Loading...

প্রেরণার উৎসভূমিতে যেতে হবে আমাদের-২

| Updated: August 15, 2021 19:54:39


গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থল

মধুমতী নদীর তীরে গোপালগঞ্জ, সেখানকার নয়নাভিরাম এক গ্রাম টুঙ্গিপাড়া। সেই গ্রামে জন্মেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ এই পূণ্যভূমি আলোকিত হয়ে ওঠে প্রিয় নেতাকে ধারণ করে।  পঞ্চান্ন বছরের গৌরবময় জীবনের পরিসমাপ্তিতে আবারও ফিরে গেছেন তিনি সেখানে। সেই পৈতৃক ভিটাতেই ঘুমিয়ে আছেন তিনি। আর কোনোদিন তিনি ঘুম ভেঙে জেগে উঠবেন না।

টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিতে এসে বাঙালি সশ্রদ্ধচিত্তে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। পরাধীনতার সুদীর্ঘ গ্লানি থেকে জাতিসত্তার যে মুক্তি ঘটেছে, সেজন্য শ্রদ্ধা নিবেদন করে। তখন সুপ্তির ঘোর থেকে জেগে ওঠে দেশপ্রেমের ফল্গুধারা।

 প্রায় ৩৬০ বছর পূর্বে সাবেক ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বসতি স্থাপন করেন বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরুষেরা। আদি পৈতৃক বাড়িটি নির্মাণ করেন জমিদার শেখ কুদরতউল্লা। বঙ্গবন্ধু এ ভিটেতেই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বর্ণাঢ্য শৈশব- কৈশোর এখানেই অতিবাহিত হয়। এখানকার নদী, মাঠ, মেঠোপথ, গাছগাছালি আর মানুষের সঙ্গে গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাঁর। আজীবন সেই সম্পর্ক তেমনি নিবিড় ছিলো-আছে। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা হয়েও তিনি জন্মসূত্রের সেই বন্ধনকে পরম মমতায় লালন করেছেন সকল সময়। তাই নিয়তি নির্ধারিত শেষ ঠিকানাও যেন তাঁর টুঙ্গিপাড়ার সেই আদি ভিটা। পনেরো আগস্টের কালো অধ্যায়ের নৃশংসতা কেড়ে নিয়েছে প্রিয় নেতার প্রাণ। কিন্তু অতল ঘুমের ভেতর থেকেও তিনি সব থেকে প্রাণবান। উজ্জ্বল তিনি জ্যোতিষ্কের মতোন। 

বত্রিশ নম্বর বাড়িটিতে বেশ কবার গেছি, কিন্তু টুঙ্গিপাড়ায় যাওয়া হয়নি। মনের ভেতর প্রবল ইচ্ছেরা দানা বেঁধে উঠেছে, তবুও কীভাবে যেন তা আর হয়ে উঠছিলো না। অবশেষে ২০১৭ সালের ২৫মার্চ স্পর্শ করেছি জাতির পিতার সমাধিসৌধ। সেদিন খুব সকালে বের হই গোপালগঞ্জের উদ্দেশ্যে। মাওয়া ফেরিঘাটে অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হতে পারে, এমন আশঙ্কা ছিলো। সে কারণেই তাড়া। তবে অনন্ত যৌবনা পদ্মা পাড়ি দিতে সময় খুব লাগেনি। ওপারে গিয়ে দেখেছি পদ্মা সেতু নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ। স্বপ্ন এবং সম্ভাবনার বাস্তবায়ন।

বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থলে

সেদিন বসন্তের মাতাল হাওয়া আর রৌদ্রের রূপে উজ্জ্বল  ছিলো প্রকৃতি। সড়কের দুপাশের নিসর্গশোভা দেখতে দেখতে এক সময় গন্তব্যে পৌঁছেছি। তখন মধ্যাহ্ন, সেখানে আমাদের মতো বহু মানুষ শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার টানে এসেছে বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে।

সমাধি প্রাঙ্গণটি আয়তনে বিশাল। লাল সিরামিক ইট এবং সাদা-কালো মার্বেল পাথর দিয়ে নির্মিত এই সৌধের সামনে এসে চোখ জলে ভিজে আসে, কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়। কেমন এক গাম্ভীর্য আর বেদনার চিহ্ন প্রকাশ পেয়েছে এই সমাধিসৌধের কারুকার্যে। এখানে গোলাকার গম্বুজবিশিষ্ট মূল সমাধিসৌধের অভ্যন্তরে পিতামাতার পাশে পরম মমতায় শুয়ে আছেন জাতির পিতা।

সমাধিসৌধের নান্দনিক ও গাম্ভীর্যপূর্ণ নকশা, দেয়ালে জাফরি কাটা। সেখানে আলোছায়ার খেলা চলছে অবিরত। নীরবতাই সেখানে সকল কথার মালা গেঁথে দেয়। সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশটাকে প্রিয়জন হারানোর বেদনায় মনের ভেতর বেদনার ভায়োলিন বাজিয়ে চলে অবিরত।

