Loading...

ফুল চাষি কিংবা ফুল ব্যবসায়ি, ভালো নেই কোন পক্ষই

| Updated: March 06, 2022 10:26:39


ফুল চাষি কিংবা ফুল ব্যবসায়ি, ভালো নেই কোন পক্ষই

ঢাকা শহরের শাহবাগ, মগবাজার, মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি ও মিরপুর-১ কিংবা মিরপুর-১০ এর মতো জায়গাগুলোয় রয়েছে বেশকিছু ফুলের দোকান। এসব জায়গায় বিক্রি হয় বিভিন্ন ধরনের ফুল।

এক বিকালে ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবর ও ধানমণ্ডি ১৫ নম্বর এলাকার ফুলের দোকানে বিভিন্ন ফুল দেখতে দেখতে কথা হয় ফুলবিক্রেতা কবির হোসেনের সাথে। তিনি জানালেন, এখানে গোলাপ ১৫- ২০ টাকা করে বিক্রি হয়। সাভারের গোলাপগ্রাম থেকেই হয় মূল সরবরাহ।

বিশেষ দিনে (যেমন ১৪ ফেব্রুয়ারী) দাম ওঠে ৩০-৪০ টাকা। তবে পাইকারেরা দাম বাড়িয়ে দেয়ায় সাধারণ রেটে অর্থাৎ, ২০ টাকায় বিক্রিতে লাভ হয়না তেমন।

মোহাম্মদপুরে নূরজাহান রোডের ফুলের দোকানগুলোতেও দেখা গেল একই চিত্র। ফুলবিক্রেতা আসলাম জানালেন, ১৪ ফেব্রুয়ারি বা ২১ ফেব্রুয়ারিতে ফুলবিক্রি বেশি হয়। আর এদিকে শাহবাগের তুলনায় দাম বেশি।

বিশেষ দিনে একটা গোলাপ ৪০ টাকাও বিক্রি হয়। অন্যদিন হয়তো ১০-১৫ টাকা। আর গোলাপের বাইরে জারবেরা বা আরো কিছু ফুল দিয়ে সেট তৈরি করে বেচা হয় ৬০০-৭০০ টাকায়। বেশিরভাগই অনুষ্ঠানগুলোয় লাগে।

বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে তখন। শাহবাগ মোড়ে ফুলের দোকানগুলো আলোয় আলোয় সজ্জিত। কিছু কিছু দোকানের সামনে লোকজনের মোটামুটি আনাগোনা আছে। কিছু দোকানের লোকেরা বসে আছেন  ফুলের পসরা সাজিয়ে, ডাকছেন আশপাশের ক্রেতাদের। তবে ফুল কেনার লোক তখন খুব বেশি একটা নেই।

শাহবাগ মোড় থেকে আরো সামনে সোজা গেলে চোখে পড়ে বেশকিছু ফুলের দোকান। এরকম দোকানগুলোর আছে সুন্দর সুন্দর নাম। যেমন- নীলকণ্ঠ, ফুলবাহার, ভাই ভাই, জালাল, ইমন ফ্লাওয়ার শপ ইত্যাদি। তবে দোকানের ফুল কিংবা নামগুলো সুন্দর হলেও ব্যবসায়িক অবস্থা সুবিধাজনক নয়।

একটি ফুলের দোকানে বসে ছিলেন সেখানকার মহাজনের বন্ধু নয়ন ও কর্মচারী হৃদয়। হৃদয় জানালেন, " এখানে আমরা নানারকম ফুল আনি। গোলাপ, জারবেরা, গ্লাডিওলাস, গাঁদা - আরো বহুরকম ফুল।

“বেশিরভাগ ফুল আসে সাভার থেকে। ওখানে যে গোলাপ গ্রাম আছে সেখান থেকে। তবে সব জিনিসের মতো ফুলেরও দাম বাড়তির দিকে। আগে ধরেন, ৮ টাকায় গোলাপ কিনে ১২ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন একটা গোলাপের কেনা দামই ১২ টাকা বা তার বেশি। এখন ২০ টাকায় বেচতে চাইলে ক্রেতা তো নিতে চায়না।"

