“উধোর বোঝা বুধোর ঘাড়ে”- প্রবাদটিতে উল্লিখিত ‘উধো’ যদি হয় মানুষ, তথা সমগ্র মানবজাতি, তবে ‘বুধো’ নামটা যে আমাদের গবাদি পশু কিংবা জীবজন্তুদের জন্যই বরাদ্দ হয়ে থাকবে, এ কথা বলাই বাহুল্য। যদিও তথাকথিত ‘সিভিলাইজেশন’ যত অগ্রসর হচ্ছে, আমরা ততই ‘উধো-বুধো’ দুটো জায়গাতেই মানুষকেই দেখতে পাচ্ছি; কিন্তু সত্যি বলতে, সেই অনাদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত মনুষ্যজাতি এবং তার বোঝার ওজন কিন্তু তার পোষা জীবজন্তুরাই বহন করে আসছে।
মানবসভ্যতার প্রথমদিকে হয়তো সরাসরি জন্তুদের পিঠেই বোঝা চাপানো হতো, কিংবা সওয়ার হতে হতো। তবে চাকা আবিষ্কারের পর দৃশ্যপট অনেকটাই পালটে গেল, অতিরিক্ত ভার বহন করার জন্য তৈরি করা হলো নানারকম জীবজন্তুতে টানা কিংবা পশুচালিত গাড়ি। সেই হাজার হাজার বছর আগের সিন্ধু সভ্যতায় ব্যবহৃত এক্কাগাড়ি থেকে শুরু করে আমাদের গ্রামগঞ্জে আজও টিকে থাকা গরুর গাড়ি; সবই পশুচালিত যানের উদাহরণ। তেমনি কিছু বিখ্যাত পশুচালিত গাড়ির ধরন, গঠন ও ঐতিহাসিক পটভূমি নিয়েই আজ কথা বলা হবে।
প্রথমে ঘোড়ায় টানা এক্কা দিয়েই শুরু করা যাক। এক্কা যদিও এখনও বিলুপ্ত কোনো বাহন নয়, উত্তর ভারতে অহরহই এর দেখা মেলে। আগেই বলা হয়েছে, এই এক্কা নামক যানটি বেশ প্রাচীন। তাম্রযুগে দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পশ্চিম ভাগে সিন্ধু নদীর তীরে গড়া ওঠা প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতায় এ গাড়ি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়, এবং সেটা আজ থেকে অন্তত সাড়ে তিন-চার হাজার বছর আগেকার কথা। এক্কা গাড়ির নামটি এসেছে হিন্দি ‘এক’ থেকে, কারণ একটিমাত্র ঘোড়াই গাড়িটি টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। দু'টি কাঠের চাকার ওপর গড়িয়ে চলা এই গাড়িটির মেঝে কাঠের। আর রোদ থেকে বাঁচার জন্য এর মাথায় একটি ছাউনিও দেওয়া রয়েছে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, এক্কাতে বসার জন্য আলাদা করে কোনো আসনের ব্যবস্থা নেই, যাত্রীদেরকে কাঠের মেঝেতেই বসতে হয়, অনেকটা ‘দ’ এর মতো করে! এক্কাতে চড়তে হলে যেতে হবে ভারত বা পাকিস্তানের যেকোনো প্রাচীন শহরে, যেমন ধরুন লখনৌ কিংবা বিহার।
তাছাড়া অনেকটা এক্কার মতো দেখতে আরও একরকম গাড়ি আছে, যার নাম টাঙ্গা। এটিও এক্কার মতোই উপমহাদেশের যেকোনো পুরনো শহরে পাওয়া যায়। এই গাড়িটি এক্কার মতোই দু চাকার এবং এক ঘোড়ায় টানা। তবে সৌভাগ্যবশত এতে চালক এবং যাত্রী উভয়ের বসার জন্যই আসন আছে, ম্যায় দু’চাকার মাঝখানে আছে মালপত্র রাখার জায়গাও।
এবার একটু পাশ্চাত্যের দিকে যাওয়া যাক। কোচ বা কোচগাড়ির নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন? এটি হচ্ছে ক্যারিজ নামক ঘোড়ায় টানা গাড়ির একটি বিশেষ রূপভেদ। কোচ সাধারণত চার চাকার হয়ে থাকে, দুই বা ততোধিক ঘোড়া একে টেনে নিয়ে যায়।
কোচের চালক, অর্থাৎ কোচম্যানের (কিংবা বাংলায় কোচোয়ান) আসনটি থাকে গাড়ির সামনের দিকে। সাধারণত চালক সেখানে বসে একজন ফুটম্যান এবং একজন পোস্টিলিওনের সাহায্যে গাড়িটিকে চালিয়ে নিয়ে যায়। (এখানে বলে রাখা ভালো, ফুটম্যানের কাজটি হচ্ছে এটা নিশ্চিত করা যেন ঘোড়াগুলো অনিয়ন্ত্রিত আচরণ না করে, এবং পোস্টিলিওনের কাজ হচ্ছে কোনো একটি ঘোড়া পিঠের ওপর বসে সঠিক নির্দেশ দেওয়া)।