আমরা প্রবেশ করেছিলাম এক নম্বর ফটক দিয়ে। পরিপাটি চারপাশ, প্রশস্ত পথ, গাছের সারি, ফুলের শোভা খুব আকৃষ্ট করেছিলো আমাদের। দেখেছি ছোট্ট শিশুরা দল বেঁধে ভেতরে প্রবেশ করছে। ওরা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছে বোঝা গেলো। বড়োদের নির্দেশ মেনে ওরা সমাধি কমপ্লেক্সের বিভিন্ন দিক ঘুরে দেখছিলো। ওদের কণ্ঠে ছিলো ইতিহাস জানবার কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন । আবার লক্ষ করেছি, শিশুরা শান্ত আর নির্বাকভাবে বেরিয়ে আসছে মূল সমাধিসৌধ থেকে। তখন তাদের চোখের গভীরে একরাশ ঘনীভূত  বেদনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কারো চোখের কোণে জল ভেসে এসেছে নিজের অজান্তেই।                  

কমপ্লেক্সের ভেতরেই আছে সমৃদ্ধ এক পাঠাগার, আছে একটি জাদুঘর। এছাড়া রয়েছে  উন্মুক্ত মঞ্চ, প্রশাসনিক ভবন, বকুলতলা চত্বর, স্যুভেনির কর্নার আর ক্যাফেটেরিয়া। জাতির পিতার সমাধিসৌধে এসে গুচ্ছ গুচ্ছ হয়ে নানান বয়সি মানুষ ঘুরে ঘুরে দেখছে সেসব। প্রদর্শনী কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধুর বর্ণিল আন্দোলনমুখর সময়ের আলোকচিত্রসমূহ সংরক্ষিত আছে তিনি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অঙ্কিত বহু শিল্পকর্ম সযত্নে রাখা আছে, আছে মুক্তিসংগ্রামের বিভিন্ন ধাপে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র।

দেখলাম, ভীড় লেগে আছে বঙ্গবন্ধুকে বহন করে আনা কফিনটির কাছে। এখানে এসেও সকলে কেমন নির্বাক-নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। এযেন বেদনার কালো ছায়া শুধু নয়, একই সঙ্গে শোককে শক্তিতে পরিণত করবার আত্মসংকল্প গ্রহণেরই নির্বাক প্রকাশ।

সমাধি কমপ্লেক্স ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর পৈতৃক বাড়িটিতে ভ্রমণার্থীরা আরও অনেক স্মৃতিস্মরণ নিতে সমর্থ হন। এখানে আছে দুটো স্বচ্ছ জলের পুকুর। মধ্য দুপুরে ঘাটে কয়েকজন প্রবীণ দর্শনার্থী বসে জিরিয়ে নিচ্ছেন। শৈশব- কৈশোরে বঙ্গবন্ধু এই পুকুরে সাঁতার কেটেছেন। কেমন এক অনুভূতি খেলা করে মনের মধ্যে। অনেক স্মৃতি ছড়ানো ছিটানো এই ভূমির প্রতি ইঞ্চিতে। এখানে আছে হিজলতলা ঘাট, আছে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বালিশা আমগাছ, ছেলেবেলার খেলার মাঠ। ১৮৫৪ সালে নির্মিত শেখ বাড়ির জামে মসজিদটিও রয়েছে । নানান বৈচিত্র্য রয়েছে এখানকার বৃক্ষরাজির। আলোছায়ার দীর্ঘ খেলা দর্শনার্থীদের প্রশান্তি দেয়। শুনেছি যখন হিজলফুলের মরশুম, তখন অসংখ্য হিজলের গোলাপি আভায় পথ রঙিন হয়ে থাকে। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির পাশের ছোট খাল আর জিটি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় তাঁর শৈশবের স্মৃতিস্মারক হিসেবে পরিদর্শন করতে আসেন দর্শনার্থীরা। পাশেই আছে শেখ রাসেল পার্ক। সব মিলিয়ে নানান বয়সি ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এই স্থানটি হয়ে উঠেছে অপরিহার্য ভ্রমণ এলাকা।

টুঙ্গিপাড়ার ধুলোমাটিতে মিশে আছে প্রিয় নেতার অমলিন স্মৃতি। সেই সব দেখে যে কেউ রোমন্থন করতে পারেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির জীবনকে। আমিও সেদিন টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে আর সবার মতো বারবার ফিরে গেছি ইতিহাসের কাছে। 

 ফেরার পথে কেবল মনে হয়েছে সকল বাঙালির অপরিহার্য ভ্রমণ গন্তব্য হওয়া উচিত এই সমাধিসৌধ। বিশেষত নতুন প্রজন্মকে সেখানে নিয়ে যেতে হবে। ইতিহাসের মহানায়কের স্মৃতিকে ধারণ করে আছে যে ভূমি তাকে স্পর্শ করতে হবে আগামী প্রজন্মকে। সশ্রদ্ধ চিত্তে আর গভীর ভালোবাসায় তারা স্মরণ করবে জাতির পিতাকে। আগামীর বাংলাদেশ যে সমৃদ্ধির প্রশস্ত পথে হাঁটবে, তারজন্য প্রয়োজন নিখাদ দেশপ্রেম এবং অমিত সংকল্প। সেই সংকল্প আর শপথের উৎসভূমি হিসেবে নতুন প্রজন্মকে নিয়ে যেতে হবে বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধে।   

ড. রওনক জাহান, সহযোগী অধ্যাপক, সরকারি তোলারাম কলেজ, নারায়ণগঞ্জ।

rownakbabu21@gmail.com

 

 

 

Share if you like

Filter By Topic