Loading...

পুরনো দিনের ঢাকার ঈদ

| Updated: May 05, 2022 10:03:48


১৯৫৪ সালে আলোকচিত্রী জেমস বার্কের ক্যামেরায় ঢাকার ঈদ। ছবি: বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র ১৯৫৪ সালে আলোকচিত্রী জেমস বার্কের ক্যামেরায় ঢাকার ঈদ। ছবি: বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র

প্রতি বছর ঈদে নাড়ির টানে ঘর ছাড়েন অনেকেই। কিন্তু কাজের সূত্রেই হোক কিংবা স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবেই হোক- অনেকে ঈদে রয়ে যান ঢাকাতেই। আজকের ঢাকা নিয়ে অনেকের আছে আক্ষেপ, অনেকের আছে এই নগরীতে টিকে থাকার একটু চেষ্টা। আবার সেই সঙ্গে আছে আশি বা নব্বই দশকের শেষে ঢাকার ঈদ নিয়ে স্মৃতিকাতরতা।

কেমন ছিলো সে সময়ের ঈদ, আর এখনই বা কেমন? এ নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন লেখক হাসান মাহবুব, চলচ্চিত্র আন্দোলনকর্মী ও গবেষক বেলায়াত হোসেন মামুন এবং কবি ও সাংবাদিক সৈকত আমীন।

ঈদের অনুষ্ঠানমালার পাতা যত্ন করে রেখে দিতাম, মূল আকর্ষণ ছিলো ব্যান্ডশোঃ হাসান মাহবুব

আমার শৈশবটা কেটেছে উত্তরাঞ্চলে। জলঢাকা, সৈয়দপুর, দিনাজপুর, জয়পুরহাটের পানি উন্নয়ন বোর্ড কলোনিতে গচ্ছিত আছে বড় হবার স্মৃতি। তবে ঈদ কখনও সেসব জায়গায় করেছি বলে মনে পড়ে না। আমরা ঈদ করতাম দাদাবাড়ি পাবনায়। দুই-একবার করেছি নানাবাড়িতে, ঢাকায়।

আমি ঢাকায় আসার জন্যে সবসময় উতলা হয়ে থাকতাম। ঢাকা আমার কাছে মনে হতো স্বপ্নের শহর। রাতের বেলা ছাদ থেকে সারি সারি আলোকস্তম্ভ তথা ঘর-বাড়ি দেখে ধারণা করতাম এই শহরে কোন এক জাদুকর মুঠো মুঠো স্বর্ণচূর্ণ ছড়িয়ে দিয়েছে, তাই এখানে এত আলো, এত উৎসব। তাই ঢাকায় বসবাসরত আমার তুতো ভাই-বোনদের আমার হিংসে হতো। মনে হতো ওরা অনেক স্মার্ট, আর সবকিছুতে আমার থেকে অনেক এগিয়ে। তবে হিংসা করলেও তাদের ভালোওবাসতাম খুব। আর তাদের জন্যেই ঢাকায় ঈদ করাটা আমার কাছে অত্যন্ত প্রার্থিত ব্যাপার ছিলো। 

তখনকার ঢাকার ঈদের একটি আবশ্যক অনুষঙ্গ ছিলো ঈদকার্ড। নিউমার্কেট থেকে আমরা ঈদকার্ড কিনতাম। সাধারণগুলি ৫-১০ টাকা। ১০ টাকার বেশি দাম হলে সেটি স্পেশাল! ঈদের আগে আমাদের মূল কার্যক্রম ছিলো ঈদকার্ডে যার যার নাম লিখে শুভেচ্ছা জানিয়ে তাকে পৌঁছে দেয়া।

ঢাকার পাড়ায় পাড়ায় অস্থায়ী বিভিন্ন দোকান গজিয়ে উঠতো। তারা নানারকম ঈদের উপহার বিক্রি করতো। ঈদকার্ডের পাশাপাশি ডায়েরি, শো-পিস, ব্যাগ, কলমদানি ইত্যাদি পাওয়া যেতো। তবে স্মারক উপহার হিসেবে ঈদকার্ডের জনপ্রিয়তাই ছিলো সবচেয়ে বেশি। ঈদকার্ড কেনার পাশাপাশি অনেকে নিজে নিজেই ঈদকার্ড তৈরি করতো। কে কয়টা ঈদকার্ড পেয়েছে এ নিয়ে প্রতিযোগিতা চলতো। প্রতি বছরের ঈদের কার্ডআমরা জমিয়ে রাখতাম।

