকদের। বিশ্বসেরা শেফ থেকে শুরু করে বাঙালি আমজনতা, খিচুড়ির কদর আসলে সবজায়গাতেই।
তবে বৃষ্টির দিনে খিচুড়ির কদর যেন বেড়ে যায় কয়েকগুন। বিশেষত বর্ষাকালে ঝুম বৃষ্টিতে বাঙালির কাছে খিচুড়ির আবেদন আলাদা। আকাশে মেঘ সাজলেই মন যেন বলে, হয়ে যাক খিচুড়ি! অনেক সময় এমনও দেখা যায়, বৃষ্টিটাই হলো না, হয়ে গেল খিচুড়ি খাওয়া। বৃষ্টিতে অতিথি আপ্যায়ন হোক কিংবা পরিবারের সাথে বা নিজেকে নিয়েই বৃষ্টিবিলাস -- খিচুড়ি না হলে যেন চলে না। কিন্তু বৃষ্টিবিলাসে পূর্ণতা দেয়া বর্ষায় এই খিচুড়ি প্রচলনের গল্পটা না ছিল এতটা আমোদ-বিলাসের, না ছিল খুব শহুরে কিছু। বরং এর প্রচলনটা গ্রাম-বাংলার এবং সেখানকার মানুষের দুর্যোগ মোকাবেলার প্রচেষ্টার এক চিত্র।
বর্ষাকালে অধিক বৃষ্টির ফলে কোনো কোনো এলাকা পানিতে ডুবে যেত। পানিতে থৈ থৈ করত চারিদিক। অনেকসময় দেখা দিত বন্যাও। তাই ঘর থেকে বের হয়ে বাজার করাই ছিল যথেষ্ট কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ফলে, মাছ-মাংস, শাক-সবজির মতো পচনশীল খাবারের বদলে বেছে নিতে হতো ঘরে থাকা চাল-ডালের মতো শুকনো খাবার। গৃহবধূরা ঘরে থাকা সেই চাল-ডাল দিয়েই রান্না করে ফেলতেন খিচুড়ি।
এছাড়া গ্রামের লোকজন যে কাঠ বা শুকনো ডালপাতা ব্যবহার করে রান্না করতেন, বৃষ্টি হলে তা পাওয়াই দুষ্কর হতো। পাওয়া গেলেও বৃষ্টি নামলেই কাঠ যেত ভিজে। তাই কাঠের খরচ কমাতে তাড়াতাড়ি রান্না করার তাগিদে গৃহিণীরা এক হাঁড়িতে রান্না করে ফেলতেন খিচুড়ি। আর বর্ষাকালে নদীতে পাওয়া যেত অনেক বেশি মাছ, বিশেষত ইলিশ। এভাবে বর্ষায় নদীর তাজা ইলিশের আধিক্যে খিচুড়ির সাথে ইলিশ ভাজাও জড়িয়ে গেছে।
তবে এরও আগে খিচুড়ি ছিল মূলত বাউলদের খাবার। রাস্তায় রাস্তায় বাউলরা গান করে বেড়াতেন। আর লোকেরা ঘরে গান শুনে বাড়ি থেকে চাল এবং ডাল দিয়ে দিত। বাউলেরা বিশেষত বৃষ্টিদিনে কোনো ঝামেলায় না গিয়ে চাল ও ডাল এক হাঁড়িতে দিয়ে রান্না করে খেয়ে নিতেন। পরবর্তীতে সেটা খিচুড়ি নামে পরিচিতি পায়।
এবার আরো একটু পেছানো যাক, কেননা খিচুড়ির ইতিহাস কিন্তু কয়েক শতাব্দী পুরনো। মেগাস্থিনিস থেকে আকবর, জাহাঙ্গীর থেকে জগন্নাথ খিচুড়ি প্রিয় ছিল কিন্তু সবার কাছেই। আর ঈশ্বরগুপ্ত তো বলেই দিয়েছেন “শুঁটির খিচুড়ি করে খেয়েছে যে জন/ ভুলিতে না পারে আর তার আস্বাদন/ এই শীতে মুগের খিচুড়ি যেই খায়/সে জন ভোজনে আর কিছুই না চায়”! এদিকে পণ্ডিতের মতে সংস্কৃত ‘খিচ্চা’ প্রকার ভেদে ‘খেচরান্না’ শব্দ থেকে খিচুড়ি শব্দ এসেছে যার বাংলা অর্থ চাল ও ডাল মিশ্রিত খাবার।
