Loading...

ফেরদৌসী-রামেন্দুর ভালোবাসার মূলমন্ত্র

| Updated: February 14, 2022 10:01:50


ফেরদৌসী-রামেন্দুর ভালোবাসার মূলমন্ত্র

ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’জনেই সাহিত্যে পড়াশোনা করতেন; রামেন্দু ইংরেজিতে, ফেরদৌসী বাংলায়। বিভাগ আলাদা হলেও সহায়ক বিষয় সমাজ বিজ্ঞানের শ্রেণিকক্ষে তাদের প্রথম দেখা ও পরিচয়। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

ক্লাস শেষে ফেরদৌসীকে রিকশা খুঁজে দেওয়ার ছুতোয় ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে আলাপ জমাতেন রামেন্দু; আলাপ দীর্ঘায়িত করতে বেশিরভাগ দিন হাঁটতে হাঁটতে ফেরদৌসীদের সেন্ট্রাল রোডের বাসা পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসতেন।

এরপর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মাইলের পর মাইল পথ মাড়িয়ে রামেন্দুই প্রথমে ফেরদৌসীকে ভালোবাসার কথা জানান। পরে মুনীর চৌধুরীর ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ নাটকে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দু’জনের সম্পর্ক আরও গাঢ় হয়েছিল।

ভালোবাসার শক্তিতে ধর্মের দেয়াল আর সমাজের রক্ষণশীলতার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে ১৯৭০ সালের ১৪ মার্চ গাঁটছড়া বাঁধেন তারা; তবে সেই পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না বলে জানান ফেরদৌসী।

তিনি জানান, খুব রক্ষণশীল ছিলেন তার বাবা; বাসায় এ কথা জানানোর মতো পরিস্থিতি ছিল না। পরে অনেক চেষ্টায় বাবাকে রাজি করিয়েছিলেন। তার দুই ভাই কবীর চৌধুরী ও মুনীর চৌধুরী বিয়েতে গুরুত্বপূ্র্ণ ভূমিকা রাখেন।

ঘরোয়া আয়োজনে কাছের বন্ধুদের নিয়ে কবীর চৌধুরীর গুলশানের বাসায় বিয়ে হয়। কোনো গহনা পরা হয়নি; বেলি ফুলের মালা আর কানের দুলে নিজেকে বধু সাজিয়েছেন ফেরদৌসী। বিয়ের শাড়িটি এখনও যত্ন করে রেখেছেন তিনি।

অনাড়ম্বর আয়োজনে বিয়ের পর প্রায় ৫২ বছর ধরে একসঙ্গে কাটিয়ে দিলেন তারা।  মঞ্চ আর টিভি অঙ্গনে একের পর এক বিচ্ছেদের ভিড়ে রীতিমতো যুগল জীবনের ‘উদাহরণ’ হয়ে উঠেছে এ জুটি।

আপনাদের ভালোবাসার মূলমন্ত্র কী? এমন প্রশ্নের জবাবে রামেন্দু মজুমদার বলেন, “আমার কাছে মনে হয়, ভালোবাসার মূলমন্ত্র হল- ট্রাস্ট। আমরা পারস্পরিক বিশ্বাস ও কিছু মূল্যবোধে বিশ্বাস করি।”

ফেরদৌসীর ভাষ্য, “পারস্পরিক বিশ্বাসের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশাপাশি একে অপরের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে সম্মান দেওয়া জরুরি।”

ষাট-সত্তরের দশকের ভালোবাসার সেই চিরায়ত রূপটি আগের মতোই থাকলেও যুগে যুগে ভালোবাসা প্রকাশের ভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে বলে জানান তিনি।

এই সময়ের ভালোবাসার প্রকাশ নিয়ে তিনি বললেন, “ভালোবাসার কনসেপ্ট ঠিক আছে কিন্তু প্রকাশটা যুগের সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের সময় যেমন প্রকাশ ছিল এখন তেমন সেরকম নেই।”

বর্তমানু সময়ে দাম্পত্যজীবনে বিচ্ছেদের হার বেড়ে যাওয়ার খবর এসেছে গণমাধ্যমে; বিভিন্ন গবেষণাও বিচ্ছেদের হার বেড়ে যাওয়ার তথ্য এসেছে। এর কারণ কী বলে মনে করেন?

জবাবে রামেন্দু বলেন, “আমি বলব, এটা যুগের পরিবর্তন। আমাদের সময় হয়তো সনাতন মূল্যবোধ আমাদের মধ্যে কাজ করেছে, অনেকে হয়তো বাধ্য হয়ে থেকেছে। ভেবেছে, দাম্পত্যজীবন শেষ করা যাবে না।

“এখন আর সেরকম কিছু মনে করে না। দম্পতিদের মধ্যে সঙ্কট হলে... মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আছে। আগে মেয়েদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকায় একা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারত না, এখন সেটা পারছে।

“অর্থনৈতিকভাবে সে স্বাধীন, তার যোগ্যতা আছে। সে কাজ করতে পারে। ব্যক্তি-স্বাধীনতাটা এখানে কাজ করেছে।”

রামেন্দু-ফেরদৌসীনামা

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে নাট্যকার আবদুল্লাহ আল মামুন নাটকের দল ‘থিয়েটার’ গঠন করলে তার অগ্রভাগে ছিলেন রামেন্দু ও ফেরদৌসী মজুমদার।

অভিনয় জগতে পাঁচ দশকের পথচলায় মঞ্চ ও টেলিভিশনে ‘কোকিলারা’, ‘এখনো ক্রীতদাস’, ‘বরফ গলা নদী’, ‘জীবিত ও মৃত’, ‘বাঁচা’, ‘যোগাযোগ’, ‘সংশপ্তক’, ‘চোখের বালি’, ‘নিভৃত যতনে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘এখনও দুঃসময়’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ সহ বহু নাটকে অভিনয় করে প্রশংসিত হন ফেরদৌসী মজুমদার।

অভিনয় শিল্পে ভূমিকার জন্য ১৯৯৮ সালে তিনি একুশে পদক এবং ২০২০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পান।

রামেন্দু মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষকতাকে বেছে নিয়েছিলেন পেশা হিসেবে। পরে তিনি যোগ দেন বিজ্ঞাপন শিল্পে।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের কয়েকটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এই অভিনয় শিল্পী ১৯৭২ সালে ‘বিটপী অ্যাডভার্টাইজিং’ এ পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। পরে ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বিজ্ঞাপনী সংস্থা ‘এক্সপ্রেশানস’।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই তিনি টিভি নাটকে ছিলেন নিয়মিত। বাংলাদেশের নাটককে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন রামেন্দু মজুমদার।

১৯৮২ সালে তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট- আইটিআই’ এর বাংলাদেশ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এখন তিনি এই সংগঠনের সাম্মানিক সভাপতি।

বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রামেন্দু মজুমদার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিষদ সদস্য এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য তিনি।

নাট্যচর্চায় অবদানের জন্য তিনি ২০০৯ সালে একুশে পদক পান।

 

Share if you like

Filter By Topic