 

তিনি আরো যোগ করলেন, "গোলাপ সাভার থেকে বেশি আসলেও জারবেরা বা অন্যান্য ফুলগুলা ফরিদপুর, যশোর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসে। যেদিন ফুল নামানো হয়, ওদিনই পাঠানো হয় এখানে। তবে আলাদাভাবে ফুল বেঁচে লাভ নেই তেমন। বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বিয়ের গাড়ি বা বাড়ি সাজানোর কাজ পেলে তখন লাভ হয়। "

পাশে বসা নয়ন যোগ করলেন, "আমরা তো মনে করেন যে দামে কিনি, তার চেয়ে হয়ত ২-৩ টাকা লাভে বিক্রি করি। কখনো কখনো কেনা দামেই দিয়ে দেই। বিয়ে বাড়ির কাজ হলে সবকিছুর পর হয়ত হাজার দুয়েক টাকা লাভ থাকে। "

তাদের মতো সংকটে ফুলচাষী বা কৃষকরাও কতটা আছেন জানতে চাইলে কিছুটা জোরের সাথে দুজনই বললেন, "ওরা অনেক ভালো আছে। চাষের গোলাপের  কেনা দাম প্রায় ডবল হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা তো সেই হারে লাভ পাচ্ছিনা।' 

 ক্রেতা কমে যাওয়ার পেছনে শাহবাগের পরিবেশগত পরিবর্তনকেও দায়ী মনে করেন নয়ন। মেট্রো রেল প্রকল্পের জন্য স্থাপন করা দেয়ালের কারণে বড় গাড়ি এখানে দাঁড়াতে পারেনা। ভেতরের দোকানগুলোর লোকেরা এজন্য বেশ সমস্যায় পড়ছেন।

“চলাচলের রাস্তা ছোট হয়ে আসছে। তবে বিশেষ দিন যেমন- ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখ বা ২১ তারিখ বেচাবিক্রি ভালো হয়। মাসেরও ব্যাপার আছে। যেসব মাসে বিভিন্ন দিবস আছে, প্রোগ্রাম হয় সেসব মাসে বিক্রি বেশি হয়। ফেব্রুয়ারি-মার্চ, আগস্ট, ডিসেম্বরে বেচা-বিক্রি তুলনামূলক বেশি হয়।"

ভাই ভাই পুষ্প বিতানের মহাজন ছিলেন না। তবে পাশের এক কর্মচারী সৈকত আহমেদ জানালেন তাদের মূল লাভ হয় গাঁদাফুল থেকে।

"এই যে ধরেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের স্টেজ সাজাতে গাঁদা ফুল অনেক কাজে লাগে। আবার বিয়ের গাড়ির জন্য  এই ফুল আছে এক নাম্বারে। আমরা অবশ্য গাঁদা-গোলাপ যাই বলেন সব সাভার থেকেই আনি। গাঁদার আলাদা সেটও আছে। একসেট ৮০-৯০ টাকা করে।"

নীলকণ্ঠ নামের দোকানটায় কথা বলতে গেলে তিনি কথা বলতে চাননি। পাশে থাকা শান্তা পুষ্প বিতান বা জালাল ফ্লাওয়ার শপে কথা বলতে গিয়ে বেরিয়ে এলো অন্য এক করুণ বাস্তবতা।

শান্তা পুষ্প বিতানের আনোয়ার হোসেন ফুলব্যবসায় আছেন বিশ বছরের বেশি। কথা বলার সময় ছিলেন শান্ত ও স্বাভাবিক।

তবে কণ্ঠে বেশ আক্ষেপ নিয়ে বললেন, "করোনার আগে ভালোই চলছিলো সব। এরপর বহুদিন দোকান বন্ধ। এখন ফুলের দাম যে হারে বাড়াতে হয়েছে, তাতে করে ক্রেতারা আগের মতো আসছেন না। আর দোকানও তো অনেক।”