আবার মোগল আমলেও সম্রাটদের প্রিয় খাদ্যের তালিকায় ছিল খিচুড়ি। বাদশাহ আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল আইন-ই-আকবরী বইতে সাত ধরনের খিচুড়ি তৈরির কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া চৌদ্দ শতকে ভারতে আসা রাশিয়ার ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারী আফানাসি নিকটিনের লেখায় পাওয়া যায় মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের খিচুড়িপ্রীতি। পেস্তা ও কিসমিস মেশানো খিচুড়িকে যিনি নাম দিয়েছিলেন ‘লাজিজান’; অর্থ- অতি সুস্বাদু। আওরেঙ্গজেবের হেঁশেলেও রান্না হতো মাছ ও ডিম মিশ্রিত 'আলমগিরি' খিচুড়ি।
তবে এই একুশ শতকে মোগলের হেঁশেলে নয়, বরং রেস্তোরাঁর টেবিলে পাওয়া যাচ্ছে নানা পদের খিচুড়ি। আর বর্ষা নামার সাথেই ছোটবড় সব রেস্তোরাঁয় যেন শুরু হয়ে যায় খিচুড়ি উৎসব। দেয়া হয় খিচুড়ির নিয়ে নানা অফার, নতুন নতুন সব খিচুড়ি আইটেম। আবার অনলাইনে খিচুড়ি অর্ডার নেয়াতে অনলাইন উদ্যোক্তা গৃহিণীরাও বসে নেই। এমনই অনলাইন উদ্যোক্তা ফারজানা হক জানান, “এমনিতে অন্যান্য খাবারের ভিড়ে খিচুড়ির অর্ডার কমই আসে। কিন্তু বর্ষাদিনে বৃষ্টি নামলে সবচেয়ে বেশি অর্ডার আসে খিচুড়িরই। ডিম খিচুড়ি, খিচুড়ি মাছ ভাজা, মাংস খিচুড়ির চাহিদা বৃষ্টি নামলেই হুট করে বেড়ে যায় বহুগুন।"
তবে রেস্তোরাঁ বা অনলাইন অর্ডারের বদলে, চাইলে বাড়িতেই খিচুড়ি উৎসব হয়ে যেতে পারে খিচুড়ির নানা পরিবেশনে। বেশ মিশুকে এ খাবারের সাথে মহাভোজে থাকতে পারে পছন্দের যেকোনো ভাজাভুজি বা তরকারি। আর শেষে চাটনি হলে তো কথাই নেই। হাতের কাছে থাকা চাল-ডালের মিশ্রণে নানান রকম মশলার সমাহারে বর্ষা উদযাপন হতে পারে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা সুস্বাদু খিচুড়িতে।
ইলিশ খিচুড়ি, ভুনা খিচুড়ি, সবজি খিচুড়ি, নবাবি খিচুড়ি ইত্যাদি নানাবিধ খিচুড়ির হাঁড়ি চুলায় চড়িয়ে দিতে পারেন মনমতো। আর নয়তো লেখার শুরুতে যার কথা বলেছিলাম, সেই কিশোয়ার চৌধুরীর রান্না করা প্ল্যাটারের মতো খিচুড়ি-মাছ ভাজা-বেগুন ভর্তাই কেন নয়!
ফারিয়া ফাতিমা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
fariasneho@gmail.com
