মাত্র কিছুদিন আগেও কৌশলগত স্ব-শাসন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)এর দেশগুলোর মধ্যে বিতর্ক চলেছে। আন্তনির্ভরতার ধুয়া তুলেছে একদল। আরেকদল আবার গুরুত্বপূর্ণ সব পণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার আহ্বান জানিয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আগ্রাসী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ কথাই স্পষ্টতর হলো যে উভয়ই ভুল প্রতিপক্ষ এবং ভুল বিষয় নিয়ে তর্কে মেতে ছিল। চীনের সেমিকন্ডাক্টর বা ফেস মাস্কের মতো প্রসাধন সামগ্রীর ওপর নির্ভর করার ফলে তীব্র ভূ-কৌশলগত টানাপড়েন দেখা দেয় না। বরং রাশিয়া পশ্চিমী ভোক্তাদের জন্য তেল, গ্যাস এবং কাঁচামালের ঘাটতি সৃষ্টি করলেই সে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
যা ভাবা হয়েছিল প্রকৃতপক্ষে সমস্যাটা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছে। বিষয়টি অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের লাগাম হাতে রাখার মাথাব্যথা নয়, বরং ইউরোপের ভূমিতে স্থল যুদ্ধের মোকাবিলা করা। এমন যুদ্ধকে অসম্ভব করে তোলার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইইউ। প্রতিবেশি দেশগুলোর মধ্যে যদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হয় তা হলে এখন সরাসরি ময়দানে নামতে হবে। বিশ্ব অঙ্গনের জন্যও খাটে একই কথা।
সুসংবাদটা হলো, আগের মতোই তীব্র সংকটে পড়ে ইইউনেতারা সংঘবদ্ধ হয়েছেন এবং সমস্যাকে কেন্দ্র করে মনোযোগও নিবদ্ধ করেছেন। পশ্চিমী অংশিদাররা নজিরবিহীনভাবেই ব্যক্তি পুতিনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার বাণ ছুড়তে ঐকমত্য হন। নির্বাচিত কিছু রুশ ব্যাংককেও সুইফট ব্যবস্থা (অর্থ স্থানান্তর ও লেনদেনর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক) থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও কিছু বিধিনিষেধ দেয়া হয়েছে। এ সবই করা হয়েছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে যা দৃষ্টান্তমূলক। তবে নিষেধাজ্ঞার অস্ত্র অত্যন্ত পরিশীলিত ভাবে প্রয়োগের একটা প্রবণতা ইইউর মধ্যে দেখা গেছে। আটপৌরে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এ প্রবণতাকে বলতে হবে আদর্শবাদী। কিন্তু ক্ষমতার লড়াইয়ের বেলায় একে অতি খারাপ হিসেবে চিহ্নিত করতেই হবে।
পুতিনের অভিযানের আগে ইইউ যে ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছিলো তা ছিলো মহাভুল। তারা ধরে নিয়েছিল ইইউ-র গরম গরম কথা শুনেই ঘাবড়ে যাবেন পুতিন। এ মহাভুলের পরিণামে এখন ইইউকে পুতিনের পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। অর্থাৎ তারা এখন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। সংশয় ছড়িয়ে, সন্দেহ সৃষ্টি করে দ্বন্দ্ব বাড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলা করে নিজ মতলব কীভাবে ঢেকে রাখতে হয় মনেপ্রাণে কেজিবির মানুষ হিসেবে সে শিল্পকলা জানা আছে পুতিনের।
ইইউকে নিজ তৎপরতার মূল্য দিতে হয়েছে। গত বছর থেকেই যখন পুতিন হুমকি বাড়িয়ে চলছিলেন, তখন তাঁকে নিরুৎসাহিত করার জন্য অতিমাত্রায় প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু পুতিন যে স্বরে হুমকি বাড়িয়েছে সেই একই স্বরে, স্বরকে সে মাত্রার চেয়ে না চড়িয়েই, জবাব দিয়েছে ইউরোপ। এটা ঠিক হয়নি। পুতিন তার নিজ খেলায় যা আশা করছে তা চেয়েও অনেক জোরে পাল্টা আঘাত হানা হলেই কেবল বুঝতে পারতেন যে সব কিছু ছক অনুযায়ী চলবে না।
এখন তাঁকে নিরুৎসাহিত করার সময় আর নেই। বরং লড়াইকে ঠেলে দিতে হবে আগ্রাসীর দিকেই। এ কাজটা ইউরোপ মোটেও সামরিক ভাবে করবে না। কিন্তু ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানো অব্যাহত রাখতে হবে। বরং ইউরোপকে আর্থিক আঘাত এবং ভীতি সৃষ্টিকারী তৎপরতাই বেছে নিতে হবে। বৃহত্তর পশ্চিমের সহযোগিতায় ইউরোপের সে সক্ষমতা আছে। এবারে ইউরোপকে আর্থিক আঘাত এবং ভীতি সৃষ্টিকারী তৎপরতায় নামতে হবে। প্রশ্ন হলো, এমন তৎপরতায় নামার পুরোপুরি ইচ্ছা আছে কি ইউরোপের!