তবে তার কথার মাঝেই পাশের জালাল ফ্লাওয়ার শপের মো. জালাল উদ্দীন এসে উগরে দিলেন তার ক্ষোভ।

“আমাদের অবস্থা খারাপের চেয়ে বলা ভালো যে, আমাদের আসলে (ব্যবসার) কোনো অবস্থা নাই। ফুলের কেনা দাম কোনরকম ওঠে আরকি। করোনার ওই টাইমে এমনও দিন গেছে সকালে খাইলে দুপুরেরটা বাদ দিতে হইছে। সোজা কথায়, আমরা ভালো নাই। "

 বিভিন্ন দোকান ভেদে বড় সেটের মিক্সড ফ্লাওয়ার ৫৫০-৮০০ টাকা ও ছোট সাইজেরগুলো ৩০০-৪০০ টাকা দাম রাখেন তারা। তবে সবারই ভাষ্যে একটা বিষয় পরিষ্কার - বিশেষ দিবস কিংবা বিয়ে বাড়ি বা সভার মঞ্চ ছাড়া আলাদাভাবে ফুলের নিয়মিত ক্রেতা নেই। 

তবে নিজেরা সংকটে থাকলেও ফুলচাষিরা তাদের চেয়ে বেশি ভালো আছেন এবং লাভের মুখ দেখছেন বলে তারা মনে করেন। যদিও এক্ষেত্রেও রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগী বা মহাজনি দাপট। যার কারণে, তাদের সাদা চোখে তৃণমূল চাষিদের সংকটটি তেমন দৃশ্যমান নয়।

মুদ্রার অপরপিঠে নজর দিলে বেরিয়ে আসে সেই সত্যও। যেমন বলা যায় ফুলচাষি নাজমা বেগমের কথা।

নিজ জমিতে জারবেরা ও গোলাপের চাষ করছিলেন তিনি। বরাবর চাষের অবস্থা ভালোই ছিলো। কিন্তু করোনা পরবর্তী সময়ে ফুল বিক্রিতে ধ্বস নামে। অনেকসময় উপযুক্ত দাম না পেয়ে কষ্ট করে চাষ করা ফুল গরু-খাসিকেও খাওয়াতে হয়েছে।

ব্যবসাসূত্রে নেয়া ব্যাংক লোন ও এনজিও লোনও শোধ করতে পারছেন না তিনি। দশ লক্ষের বেশি টাকার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চলছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা।  

 

আবার প্রায় ২৫ বছর ধরে গোলাপ চাষ করা সাজেদা বেগম ও ইমামুল হোসেন দম্পতির সংকটের গল্পটাও প্রায় এক। তারা জানালেন যে, এই দীর্ঘ দুইযুগের বেশি সময়ে কখনো এতটা কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়নি।

এখন চাষ অনুযায়ী বিক্রি নেই। আগে ফুল যে পরিমাণে বিক্রি হতো, এখন তার অর্ধেকও হয়না। তাই দাম কিছুটা বেশি ধরা হয়। কিন্তু তাতেও পুরো দাম ওঠানো বেশ কষ্টের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। 

দাম হয়তো একটা গোলপে আগের চেয়ে ২-৩ টাকা বেশি চাওয়া হয়, কিন্তু বিক্রিই যদি অর্ধেক হয় আর বাকিটা যদি গবাদিপশুর পেটে যায় কিংবা পঁচে যায়, তবে আর লাভ থাকেনা কোথাও।

সব মিলিয়ে তীব্র এক সংকট বিরাজ করছে ঢাকার ফুল ব্যবসায়। ভালো নেই আমাদের ফুলচাষি কিংবা ব্যবসায়ি – কোন পক্ষই। দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত উর্ধ্বগতির সাথে পাল্লা দিতে হওয়ায়  লাভের অংকে পিছিয়ে পড়েছেন তারা। আর ক্রেতাদের কাছে  ফুল তো কখনো ক্ষুধার চেয়ে বড় নয়।

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic