পাওনা টাকার জন্য চাপ দেওয়ার কারণেই ঢাকার শ্যামলীতে গম গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আনোয়ার শহীদকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব।খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর।
হত্যার ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এক তথ্য পাওয়ার কথা বলেছেন র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
সোমবার ঢাকার কারওয়ানবাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, রোববার রাতে গাবতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে ‘হত্যার পরিকল্পনাকারী' জাকির হোসেন এবং ‘হত্যায় সরাসরি অংশ নেওয়া’ মো. সাইফুলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তারা দুজনই আনোয়ার শহীদের সাবেক কর্মক্ষেত্র দিনাজপুরের বাসিন্দা। তাদের মধ্যে জাকিরের কাছে ১২ লাখ টাকা পেতেন শহীদ। জাকিরের চালের গুদামে শ্রমিকের কাজ করতেন সাইফুল।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে আদাবর থানা এলাকায় শ্যামলীর হলি লেইনে আনোয়ার শহীদকে ছুরি মেরে পালিয়ে যায় এক ব্যক্তি। শহীদকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত ১১টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব কর্মকর্তা মঈন বলেন, “জাকির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, আনোয়ার শহীদ দিনাজপুর শহরে কর্মরত থাকা অবস্থায় তার সঙ্গে পরিচয় হয়, যা পরে ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়।
“শহীদ দিনাজপুরে জমি কেনার সময় জাকির মধ্যস্থতা করে। এছাড়া শহীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে জাকির ১২ লাখ টাকা ধার নেয়।”
শহীদ অবসরে যাওয়ার পর ঢাকায় বসবাস শুরু করলেও জাকিরের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
কমান্ডার মঈন বলেন, “এক বছর আগে জাকির তার চালের গুদাম বন্ধক রেখে ২০ লাখ টাকা ঋণ পাইয়ে দিতে শহীদের সহযোগিতা চায়। কিন্তু শহীদ তাকে সহযোগিতা করতে অপারগতা জানান।"
“এছাড়া শহীদ তার পাওনা ১২ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য জাকিরকে চাপ দেন। জাকির টাকা ফেরত না দেওয়ার জন্য আনোয়ার শহীদকে হত্যার পরিকল্পনা নেয়।”
হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ভিডিওতে দেখা যায়, মুখে মাস্ক ও মাথায় ক্যাপ পরা এক লোক পকেটে হাত ঢুকিয়ে তিন-চার মিনিট ধরে হলি লেইনে ঘোরাঘুরি করছিল। শহীদ গলিতে ঢোকার পর লোকটি ছুরি দিয়ে তার পেটে আঘাত করে পালিয়ে যায়।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জাকির এবং সাইফুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা ‘স্বীকার’ করেছেন। সাইফুল এই হত্যাকাণ্ডে ‘সরাসরি’ অংশ নেন। এক সময় তিনি জাকিরের চালের গুদামে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।
মঈন বলেন, “সে একজন নিয়মিত মাদকসেবী এবং মাদক কেনার জন্য তার প্রায়ই টাকার প্রয়োজন হত। বিভিন্ন সময়ে সাইফুলকে অর্থ সহায়তা করত জাকির।”
জাকিরের কাছে শহীদের পাওনা টাকার বিষয়ে ‘আর কেউ জানত না’ জানিয়ে এই র্যাব কর্মকর্তা বলেন, “তিন থেকে চার মাস আগেও একবার আনোয়ার শহীদকে তারা হত্যার চেষ্টা করে।"
“জাকির সাইফুলকে ঢাকায় আসতে বললে সাইফুল ঢাকায় আসে। জাকির তখন সাইফুলকে বলে যে, একজন লোক আর্থিকভাবে তাকে অনেক বড় ধরনের ক্ষতি করেছে এবং তাকে হত্যা করতে হবে। সাইফুল যদি ওই ব্যক্তিকে হত্যা করে তাহলে সে জায়গাসহ বাড়ি, অর্থ পাবে। আগের নেওয়া টাকাও শোধ করতে হবে না।"