কোচ নামটি এসেছে হাঙ্গেরির ‘কক্স' (Kocs) নামের শহরটি থেকে, যেখানে পনেরো শতকে প্রথমবারের মতো এই যানটি তৈরি হয়। পরে অবশ্য এটি গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে, এবং ১৬৮০ সালে রানী প্রথম এলিজাবেথের সময় প্রথম ইংল্যান্ডে দুই ঘোড়ায় টানা কোচগাড়ির প্রচলন শুরু হয়।
আমেরিকান বিপ্লবের ঠিক পরপরই আমেরিকায় ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধার জন্য এক বিশেষ গাড়ির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়, যার নাম ছিলো কনেস্টোগা ওয়াগন (Conestoga Wagon)। এই নামটি এসেছে পেনসিলভেনিয়ার ল্যাঙ্কেস্টার কাউন্টির কনেস্টোগা নদীর নাম থেকে।
ধারণা করা হয়, এ গাড়ি প্রথম ব্যবহার করতে শুরু করেছিল সেখানকার জার্মান অধিবাসীরা। এই ওয়াগনের জনপ্রিয়তা ছিল মালবাহী যান হিসেবে। একেকটি ওয়াগন সাড়ে পাঁচ টন পর্যন্ত মালপত্র বয়ে নিতে পারতো। গাড়িটি চালাতে সাধারণত ঘোড়া, খচ্চর কিংবা ষাঁড় ব্যবহার করা হতো। সে সময় পিটসবার্গ এবং ওহাইওতে ব্যবসার মালপত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়িটি ব্যবহৃত হতো। প্রত্যেক একশো পাউন্ড মালপত্র একশো মাইল নিয়ে যাওয়ার জন্য ভাড়া গুণতে হতো এক ডলার করে। সুবিশাল এই মালবাহী গাড়ি একদিনে পাড়ি দিতে পারতো পনেরো মাইল পর্যন্তও।
আরেক রকম গাড়ি আছে, যার নাম ডগকার্ট। নামের মধ্যেই যেহেতু ডগ বা কুকুর আছে, এ গাড়ি কুকুরে টানা হবে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে এক বিশেষ ধরনের ডগকার্ট আছে, যা একটি ঘোড়ায় টানা এবং মানববাহী যান। এই ঘোড়ায় টানা ডগকার্টে চালকের আসনের পেছনে থাকে একটি ফাঁকা বাক্সমতো জায়গা, যেটি একটি বা একাধিক কুকুরের জন্য বরাদ্দ। খুব সম্ভবত এজন্যই গাড়িটির নাম ডগকার্ট হয়েছে। তবে চাইলে সেই কুকুরের বাক্সটি উল্টে আরেকটি আসন তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে দ্বিতীয় একজন যাত্রী অনায়াসে বসতে পারেন। ডগকার্ট মূলত দুই কিংবা চার চাকার হয়, একটি বা দু'টি ঘোড়া একে টেনে নিয়ে চলে। ভারতবর্ষে ঘোড়ায় টানা একধরনের গাড়ি আছে ‘টমটম’ নামে, ধারণা করা হয়, এই ডগকার্ট তারই পূর্বপুরুষ।
অন্যদিকে, কুকুরে টানা যে গাড়িটি ডগকার্ট নামে পরিচিত, ঐতিহাসিকভাবে সেটির ব্যবহার ছিল বেলজিয়াম এবং নেদারল্যান্ডসে। এ গাড়িতে করে দুধ, পাউরুটি প্রভৃতি জিনিসপত্র সরবরাহ করা হতো। ভিক্টোরিয়ান আমলে ব্রিটেনে ডগকার্টের ব্যাপক ব্যবহার ছিলো। যদিও গাড়ির রাস্তায় না চলে পথচারীদের রাস্তায় চলার জন্য প্রায়ই পথচারীদের সাথে ডগকার্টের মালিকের টক্কর লাগতো। ১৮৪০ সালের দিকে অবশ্য আইন করে এই ডগকার্ট গাড়িটি ব্রিটেনে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। যদিও ফ্রান্স এবং বেলজিয়ামে এখনও কিছু কিছু ডগকার্ট দেখা যায়।
