জীবনের খোঁজে বহির্জগত বা মহাকাশে নজর রাখছে মানব জাতি। মঙ্গলগ্রহে তালাশ করছে বা তালাশের আংশিক কাজ শেষ করেছে মানুষের পাঠানো একাধিক অনুসন্ধান যান। জীবনের খোঁজে সৌরজগতের আরো কয়েক স্থানে গেছে মানুষের পাঠানো যান। শুধু তাই না মানুষের পাঠানো যান সৌরজগত পার হয়েও ধেয়ে চলছে। পাশাপাশি অব্যাহতভাবে চলছে বেতার দুরবিনের মাধ্যমে বহির্জগতে জীবন খোঁজার বিরামহীন তৎপরতা। ঠিক সে সময় যদি বলা হয়, পৃথিবীই বহির্জগতে ছড়িয়ে দিচ্ছে জীবন। জীবনের কণিকারাজি। বা জীবনের বীজ। তাহলে? চমকে উঠবে অনেকেই!
এরই সূত্র ধরে যদি আরো বলা হয়, আজকের পৃথিবীতে যে জীবনকে দেখতে পাচ্ছি তারও হয়ত সূচনা হয়েছিল এভাবেই । মহাজগতের ভিন্ন কোনো প্রান্ত থেকেই উড়ে এসে পৃথিবীতে জুড়ে বসেছিল জীবন কণিকা। তারপর তা হয়েছে বিকশিত এবং বিবর্তিত!
হ্যাঁ, সম্প্রতি এ বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে প্রসেডিং অব রয়্যাল সোসাইটি এ। অনলাইনে প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধের নাম অন দ্যা ফোর্স অব ভার্টিক্যাল উইন্ডস ইন দ্যা আপার অ্যাটমোস্ফিয়ার: কনসেকোয়েন্স ফর স্মল বায়োলজিক্যাল পার্টিকেলস। অর্জন বেরেরা এবং ড. জে ব্রিনারের লেখা এ গবেষণাপত্রকে উৎস ধরে একাধিক ব্রিটিশ সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণেও নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।
গবেষকরা জীবনের ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে কাজ করতে যেয়ে বায়ুর ঊর্ধ্ব গতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। বায়ুবাহিত হয়ে কণিকারাজি কতোটা উচ্চতায় যেতে পারে তাও সে সময়ে খতিয়ে দেখা হয়। ব্যাকটেরিয়ার মতো খুদে কণিকারাজি পৃথিবীর ৯০ মাইল উর্ধ্বাকাশ পর্যন্ত যেতে পারে। গবেষকরা দেখতে পান। তারা আরো বলেন, এখান থেকে কণিকারাজি মহাজগতে ঢুকেছে বলে ধরে নেওয়া হয়। তীব্র-গতির মহাজাগতিক ধূলিকণা পৃথিবী থেকে আসা এসব কণিকারাজি বয়ে মহাশূন্য নিয়ে যেতে পারে বলেও গবেষক দলটি ধারণা ব্যক্ত করে। এভাবে মঙ্গলের মতো কোনো ভিনগ্রহে জীবনের যাত্রা শুরু হতে পারে। হতে পারে সেখানে জীবনের বীজ বপনের প্রাথমিক তৎপরতা।
পাশাপাশি পৃথিবী থেকে প্রথম মহাকাশ ভ্রমণের কৃতিত্ব দিতে হলে তাও পাবে এ সব ব্যাকটেরিয়া কণিকা। প্রথম মহাকাশচারী হিসেবে ইউরি গ্যাগরিন প্রথম চন্দ্র অবতরণকারী হিসেবে নীল আমর্স্টংএর নাম নেওয়া হলেও তাদের বহু আগেই বায়ু প্রবাহে ভেসে মহাকাশ ভ্রমণ সাঙ্গ করেছে ব্যাকটেরিয়াকুল। তাদের হাজার হাজার বছর আগেই এ ভ্রমণ পর্ব শেষ করেছে খুদে অণু-জীবমণ্ডলী।
ব্রিটেনের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলটি মনে করে, একই সূত্র ধরে বলা যায়, ভিন গ্রহ, হতে পারে মঙ্গল হতেই একদিন এভাবে জীবনের কণিকা বা জীবনের বীজ এসে পড়েছিল পৃথিবীতে। আর আজকের নীল গ্রহ পৃথিবীতে সেই কণিকাই বিকশিত ও বিবর্তিত হয়ে সৃষ্টি করেছে বিচিত্র জীবন তরঙ্গ।
প্রধান গবেষক অর্জুন বেরেরা মেইল অনলাইনকে বলেন, বায়ু প্রবাহের রেশে গ্রহান্তরের পথ ধরেছে জীবন মনে করা হলে বরং বিজ্ঞানের দিক থেকে অনেক বেশি যুতসই মনে হয় এবং বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রমাণ মেলে।
জীবনবাহী কণিকারাজি পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা সেটাই খতিয়ে দেখা হয়েছে রয়্যাল সোসাইটিতে এতে প্রকাশিত