রাশিয়াকে সুইফট ব্যবস্থা থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে যে বিতর্ক চলছে তা থেকেই ইউরোপের ইচ্ছা শক্তির বিষয়টা আঁচ করা যায়। সুইফট হলো একটা বার্তা বিনিময় ব্যবস্থা। এটা ছাড়া আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্র কোনো ব্যাংকের কাজ-কর্ম চালানো কষ্টকর হবে। তবে অসম্ভব হবে না। উল্টা দিকে, অন্যান্য ব্যবস্থাও ব্যাংকের লেনদেন আটক দিতে পারে। ফলে সুইফট কম প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কিন্তু কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকার চেয়েও দোষযুক্ত আংশিক নিষেধাজ্ঞা বলবত থাকা ভালো। জীবাশ্ম জ্বালানি বা তেল-গ্যাসের মূল্য পরিশোধ নিয়ে কথা বলা যায়। রাশিয়া থেকে আমদানি করা এ খাতে অর্থ ছাড় দেওয়া নিয়ে ইইউ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
ইইউ এবং পশ্চিমের করার আছে আরো অনেক। যেমন, রুশ রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে জড়িত প্রতিটি ব্যক্তি এবং সংস্থার সমস্ত সম্পদ জব্দ করা যায়। জব্দ করা যেতে পারে রুশ সব বৈদেশিক মজুদসহ এ জাতীয় সম্পদ। এ সব সম্পদের প্রকৃতি কী বা এ সব সম্পদের মালিকানা কার বা কাদের তাও প্রকাশ করা যেতে পারে। রাশিয়ার সাথে জড়িত সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং রুশ সরকার বা প্রতিষ্ঠানগুলোর সব মধ্যস্থতাকারীর সাথে সকল লেনদেনকে অপরাধের পর্যায়ে ফেলা যেতে পারে। এর মানে হলো,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইইউতে অবস্থিত করের স্বর্গরাজ্যগুলোয় পুতিন চক্রের অর্থ স্থানান্তরকে আটকে দিতে হবে। বেছে বেছে রাশিয়ার অর্থনীতির কিছু কিছু জিনিসকে একঘরে করা হবে না কী দেশটির অর্থনীতিকে সর্বাধিক ভাবে একঘরে করা হবে, এবারে তা দেখতে হবে।
সুইফটকে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পরপরই প্রযুক্তিগত ভাবে অনন্য পদক্ষেপও এসে পড়বে। সরল ভাবে বলতে গেলে পশ্চিম পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেবে, তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং রাশিয়ার মধ্যে যে কোনো একটাকে বেছে নিতে হবে সবাইকে। এর আগে এ ভাবে একই কথা ইরানকে বলেছে আমেরিকা। বিশ্বকে আমেরিকা বা ইরান যে কোনো একটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বেছে নিতে বলেছে ওয়াশিংটন।
পশ্চিম এ ধরণের তৎপরতা চালালে তাতে রুশ অর্থনীতির ধস নামানোর কাজটি হবে। দেশ থেকে পুঁজি পাচার বাড়বে এবং ব্যাংকগুলো বৈদেশিক মুদ্রার দেউলিয়াত্বের মধ্যে পড়বে। পুতিন অবশ্যই যুদ্ধের ধকল সামলানোর মতো অর্থনৈতিক মজুদ গড়ে তুলেছেন। তবে এ মজুদের অর্ধেকের বেশিই হয়ত আটকে দেওয়া যাবে। মস্কো অবশ্য তেল-গ্যাস রপ্তানি বন্ধ করে দেবে। তাই এবারে প্রশ্ন হলো - রাশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে কে কার ওপর বেশি নির্ভর করছে?
এ প্রশ্নের জবাব মিলবে জ্বালানির মূল্যে নিয়ে রাজনীতির ওপর। এটি নিজ পক্ষেই যাবে বলেই হিসাব কষে রেখেছেন পুতিন। তবে ইইউ নেতারা নিজ দেশের মানুষকে এই বর্ধিত মূল্য মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করে তুলতে পারেন। একে মুক্ত ইউরোপ বজায় রাখার অপরিহার্য আত্মত্যাগ হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে। পাশাপাশি আর্থিক ভাবে দুর্বল ব্যক্তি বা রাষ্ট্রকে সহায়তার ব্যবস্থাও রাখতে হবে। পুতিনের স্বৈরশাসনকে পছন্দ না করার মধ্য দিয়ে এ সব তৎপরতা চালানোর মতো শক্তির যোগান পাওয়া যাবে।
ইইউ এ পর্যন্ত যে সব তৎপরতা চালিয়েছে তার মধ্যে এটি হবে সবচেয়ে বড়মাপের। এ তৎপরতার কার্যত অর্থ হবে শাসন পরিবর্তন। কিন্তু ইউক্রেনবাসীরা আজ ইউরোপের ২০ শতকের দুঃসহ দুঃস্বপ্নের পুনরাবৃত্তির মুখে পড়েছে। তাহলে এমন আঘাত এখন না হানলে কবে এবং কখন চালানো হবে? পুতিন সম্পর্কে আমরা যা জানি তা হলো আক্রমণ আরো বর্বরতরই হবে। অথচ সভ্যভাবেও যে বিপুল ক্ষমতা প্রয়োগ করা যেতে পারে তা দেখানোর সক্ষমতা আছে ইইউর ।
[লেখক ফিনান্সিয়াল টাইমসের ইউরোপীয় অর্থনীতির ভাষ্যকার। মূল ইংরেজি থেকে বাংলায় রূপান্তর: এফই ডেস্ক। ]