আজকের এই কর্পোরেট যুগে এমন খুব কম মানুষই আছেন যারা নিজের খাবার প্রতিদিন রান্না করার সুযোগ পান। প্রতিদিন খাবার রান্না করার চেয়ে বেশিরভাগ মানুষ বরং ফ্রিজে খাবার সংরক্ষণকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, খাবার সংরক্ষণের এই চিন্তাটি প্রথম মানুষের মাথায় এসেছিলো ইদানীংকার প্রযুক্তির উৎকর্ষসাধনেরও অনেক অনেক বছর আগে। ফ্রিজ ছাড়াও তখন দিনের পর দিন খাবার সংরক্ষণ করেছে মানুষ, কীভাবে?
শুকনো খাদ্য সংরক্ষণ
প্রাচীনকালে, যখন দূষণ এতটাও ভয়াবহমাত্রায় বর্তমান ছিলো না, তখন প্রাকৃতিকভাবে রোদ আর বাতাস-ই সংরক্ষণের জন্য খাদ্য শুকানোর কাজটি করে দিত।
ইতিহাসবিগণ জানান, প্রাচ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন সভ্যতাগুলো অনেক আগে থেকেই খাদ্য শুকিয়ে সংরক্ষণ করতো এবং এটি একশো কিংবা দুশো বছর আগের কথা নয়, একেবারে ১৪০০০ বছর আগেকার কথা। হ্যাঁ, প্রচন্ড রোদে খাদ্য শুকোনোর প্রমাণ প্রথম পাওয়া যায় ১২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।
মূলত ফল-ফলাদি এবং শাকসবজি জাতীয় খাদ্যকেই শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যেত। প্রাচীন রোমান সভ্যতা শুকনো ফল তো খুবই জনপ্রিয় একটি খাদ্য ছিলো, এমনকি আজকের দিনেও গোটা পৃথিবীর মানুষ শুকনো ফল বা ড্রাইড ফ্রুটস খেতে ভালবাসে।
মধ্যযুগে যেসব অঞ্চলে খাদ্য শুকোনোর জন্য পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যেত না, সেসব অঞ্চলে ‘স্টিল হাউস’ তৈরি করা হত শুধুমাত্র খাদ্য সংরক্ষণের জন্য। এসব স্টিল হাউসেও শুকোনোর জন্য মূলত ফল এবং শাকসবজিই প্রাধান্য পেত।
এ প্রক্রিয়ায় খাদ্য শুকোনোর জন্য ঘরের ভেতর প্রয়োজনমত আগুন তৈরি করে খাদ্যগুলোকে তাপ দেয়া হতো, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে আগুনের ধোঁয়া প্রয়োগ করেও খাদ্য শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হতো।
হিমায়িত খাদ্য সংরক্ষণ
তুষারাবৃত অঞ্চল, যেসব অঞ্চলে তাপমাত্রা বেশিরভাগ সময়েই হিমাঙ্কের কোঠায় স্থির থাকতো, সেইসব অঞ্চলেই সাধারণত খাদ্য হিমায়িত করে সংরক্ষণের চল ছিলো। যদিও অধিক সময় ধরে খাদ্য সংরক্ষনের জন্য হিমাঙ্কের চেয়ে কিছুটা বেশি তাপমাত্রাই ছিলো আদর্শতর তাপমাত্রা।
তাই, প্রাচীনকাল থেকে সেলার বা মাটির নিচের ঘর, গুহা ইত্যাদি ছিলো খাদ্য হিমায়িত করে সংরক্ষণের আদর্শ জায়গা।
আমেরিকার এস্টেটগুলিতে আইসহাউস বা বরফঘর অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলো। এসকল বরফ ঘরে একইসাথে বরফ এবং হিমায়িত খাদ্য, উভয়ই সংরক্ষন করা হতো। সময়ের সাথে সাথে এই আইসহাউসই আজকের আইসবক্স বা ফ্রিজে পরিণত হয়।
১৮০০ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবারের মত যান্ত্রিক হিমায়িতকরণ পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়, এবং খুব শিগগিরই বাণিজ্যিকভাবে এর ঢালাও ব্যবহার শুরু হয়।
১৮০০ সালের গোড়ার দিকে ক্ল্যারেন্স বার্ডসআই নিম্ন তাপমাত্রায় কুইক রেফ্রিজারেশন পদ্ধতিতে খাদ্যের স্বাদ ও গুণগতমান অক্ষুণ্ণ থাকার ব্যাপারটি আবিষ্কার করেন এবং কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি এই কুইক ফ্রিজ পদ্ধতিটিকে পুরোপুরিভাবে নিখুঁত একটি অবস্থায় নিয়ে আসেন। এর পর থেকেই খাদ্য সংরক্ষনের ক্ষেত্রে হিমায়িত খাদ্য সংরক্ষণের ধারণাটি একটি বিপ্লবে পরিণত হয়!
গাঁজন
গাঁজন প্রক্রিয়াটি উদ্ভাবিত না হয়ে আবিষ্কৃত হয়েছিলো বললে খুব একটা ভুল হবে না বোধহয়। গাঁজন আবিষ্কারের ইতিহাসটি এরূপ যে, বহুকাল পূর্বে আমাদের পূর্বপুরুষরা ভুলবশত কিছু শস্যদানা বাইরে বৃষ্টির মধ্যে ফেলে রেখেছিলেন, আর শস্যদানাগুলির আশেপাশের সুযোগসন্ধানী অণুজীবেরা ছেঁকে ধরেছিলো শস্যদানাগুলিকে, স্টার্চভিত্তিক স্যুগারকে পঁচিয়ে তৈরি করেছিল অ্যালকোহল। আর এভাবেই গাঁজন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম বিয়ার।
এই প্রক্রিয়াকে উন্নত করেই ধীরে ধীরে ফল থেকে বিভিন্ন ওয়াইন, বাঁধাকপি থেকে কিম চি, ইত্যাদি তৈরি করা শুরু হলো। প্রাচীন সভ্যতাগুলো এই গাঁজন প্রক্রিয়াকে নিজেদের খাদ্য সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করতে বিশেষ পারদর্শী ছিলো।
এমনকি কিছু নৃতাত্বিকরা তো এও বলে থাকেন, আনুমানিক ১০০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে মানবজাতি যাযাবর অবস্থা থেকে প্রথমবারের মতো থিতু হয়ে কৃষিকাজ শুরু করেছিলো বার্লির চাষ করার জন্য, যাতে তা থেকে বিয়ার তৈরি করা যায়। তখনকার মানুষের বিশ্বাস অনুসারে বিয়ার ছিলো খুবই পুষ্টিকর এবং ঐশ্বরিক একটি খাদ্য, যে কারণে বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতায় দেবদেবীদের উদ্দেশ্যে বিয়ার, কিংবা মোটাদাগে অ্যালকোহল উৎসর্গের যথেষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়।
শুষ্ককরণ
শুষ্ককরণ বলতে সাধারণত লবণ, তাপ কিংবা ধোঁয়ার সাহায্যে মাছ, মাংস, তামাক, ইত্যাদি সংরক্ষণকে বোঝায়। প্রথমদিকে অবশ্য এই শুষ্ককরণ বলতে শুধুই খাদ্যকে পানিশূন্য করাকেই বোঝানো হতো।
প্রাচীন সভ্যতাগুলিতে খাদ্য শুষ্ককরণে লবণের বহুল ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। খাদ্য সংরক্ষণের জন্য লবণ ব্যবহার করা সাধারণ ঘটনা ছিলো তো বটেই, তার সাথে সাথে অনেকক্ষেত্রে রান্নার জন্যও এটি একটি অত্যাবশ্যকীয় প্রক্রিয়া ছিলো।
খাদ্য শুষ্ককরণের জন্য সেসময় সৈন্ধব, সামুদ্রিক, মশলাযুক্ত ইত্যাদি নানা প্রকারের লবণ ব্যবহৃত হত। ১৮০০ সালের দিকে প্রথমবার খেয়াল করা হয় যে, নির্দিষ্ট কিছু উৎসের লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হলে তা প্রধানত মাংসকে একটি সুন্দর লালাভ রঙ দেয়, যেটি ক্রেতাদের কাছে সাধারণত ধূসর রঙের মাংসের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হয়।
যদিও এসব লবণের মধ্যে নাইট্রাইট থাকতো এবং ১৯২০ সালে আবিষ্কৃত হয় যে এই নাইট্রাইট আসলে ক্লস্ট্রিডিয়াম বটিউলিনাম নামক অণুজীবটির জন্য আদর্শ বাসস্থান, যা খাদ্যে বটিউলিজম নামক বিষক্রিয়ার জন্মদাতা।
এছাড়াও জ্যাম-জেলি বা আচার হিসেবে, কিংবা বদ্ধ পাত্রে এবং আরও অনেক উপায়েই খাদ্য সংরক্ষণ করার প্রথা চলে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। অতএব, আজকের একদিন রান্না করে তিনদিন খেতে পারার যে আরাম, তার জন্য ধন্যবাদটা কোনো না কোনোভাবে আমাদের পূর্বপুরুষদেরই বোধহয় প্রাপ্য!
শুভদীপ বিশ্বাস তূর্য বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
shuvodipbiswasturja1999@gmail.com