“জাকির সে সময় সাইফুলকে একটি ছুরিও কিনে দেয় আনোয়ার শহীদকে হত্যার জন্য। কিন্তু পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং পুলিশের উপস্থিতির কারণে তারা সে সময় ব্যর্থ হয়েছিল।”
যেভাবে হত্যার পরিকল্পনা
র্যাব বলছে, আনোয়ার শহীদকে হত্যার জন্য ১১ নভেম্বর সকালে দিনাজপুর থেকে ঢাকায় এসে কল্যাণপুরে একটি আবাসিক হোটেলে অবস্থান নেন সাইফুল ও জাকির। সেখানেই তারা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। পরে হোটেলের পাশের গলির দোকান থেকে ১৮০ টাকা দিয়ে একটি ছুরি কেনেন জাকির।
কমান্ডার মঈন বলেন, ওইদিন সন্ধ্যায় শহীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় কেনাকাটার কথা বলে তাকে নিয়ে স্থানীয় একটি মার্কেটে যান জাকির।
“কেনাকাটা শেষ করে শহীদকে শ্যামলীর হলি লেইনে নিয়ে যান জাকির। তার ইশারায় গলিতে ওঁৎ পেতে থাকা সাইফুল এগিয়ে যায় এবং শহীদের দিকে ছুরিকাঘাত করে দ্রুত পালিয়ে যায়।
“এসময় জাকির শহীদের পাশেই অবস্থান করছিলেন এবং সিসিটিভি ভিডিওতে শহীদের হাত ধরে মাটিতে শুইয়ে দিতে দেখা যায় তাকে। শহীদ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে পথচারীরা চারপাশ ঘিরে ধরে এবং এই সুযোগে জাকির ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়।”
হত্যাকাণ্ডের পর জাকির ও সাইফুল হোটেলে ফিরে পোশাক পাল্টে দিনাজপুর চলে যাওয়ার জন্য বের হন। এ সময় দিনাজপুর থেকে এক ব্যক্তি জাকিরকে ফোন করে জানায়, শহীদ আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি।
রাত ৮টার বাসে তাদের দিনাজপুরে রওনা দেওয়ার কথা থাকলেও জাকির তার বাসের সময় পিছিয়ে রাত সাড়ে ৯টায় নেন এবং সাইফুলকে ৬০০ টাকা দিয়ে দিনাজপুরে চলে যেতে বলেন।
মঈন বলেন, “জাকির নিজেকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখতে শহীদকে দেখার জন্য সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালেও যান। পরে সেখান থেকে দিনাজপুরে চলে যান।”
গণমাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের খবর প্রচার হলে জাকির ও সাইফুল দিনাজপুর ত্যাগ করে বিভিন্ন স্থান পরিবর্তন করে পালিয়ে থাকেন। পরে তাদেরকে ঢাকার গাবতলী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে র্যাবের ভাষ্য।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন আনোয়ার শহীদের ছোট বোন ফেরদৌস সুলতানা আদাবর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেই মামলাতেই দুজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হবে।
১৯৭৬ সালে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে গম গবেষণা কেন্দ্রে যোগ দেন শহীদ। ২০০৮ সালে পরিচালক পদমর্যাদায় প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে জয়দেবপুর থেকে অবসরে যান তিনি।
র্যাবের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শহীদ কর্মস্থলে এবং সামাজিকভাবে ‘অত্যন্ত বন্ধুবৎসল এবং পরোপকারী’ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৮৩ সালে বিয়ে করলেও মাসখানেক পর স্ত্রীর সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।
অবসর নেওয়ার আগে এবং পরে শহীদ গ্রামের বাড়ী নীলফামারী জেলার ডোমারে বিভিন্ন সময় দরিদ্র এবং অসহায় আত্মীয় স্বজনকে সাহায্য সহযোগিতা করতেন।
অবসর নেওয়ার পর থেকে তিনি ছোট বোন ফেরদৌস সুলতানার সঙ্গে তার কল্যাণপুরের বাসায় থাকতে শুরু করেন। পেনশনের টাকা দিয়ে তিনি দিনাজপুরে জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করে সেটা ভাড়া দিয়েছিলেন।