বিজ্ঞানপত্রে। গবেষকরা বলেন, হ্যাঁ তুলনামূলক ভাবে বড়ো আকারের এসব কণিকার উর্ধ্বমুখী বায়ু প্রবাহ দিয়ে উর্ধ্ব-বায়ুমণ্ডলে নিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি আছে।
আগে মনে করা হতো প্রাণমণ্ডল ৫০ মাইল ঊর্ধ্বাকাশ পর্যন্ত কেবল বিরাজ করে। কিন্তু এর চেয়ে উপরে বিরাজ করে বলে ধারণা ব্যক্ত করেন এ দুই গবেষক। প্রকাশিত গবেষণাপত্রটিতে আরো জানান হয় যে, ভূপৃষ্ঠ থেকে আড়াইশ মাইল উপরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্র বা আইএসএসে পৃথিবী থেকে বায়ু প্রবাহে বয়ে নিয়ে যাওয়া ডিএনএর নমুনা পাওয়া গেছে। মহাকাশ কেন্দ্রটির বাইরের দিক থেকে সংগৃহীত ধূলিকণার নমুনা যোগাড় করা হয় ২০১৮ সালে। সে নমুনায় পাওয়া যায় এ ডিএনএ।
ভূচৌম্বকীয় ঝড়ের সময় উর্ধ্ব বায়ু প্রবাহের গতি ঘণ্টায় তিনশ পয়ত্রিশ মাইল বেগে পৌঁছায়। সৌরবায়ু প্রবাহের কারণে এমন ঝড় উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে ব্যাকটেরিয়া আকারের কণিকারাজিকে ৯০ মাইল বা তার চেয়ে বেশি উর্ধ্বকাশে বয়ে নেওয়া সম্ভব বলে গবেষকরা মনে করেন। এ সময়ে ভিন্ন গ্রহের পথে যাওয়ার মতো যথেষ্ট গতি এ সব কণিকার থাকে বলেও গবেষকরা ধারণা করেন।
বেরেরা টাইমসকে বলেন জীবনের বীজ বোনার জন্য অল্প কয়েকটা জৈব কণিকাকেই কেবল ছড়িয়ে পড়লেই চলবে। ধরুন পৃথিবী থেকে এ ভাবে মাত্র কয়েকটা জৈব কণিকা বের হয়ে গেল তারপর জীবন-বিকাশের জন্য অনুকূল ভিন গ্রহে যেয়ে পড়ল তা হলে সবার অগোচরে জীবন বিকাশের ধারা কাজ করতে শুরু করবে। তিনি আরো বলেন, ধরে নেই, জৈব কণিকা ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা খুবই বিরল, খুবই কম হারে ঘটেছে, ধরুন প্রতি ৫০ বছরে একবার মাত্র এ রকম ঘটনা ঘটেছে। ভূতাত্ত্বিক সময়কালের মাপকাঠিতে ফেলে হিসাব কষলে এ ভাবে জীবন বিস্তারের মতো বহু ঘটনাই ঘটবে। প্রকাশিত বিজ্ঞানপত্রের হিসাবে মঙ্গল গ্রহের মহাকর্ষ তুলনামূলক ভাবে দুর্বল এবং আবহমণ্ডল পাতলা তাই সেখানে এ প্রক্রিয়া ঘটা তুলনামূলক ভাবে সহজতর হবে।
বহির্জাগতিক জীবন, বিশেষ করে বুদ্ধিমান জীবনের খোঁজে মহাবিশ্বে প্রথম বার্তা পাঠানো হয় ১৯৭৪ সালে। একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানী আরেসিবো মানমন্দিরের বেতার দুরবিন থেকে এ বার্তা পাঠান। ২৫,০০০ আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রপুঞ্জ এম১৩কে লক্ষ্য করে এ বার্তা পাঠানো হয়। এদিকে বহির্জাগতিক বুদ্ধিমান জীবনের জন্য পরোক্ষভাবে খোঁজ করার তৎপরতা, বহির্জাগতিক বুদ্ধিমান জীবনের অনুসন্ধান (দ্যা সার্চ ফর এক্সট্রাটারেসটিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা) এসইটিআই নামে পরিচিত। এ তৎপরতা নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে কোনো মত পার্থক্য নেই। এর বিপরীত অবস্থানে রয়েছে সক্রিয়ভাবে বহির্জাগতিক বুদ্ধিমান জীবনকে লক্ষ্য করে বার্তা পাঠানোর তৎপরতা, মেসেজিং এক্সট্রাটারেসটিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা, এমইটিআই। এই তৎপরতার অংশ হিসেবেই বার্তা পাঠান হয় ১৯৭৪ সালে। এ তৎপরতাকে নিয়ে চলছে নানা বিতর্ক।
বিতর্কের কথা আপাতত ভুলে যাই, ভিন্নতর চিন্তা করি। ধরুন, এ সব অনুসন্ধানের মধ্য, দিয়ে আজ থেকে শত শত কোটি বছর পরে, খোঁজ পাওয়া গেল বহির্জাগতিক বুদ্ধিমান জীবনের উপস্থিতি এবং দেখা গেল পৃথিবী থেকে যাওয়া জৈব কণিকারাজি থেকেই বিকশিত ও বিবর্তিত হয়েছে সে জীবন! তা হলে কী হবে সেদিন, ভাবতে পারেন কেউ!