কিডনি প্রতিস্থাপনে রোগীর কাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা নিয়ে দাতার সঙ্গে চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকায় রফা করে পরিশোধ করা হত মাত্র দুই লাখ টাকা।
সোশাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বিত্তশালী রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র ও অভাবীমানুষকে অর্থের বিনিময়ে রাজি করানো হত কিডনি প্রতিস্থাপনে। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
অবৈধভাবে কিডনি কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের পাঁচ সদস্যকে মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর ভাটারা,বনশ্রী ও মিরপুর থেকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য জানিয়েছে র্যাব।
গ্রেপ্তাররা হলেন- মো. শহিদুল ইসলাম মিঠু (৪৯), মো. মিজানুর রহমান (৪৪), মো. আল মামুন ওরফে মেহেদী (২৭), মো. সাইমন (২৮) ও মো. রাসেল হোসেন (২৪)।
বুধবার কারওয়ানবাজার মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-১ এর অধিনায়ক আব্দুল মোমেন জানান, প্রতারণার মাধ্যমে অবৈধভাবে কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সঙ্গে কয়েকটি চক্র সক্রিয় রয়েছে।
গ্রেপ্তার পাঁচজনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, তারা জানায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিডনি কেনাবেচার এই চক্রের সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ জন।
এই চক্রের সদস্যরা পার্শ্ববর্তী দেশে অবস্থানরত কিডনি কেনাবেচা চক্রের সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রায় শতাধিক মানুষকে পাশের দেশে পাচার করেছে বলে জানা গেছে।
গ্রেপ্তার শহিদুল ইসলাম মিঠু এই চক্রের হোতা জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০১৬ সালে নিজের চিকিৎসার জন্য তিনি পাশের দেশে গিয়েছিলেন।
সেখানে থাকার সময় সে কিডনি প্রতিস্থাপনের রোগীদের ব্যাপক চাহিদা দেখতে পায় এবং সে নিজেই কিডনি প্রতিস্থাপনের অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা শুরু করে।
এ পর্যন্ত মিঠুর মাধ্যমে ৫০ এর অধিক কিডনি ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে বলে সে প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছে।
চক্রের অপর সদস্য মিজানুর রহমান কিডনি দাতাদের পাশের দেশে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পাসপোর্ট, ব্যাংক এনডোর্সমেন্ট, মেডিকেল ডকুমেন্টস, ভিসা এবং অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি করে থাকে।
গ্রেপ্তার মিজানুর গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে এসব কাজ করে আসছে বলে জানান র্যাব অধিনায়ক।
যে সকল ব্যক্তির কাগজপত্র থাকে না কিংবা প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টের ঘাটতি থাকে, তাদের কাগজপত্র জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সে প্রস্তুত করে থাকে।
র্যাব জানায়, চক্রটি বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধ উপায়ে হাতিয়ে নিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছে।
প্রতিটি কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য তারা রোগী প্রতি ২০ হতে ২৫ লাখ টাকা গ্রহণ করত। বিপরীতে কিডনি ডোনারকে ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অগ্রিম ২ লাখ টাকা প্রদান করত।
কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের পর কিডনি দাতাদের প্রতিশ্রুত অর্থ না দিয়ে নানাবিধ ভয়ভীতি দেখাত।
চক্রটি মূলত তিনটি দলে ভাগ হয়ে কিডনি বেচাকেনার অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে আসছে বলে জানায় র্যাব।
আব্দুল মোমেন বলেন, চক্রের প্রথম গ্রুপটি ঢাকায় অবস্থান করে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন প্রয়োজন এমন বিত্তশালী রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে।
দ্বিতীয় দলটি প্রথম দলের চাহিদা মোতাবেক দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরীব ও অভাবী মানুষদের চিহ্নিত করে এবং অর্থের বিনিময়ে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের জন্য ডোনার হতে প্রলুব্ধ করে ঢাকায় নিয়ে আসে।
অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে প্রলোভনে পড়া কিডনি দাতাদের ঢাকায় বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীর সাথে ব্লাড ম্যাচিং এবং অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে এই চক্রের তৃতীয় একটি গ্রুপ।
পরে কিডনি প্রতিস্থাপনের উপযুক্ততা নিশ্চিত হলে, তার পাসপোর্ট, ভিসা প্রসেসিং এবং ভুয়া কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে কিডনি দাতাকে পাশের দেশে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই চক্রটি কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীদের পার্শ্ববর্তী দেশে কিডনি চিকিৎসায় সহায়তার নাম করে, অর্থ আয়ের উদ্দেশে, কিডনি প্রতিস্থাপনে উৎসাহিত করত।
এই চক্রের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশে অবস্থানকারী আরেকটি চক্র পারস্পরিক যোগসাজশে ভূক্তভোগী কিডনি ডোনারকে বিদেশের এয়ারপোর্ট অথবা স্থলবন্দরে রিসিভ করা থেকে শুরু করে বাকি কাজ সারে।
হাসপাতালের ডকুমেন্টেশন, অস্ত্রোপচারসহ যাবতীয় কার্যক্রম শেষে ভূক্তভোগীদের বৈধ বা অবৈধ উপায়ে বিমান বা উত্তর পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত এলাকার মাধ্যমে দেশে ফেরত পাঠায়।
চক্রের গ্রেপ্তার সদস্যদের কাছ থেকে চুক্তির এফিডেভিট কপি, ১৪টি পাসপোর্ট, কিডনি ক্রসম্যাচিংয়ের বিভিন্ন কাগজপত্র, দেশি-বিদেশি মুদ্রা, বিভিন্ন ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র ও তার ফটোকপি, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই ও এটিএম কার্ড, সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের জাল সিলমোহর ও খালি স্ট্যাম্প জব্দ করা হয়েছে।
র্যাব জানায়, কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেওয়ার আড়ালে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কিডনি কেনাবেচার এই ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সম্প্রতি র্যাবের সাইবার মনিটরিং সেল ভার্চুয়াল জগত তথা সোশাল মিডিয়ায় অবৈধভাবে কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় সিন্ডিকেটের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আসছিল।
সিন্ডিকেটের সদস্যরা অনলাইনে বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে গ্রাহক ও দাতাদের আকৃষ্ট করে থাকে। এসব চক্রের ফাঁদে প্রলুব্ধ হয়ে অসহায় নিম্নআয়ের মানুষসহ ক্ষেত্র বিশেষে গ্রাহকরাও প্রতারিত হচ্ছে।
র্যাব অধিনায়ক মোমেন বলেন, আইন বহির্ভূত, স্পর্শকাতর ও অবৈধ ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের এহেন কার্যক্রমে চক্রের সদস্যরা অর্থের লোভে অমানবিক কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে।
এই চক্রের গ্রেপ্তার পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার প্রক্রিয়া চলছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান তিনি।
সোশাল মিডিয়া কেন্দ্রিক কিডনি কেনাবেচার অন্যান্য চক্রগুলোকেও আইনের আওতায় নিয়ে আসতে সাইবার মনিটরিং ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলেও জানায় র্যাব।