মোলাকাত এবং কদমবুছি তখন ছিলো আবশ্যক বিষয়। ঈদের নামাজ শেষে পরিচিতদের সাথে মোলাকাত, কারও বাসায় খাবার খেতে গেলে মোলাকাত, রাস্তায় কারও সাথে দেখা হলে মোলাকাত করতে হতোই। সবাই এটা আনন্দ এবং আন্তরিকতার সাথেই করতো। মুরুব্বীদের কদমবুছি করার ব্যাপারটাও একইরকম ছিলো। এখন এই বিষয়ে আমাদের উৎসাহ অনেকটাই কমে গেছে বোধ হয়।

ঈদের তিন দিন পত্রিকা প্রকাশ হতো না, এটা ছিল আমার জন্যে একটা বেদনাদায়ক ব্যাপার। এখন যেমন ফেসবুকের নিউজফিডে সময় কাটাই, তখন তার বদলে ছিলো দৈনিক পত্রিকা। অন্তরালে চলে যাবার আগে পত্রিকাগুলি জানিয়ে দিতো ঈদের অনুষ্ঠানমালা। কোন চ্যানেলে কী অনুষ্ঠান হবে। আমরা সেই পাতাটা যত্ন করে রেখে দিতাম।

আমাদের মূল আকর্ষণ ছিলো ‘ব্যান্ড শো’। সেই সময়কার ব্যান্ড শোতে প্রচারিত অনেক গান কালজয়ী হয়ে গেছে। এখনও মানুষ শোনে। প্রচুর গানের এ্যালবাম বের হতো, আমরা কিনে ঈদের দিন শুনতাম ক্যাসেট প্লেয়ারে। 

ঈদ বদলেছে, ঢাকা বদলেছে, তখনকার অনেককিছুই মিস করি। তবে ঈদের সৌন্দর্য আমার কাছে এখনও আগের মতই আছে।এখনও ‘কালকে ঈদ’ এই অনুভূতিটা আমার ভেতর চনমনে একটা আনন্দের অনুভূতি বাজাতে থাকে।

পুরান ঢাকার হরেক রকম ঈদ কার্ডের সমাহার। ছবি: সাজিদ সৈকত

তখনও প্রযুক্তি আমাদের পৃথক করেনি, মানুষ একা বাঁচতে শেখেনি: বেলায়াত হোসেন মামুন

ঢাকায় নব্বইয়ের দশকের ঈদ এখনকার মতো ছিল না৷ হয়ত ওই সময়টা আর আজকের সময়ের মাঝে কেবল সময়ের নয়, প্রযুক্তিগত বাস্তবতার একটা বড় পার্থক্য আছে৷ যা আগের ওই সময়টাকে আর কখনও ঠিক ওভাবেঅনুভব করার সুযোগ দেবে না৷

আমার জন্ম ঢাকায়৷ আমার কখনও গ্রামে থাকা হয়নি৷ যতটুকু গ্রামে যাওয়া তা বেড়াতে যাওয়ার মাঝে সীমিত৷ গ্রামে 'থাকা' আর বেড়ানো তো এক নয়৷ তাই এখন পর্যন্ত আমার ঈদ বিষয়ক সবটা স্মৃতি আসলে ঢাকার স্মৃতি৷

ঢাকার আমার শৈশবের ঈদের স্মৃতি দারুণ হইচইয়ে ভরা৷ সমবয়সী বন্ধুদের সাথেই এই হইচই৷ এটা শুরু ঈদের দিন ভোরে৷ মা ঈদের নামাযের জন্য তাড়া দিয়ে উঠিয়ে দিতেন৷ ঈদের দিন ভোরে স্নান সেরে ফেলাটা ছিলো প্রথম কাজ৷ এমনিতে সমস্যা হত না৷ কিন্তু যখন শীতে ঈদ হত তখন খুব সমস্যা হত৷ কারণ কনকনে ঠান্ডায় ঘুম থেকে ওই ভোর বেলায় স্নান করা মানে একটা যুদ্ধ জয়৷ এরপর নতুন পাঞ্জাবী পরেমসজিদে যাওয়ার জন্য তৈরি হওয়া৷

ঈদের নামাযের জন্য তৈরি হয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে মা সেমাই খেতে দিতেন৷ সেমাই না খেয়ে বের হওয়া বারণ ছিল৷ এরপর মসজিদে যাওয়া৷ জায়নামায সাথে নিয়ে যেতাম৷ নামায শেষ হওয়ার পর শুরু হত কোলাকুলি পর্ব৷ মহল্লায় ছোট-বড় সবাই যেহেতু পরিচিত৷ তাই কোলাকুলি হত দীর্ঘ সময় ধরে৷ এর মধ্যে বন্ধুদের সাথে দেখা হলে তো কথাই নেই!

মসজিদ থেকে বাড়ি ফিরে বাসার বড়দের সালাম করে সালামি পাওয়াটা একটা স্বাভাবিক বিষয় ছিল৷ দেখতাম বড়রা সালামের জন্য তৈরি থাকতেন৷ আর সালামি হিসেবে নতুন কড়কড়ে টাকা দিতেন৷ যখন একটু বেশি ছোট ছিলাম তখন সালামি পাওয়া টাকার নোট ছিল ছোট, বয়সের সাথে সাথে এটা বড় হতে থাকে৷ আর এখন অবশ্য সালামি আর পাই না, উল্টো দিতে হয়৷

নব্বইয়ের দশকে আমাদের ঈদের দিনটা মূলত দুইটা পর্বে বিভক্ত ছিল৷ ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত মূলত পারিবারিক সময়৷ এরপর বন্ধুদের বাড়ি যাওয়া৷ মহল্লায় যত বাল্যবন্ধু আছে তাদের মোটামুটি সবার বাসায় একবার যাওয়া হত৷ খাওয়াদাওয়া পর্ব হত৷ অনেক আড্ডা হত৷ এরপর বন্ধুরা সব একজোট হয়ে দুপুরের খাবারটা কোনো একজনের বাড়িতে করা হয়ে যেত৷ দুপুরের খাওয়ার পর্বটা মোটামুটি দীর্ঘ হত৷ খাওয়া এবং আড্ডায় বিকেল পর্যন্ত সময় কেটে যেত৷ এরপর আমরা বাইরে বেরুতাম৷

বিকেলটা ঘোরাঘুরি করে অথবা ওই ঈদে মুক্তি পাওয়া কোনো সিনেমা সব বন্ধু মিলে দেখতে যেতাম৷ মনে আছে, কৈশোরের একটা বড় সময় নিয়ম করে আমার দুই বাল্যবন্ধুর সাথে ঈদের দিন চলচ্চিত্র দেখতে যেতাম৷ এটা কৈশোরের সময়টা কাটতে কাটতে কমে আসে৷ তারুণ্যের শুরুতে ঈদের দিন সিনেমাহলে যাওয়ার চেয়ে বন্ধুদের সঙ্গ ও আড্ডা অধিক ভালো লাগতে থাকে৷

আমাদের শৈশবে মহল্লায় ঈদের দিনের আনন্দ ছিল সত্যিকারের উৎসবমুখর একটা ব্যাপার৷ আমাদের থেকে যারা একটু বড় তাদের উদ্দীপনার প্রধান বিষয় থাকতো তাদের ভালোবাসার মানুষকে একটু দেখা, কথা বলা বা হাসি বিনিময়ের বিষয়৷ আর এ জন্য তারা পথে দলবেধে অপেক্ষায় থাকতেন৷ আমাদের মত যারা তাদের ভাষায় 'শিশু' তারা ওই দিন স্বাধীনতা বেশি থাকায় কখনও কখনও আমরা হতাম ডাক হরকরা৷

ঢাকায় মহল্লা ব্যাপারটা এখন আর তেমন নেই৷ তাই ওই সময়ের উষ্ণ পরিবেশ আর অস্তিত্বশীল নয়৷ তাই আজ যাদের শৈশবকাল, তারা একটা গোটা মহল্লায় তাদের দাপিয়ে বেড়ানোর আনন্দ আর পায় না৷হয়তআর পাবেও না, কারণ ঢাকা আর পুরোনো সেইপরিবেশে ফিরেযেতেপারবে বলে মনে হয় না৷

এখন মনে হয় ঈদের আনন্দটা আসলে যতটা শিশু-কিশোরদের, ততটা বড়দের নয়৷ আমরা ওই কৈশোরকালে বড়দের ঈদের আয়োজন বিষয়ক যন্ত্রণা বুঝতাম না৷ আমাদের কাছে ঈদ ছিল একটপূর্ণাঙ্গস্বাধীনতার দিন৷ এই দিন অনেক খাওয়া দাওয়া হবে, সবাই সবাইকে অত্যন্ত আন্তরিক উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাবে, আর ঈদের দিনের বাতাসে প্রচুর আনন্দ, সাহস আর ভালোবাসা ভেসে বেড়াবে৷ তাই ওই শৈশবে ওই বাতাসে শ্বাস নেয়ার মানে হচ্ছে সত্যিকারের আনন্দ অনুভব করা৷

