ফোনে আড়িপাতা নিয়ে রিট হাই কোর্টে খারিজ


এফই ডেস্ক | Published: September 29, 2021 14:33:40 | Updated: September 29, 2021 18:41:40


ফাইল ছবি

বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাই কোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার এই আদেশ দেয়।

এর আগে গত ১৩ ও ১৯ সেপ্টেম্বর সব পক্ষের বক্তব্য শোনে আদালত। রিট অবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার। আর বিটিআরসির পক্ষে শুনানি করেছিলেন রেজা-ই রাকিব। খবরবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন রিট অবেদনেকারীদের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, যারা রিট আবেদনটি করেছেন, তারা আইনজীবী। আবেদনকারীরা ব্যক্তিগতভাবে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হননি। এ কারণে তাদের এই রিট আবেদন করার আইনগত এখতিয়ার নেই।

কারো ফোনালাপ ফাঁস হলে তিনি বিটিআরসি আইন অনুযায়ী প্রতিকার চেয়ে ফৌজদারি ও দেওয়ানি উভয় আইনেই মামলা করতে পারেন। ক্ষতিপূরণ চাওয়ার সুযোগ আছে। প্রতিকার পাওয়ার সুনির্দিষ্ট আইন থাকায় জনস্বার্থে রিট আবেদন করার সুযোগ নেই। তাছাড়া যাদের ফোনলাপ ফাঁস হয়েছে তাদের কেউ এসে কিন্তু রিট আবেদনটি করেননি। কেউ এসে বলেনি, তার ব্যক্তিগত গোপণীয়তা লঙ্ঘন হয়েছে।

বিটিআরসির আইনজীবী খোন্দকার রেজা-ই-রাকিব সেদিন অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য সমর্থন করে বলেছিলেন, আইনে যদি প্রতিকারের সুযোগ না থাকত তবে সংবিধান অনুযায়ী এই রিট আবেদন করার সুযোগ অছে। যেহেতু আইনে প্রতিকারের সুনির্দিষ্ট বিধান আছে, তাই রিট আবেদন করার সুযোগ নেই।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর রিটকারীদের অইনজীবী শিশির মনির অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিটিআরসির অইনজীবীর জবাব দেন।

সেদিন এ আইনজীবী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, রিটের এখতিয়ারের প্রশ্নে আদালতকে সুপ্রিম কোর্টের নয়টি রায় দেখয়েছেন তিনি। এই মামলাগুলো আইনজীবীরা করেছিলেন এবং সুপ্রিম কোর্ট সেগুলো গ্রহণ করেছিল।

আর রিট আবেদনকারীরা বিটিআরসির কাছে প্রতিকার চেয়েছিলেন কিনা সে প্রশ্নে বলেছিলেন, বিটিআরসিকে উকিল নোটিস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিটিআরসি কর্তৃপক্ষ কোনো জবাব দেয়নি।

এ আইনজীবীর ভাষ্য, আবেদনকারীরা যদি বিটিআরসিতে নাও যান, তারপরেও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের ৮৬ ধারা অনুযায়ী বিটিআরসি স্ব-উদ্যোগে এসমস্ত বিষয় তদন্ত করতে পারে। কিন্তু তারা তা করেনি।

আড়ি পাতা রোধে ও ফাঁস হওয়া ফোনালাপের ঘটনা কমিটি গঠন করে তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে গত ১০ আগস্ট হাই কোর্টে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের ১০ জন আইনজীবী। এর অগে গত ২২ জুন বিটিআরসির চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উকিল নোটিস দিয়েছিলেন তারা।

ফোনে আড়ি পাতা প্রতিরোধে আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) পদক্ষেপ জানতে চাওয়া হয়েছিল ওই নোটিসে। সে নোটিসের জবাব না পাওয়ায় তারা রিট আবেদনটি করেন।

রিটে ২০১৩ থেকে এখন পর্যন্ত আড়ি পাতার ২০টি ঘটনা তুলে ধরা হয়, যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার ফোনালাপ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ফোনালাপ, প্রয়াত আইনজীবী মওদুদ আহমদ এবং রাজশাহী মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার নাজমুল হাসানের ফোনালাপ, ভিকারুননিসা নূন কলেজের অধ্যক্ষের ফোনালাপ, মামুনুল হকের ফোনালাপ, যশোর-৬ আসনের সাংসদ শাহীন চাকলাদারের ফোনালাপ, ফরিদপুর-৪ আসনের সাংসদ মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনের ফোনালাপ, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হকের ফোনালাপ রয়েছে।

রিটে আবেদনে বলা হয়, সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে চিঠিপত্র ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনীয়তা সংরক্ষণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সংবিধানে এ অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানের তৃতীয় ভাগে যেসব মৌলিক অধিকারের কথা উল্লেখ আছে তার মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা সংরক্ষণ অন্যতম।

তাছাড়া বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১-এর ৩০ (চ) ধারা অনুযায়ী টেলিযোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা কমিশনের দায়িত্ব। কিন্তু এ ধরনের ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনা অহরহ ঘটছে। অথচ দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী কমিশনের দায়িত্ব হল ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সংরক্ষণ নিশ্চিত করা।

২০১৯ সালের ২৮ আগস্ট হাই কোর্টের তিন সদস্যের বৃহত্তর বেঞ্চের দেওয়া রায়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণও এই রিটে তুলে ধরা হয়।

ওই রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এ ক্ষেত্রে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন ও সেবা প্রদানকারী কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব সর্বাধিক। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সংরক্ষণ তাদের দায়িত্ব। তারা আইনের বিধান ব্যতিরেকে ব্যক্তিগত যোগাযোগের তথ্য প্রদান করতে পারে না।

টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩০ (১) (চ) ধারা এবং সংবিধানের ৩৯ ও ৪৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, সেই প্রশ্নে রুল চাওয়া হয়েছিল রিটে।

এছাড়া আদালত রুল জারি করলে তা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কমিটি গঠন করে ফাঁস হওয়া ব্যক্তিগত ফোনালাপের ঘটনাগুলো তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল।

সব পক্ষের বক্তব্য শুনে হাই কোর্ট বুধবার রিট আবেদনটি খারিজ করে আদেশ দিল।

Share if you like