১৯০০ সালের দিকে ডগকার্টেরই একটি বিকল্প বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যার নাম ছিলো গভর্নেস কার্ট। এটি ছিল একটি ছোট দু’চাকার ঘোড়ায় টানা গাড়ি, যাতে দু'পাশের দু’সারি আসনে কষ্টেসৃষ্টে চারজন মানুষ বসতে পারতো। এই চারজন মানুষের মধ্যে একজন হতেন চালক। তিনি বসতেন যেকোনো একটি আসনের ঘোড়ার দিকের কিনারায়। ছাদবিহীন এ গাড়িতে ওঠার জন্য এর পেছনের দেয়ালটি হয় নিচু করে তৈরি করা হতো, নয়তো একটি ছোট কাঠের দরজা লাগিয়ে দেয়া হতো। ডগকার্টের বাহন হিসেবে থাকতো একটি অতিশয় ভদ্র ঘোড়া। তৎকালীন সামাজিক নিয়ম অনুসারে এই গভর্নেস কার্টের চালিকা ছিলেন প্রধানত নারীরাই।
ঘোড়া কি কখনও নৌকা টানতে পারে? পারে বৈকি! ইউরোপে একসময় রোমানরা খচ্চর দিয়ে নৌকার গুণ টানাতো। সেই থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত আমেরিকার খালেবিলে ঘোড়া দিয়ে নৌকার গুণ টানানো হয়েছে। আমেরিকার শিল্প বিপ্লবে এই ঘোড়ায় টানা নৌকা প্রচণ্ড প্রভাব ফেলেছিল। জলপথে একটি ঘোড়া স্থলপথের চেয়ে প্রায় পঞ্চাশগুণ বেশি ওজন টানতে পারতো।
বিভিন্ন মিথোলজির সুবাদে রথের কথা তো আমরা সবাই জানি। সে মহাভারতই হোক কিংবা ট্রয়ের যুদ্ধ। রথ সাধারণত যুদ্ধ-বিগ্রহে ব্যবহৃত গাড়ি, যার বাহন হিসেবে ঘোড়াকেই অগ্রাধিকার দেয়া হতো। রথের আকৃতি হতো খুবই ছোট এবং হালকা, ফলে এর গতি হতো অসামান্য, যা যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য ছিল অতীব প্রয়োজনীয় এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ। কালে কালে ঘোড়াদের বিবর্তনের সাথে সাথে এই যুদ্ধযানটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।
সবশেষে বলি দেশি দু’চাকার গরুর গাড়ির কথা, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় বুলক কার্ট (Bullock Cart) কিংবা অক্স কার্ট (Ox Cart)। এটিই সম্ভবত সবচেয়ে প্রাচীন পশুচালিত যান। খ্রিস্টপূর্ব ৪৪০০ সালের দিকে প্রথম গরুর গাড়ি সদৃশ যান তৈরির আভাস পাওয়া যায়। শুধু আমাদের উপমহদেশেই নয়, অস্ট্রেলিয়া, কোস্টা রিকা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশেও সেই প্রাচীনকাল থেকে গরুর গাড়ি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এখনও তো আমাদের গ্রামাঞ্চলে, যেখানে মোটরগাড়ি ঢুকতে পারে না, সেখানে মালপত্র কিংবা মানুষকে বহন করার জন্য গরুর গাড়িই একমাত্র যান।
এছাড়াও পশুচালিত গাড়ির মধ্যে আরও রয়েছে কুকুরে টানা স্লেজ, ওয়াগন, শ্যারাবাঙ্ক ইত্যাদি যানবাহন। যাদের অধিকাংশেরই উৎপত্তি অপেক্ষাকৃত প্রাচীন পৃথিবীতে। আজ আধুনিক পৃথিবীতে এই জন্তুদের জায়গা নিয়ে নিয়েছে বিশাল বিশাল ইঞ্জিন।
আজ পাশের দেশের শহর কলকাতায় গেলে দেখতে পাবেন ইঞ্জিনে চলা ট্রাম। অথচ ১৯০০ সালের আগ পর্যন্ত সেখানে ঘোড়ায় টানা ট্রাম ছিল অন্যতম গণপরিবহন। উন্নত প্রযুক্তির যানবাহন আবিষ্কারের সাথে সাথে এসব উপকারী পশুদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে- এমনটা বলা হলে তাদের প্রতি অকৃতজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই প্রকাশ করা হয় না।
আমাদের যানবাহনের একসময়ের চালিকাশক্তি, মানবজাতির শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু, যারা একসময় ঘন জঙ্গলের বাস উঠিয়ে পোষ মেনে মানুষের সাথে চলে এসেছিল নগরে, তারা মানবজাতির শেষ অধ্যায় পর্যন্ত আমাদের সাথেই থাকুক, বন্ধু হয়েই থাকুক, এটাই কাম্য।
শুভদীপ বিশ্বাস তূর্য, ৩য় বর্ষ, ইংরেজি বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
shuvodipbiswasturja1999@gmail.com