এর কারণ তখনও প্রযুক্তি আমাদের পৃথক করে নি৷ মানুষ একা বাঁচতে শিখে নি৷ মহল্লায় বাঁচা মানে সবার সাথে বাঁচা৷ নিজের পরিবারের বাইরেও মহল্লাটাকে মনে হত বড় পরিবার৷আমিতেমনএকটিসময়পেয়েছিলাম।

ঈদ সালামি খরচ করে কেনা হতো হরেক রকম খেলনা: সৈকত আমীন

আমাদের ঈদ আসলে শুরু হতো চাঁদরাত থেকেই। মহল্লার সবাই বাসা থেকে বের হয়ে চাঁদ দেখার জন্য গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ফকফকা আকাশে যখন চিকন এক ফালি চাঁদ ভেসে উঠত, তখন আমাদের খুশির সীমা থাকতো না। ২৯ রোজায় এটা হলে মজা হতো বেশি।

আরেকভাবে আমরা ঈদের খবর পেতাম - টিভির সংবাদে। বিটিভি বা ইটিভিতে দেখতাম ঈদ বিষয়ে খবর। বিটিভিতে সংবাদপাঠকদের পোশাকে একরকম পরিবর্তন, আরো জাঁকজমকপূর্ণ  হয়ে উঠত। সেটা দেখে বোঝা যেত ঈদ এসে গেছে। টিভিতে রমজানের ওই রোজার শেষে গান বাজত।

আমি মিরপুরের যে জায়গায় বড় হয়েছি সেখানে ছিলো উঠতি মধ্যবিত্তদের বাস। তখনো সেখানে বহুতল ভবন তেমন ছিলো না। বেশিরভাগ একতলা বাড়ি, মহল্লার সবাই সবাইকে চিনতাম। আশেপাশে ভাড়া থাকত এমন পরিবার কিছু ছিলো, তবে ঈদে তারা কখনোই ঢাকায় থাকতেন না।

আমরা চাঁদরাতেই সহপাঠী-বন্ধুবান্ধবদের বাড়ি যেতাম। সেমাই, মিষ্টি, নুডলস খাওয়া হতো। আত্মীয়-বন্ধুরা মিলে হাতে মেহেদি পরা হতো।

সকালে কখনো মসজিদের মাইকের শব্দে আর নয়তো মা-র ডাকে ঘুম ভাঙত। তারপর স্নান করে মিষ্টি কিছু মুখে দিয়ে বাবার হাত ধরে নামাযে যাওয়া। ফিরে এসে নুডলস, সেমাই- এসব খাওয়া। এরপর মহল্লার মুরুব্বিদের সালাম করা। কখনো কখনোসালামিথেকে দুইশ-তিনশ টাকাও হয়ে যেত। আমরা ছোটরা বেশিরভাগ সময় ১০ টাকা করে সালামি পেতাম। প্লাস্টিকের ১০ টাকার ওইনোটগুলোর চল এখন আর নেই।

এরপর শুরু হতো সেই টাকা খরচ করার পালা। তখন ফেরিওয়ালারা অনেক রকম খেলনা নিয়ে আসতেন। সেখান লেজার, ভিডিও গেম, ওয়াকম্যান প্লেয়ার, পকেট রেডিও থাকত। দাম সাধারণত একশ- দেড়শ টাকার ভেতর থাকত।

দুপুরে খুব মজাদার খাবার খাওয়া হতো। কোনো সিনেমার প্রিমিয়ার হলে বিটিভিতে সেটা দেখা হতো। বিকালের পর আত্মীয়-বন্ধুবান্ধবরা আসতেন। আমরাও যেতাম তাদের বাসায়। কোনো কারণে কেউ না গেলে তখন নতুন কেনা খেলনাগুলো তাদের দেখানো হতো না। একে অপরের দিকে লেজার ছোঁড়া, খেলনা পিস্তল দিয়ে গুলির ভঙ্গি, কোনো কোনো পিস্তল থেকে শুধু মিউজিক বের হওয়া - এসব ছিলো আনন্দের উপলক্ষ।

কোনোকোনো ঈদের দিন হতো লোডশেডিং। সব বাচ্চারা তখন আনন্দে চিৎকার করতে করতে বের হয়ে আসতাম। সবাই মিলে খেলনা পিস্তল দিয়ে চোর-পুলিশ খেলতাম।

রাতে থাকতো ঈদের বিশেষ নাটক, পরেরদিন ইত্যাদি। ইত্যাদি নিয়ে সবার খুব আগ্রহ কাজ করতো। নাটক বেশিরভাগ থাকতো হুমায়ূন আহমেদ বা আমজাদ হোসেনের। সবাই মিলে একসাথে বসে নাটক উপভোগ করা হতো।

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic