পরিবহন ধর্মঘট: দিনভর দুর্ভোগে যোগ হলো লঞ্চও


এফই অনলাইন ডেস্ক | Published: November 07, 2021 08:56:58 | Updated: November 07, 2021 17:09:55


পরিবহন ধর্মঘট: দিনভর দুর্ভোগে যোগ হলো লঞ্চও

বাস বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ হবে জেনেও জরুরি কাজে রাস্তায় নামতে হয়েছিল অনেককে; তবে ভ্রমণের সবকিছু ঠিকঠাক জেনেও যারা বিকালে সদরঘাটে এসেছিলেন তারা পড়েছেন একেবারে বিপদে। কেননা তাদের যাত্রা ভেস্তে গেছে হুট করে লঞ্চ বন্ধ রাখায়। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

শনিবার বিকালের পর এতে করে ট্রেন ছাড়া দূরপাল্লার সব গণপরিবহন বন্ধ হলে সাধারণের দুভোর্গ আর দুশ্চিন্তার মাত্রা আরও বাড়ে। এর মধ্যে লঞ্চ বন্ধ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।

দুদিনের দুর্ভোগ শেষে পরবর্তী যাত্রার পরিকল্পনায় সবাই তাকিয়ে রোববার সকালের বৈঠকের দিকে। ভাড়া কত নির্ধারণ হবে তা নিয়ে যেমন ভাবনা আছে, তেমনি এক বৈঠকেই সমস্যার সমাধান আসবে কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

পরিবহন মালিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে যদিও বলা হয়েছে ভাড়া বাড়লেও তা হবে সহনীয়।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে শুক্রবার থেকে চলমান পরিবহন ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিন শনিবারও দিনভর যাত্রাপথে দুর্ভোগেই কেটেছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের মানুষের।

বাস ও ট্রাক চলাচল বন্ধের পর সড়কের দুর্ভোগ মেনে ঢাকার সদরঘাটে এসে লঞ্চে উঠছিলেন দক্ষিণাঞ্চলগামী যাত্রীরা।

শনিবার সকালের পর সদরঘাট থেকে ৩০টি লঞ্চ ছেড়ে গিয়েছিল বিভিন্ন গন্তব্যে। কিন্তু বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে পন্টুন থেকে লঞ্চগুলো সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়।

এতে অনেকটা পথ পেরিয়ে যারা ঘাটে এসেছিলেন তারা বিপদে পড়ে যান। তাদেরই একজন আব্দুল বারেক।

ষাট বছরের বৃদ্ধ শেখ আব্দুল বারেক, চারদিন আগে আশি বছরের বৃদ্ধ বাবা শেখ হাবিবুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার চক্ষু হাসপাতালে আসেন চোখের চিকিৎসার জন্য।

শনিবার বিকালে ৮০০ টাকা ভাড়া দিয়ে সদরঘাটে আসেন পিরোজপুরের হুলার হাটে যাওয়ার জন্য। এসেই এই বৃদ্ধ বাবা- পুত্র পড়লেন বিপাকে। লঞ্চ চলাচল বন্ধ, কোথায় যাওয়ার উপায়ও নেই।

বারেক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আমরা খুব গরীব। আবদুল্লাহপুরে যে আত্মীয়ের বাসায় ছিলাম সে রাস্তায় চা বিক্রি করে। আমাদেরকে দুই হাজার টাকা দিয়েছিল অনেক কষ্ট করে। এ শহরে আমাদের আর কেউ নেই। এখন আবদুল্লাহপুর ফিরে যাওয়া সম্ভব না।

তার মত শতশত যাত্রী সদরঘাটে এসে একই সমস্যায় পড়েন।

যদিও লঞ্চ মালিক সমিতি এখনও কোনো বক্তব্য দেয়নি, তবে একজন লঞ্চ মালিক জানিয়েছেন, ভাড়া না বাড়ালে তারা ‍নৌযান চালাবেন না।

সুন্দরবন গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক আবুল কালাম ঝন্টু বলছেন, সরকার ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে দেওয়ায় তাদের পক্ষে লঞ্চ চালিয়ে যাওয়া সম্ভবপর নয়।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ঢাকা থেকে বরিশাল সুন্দরবন-১০ লঞ্চটি যেতে আসতে ৮ হাজার লিটার ডিজেল লাগে। ১৫ টাকা বেশি হওয়ায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বেশি লাগছে। আমার কোম্পানির চারটি লঞ্চ চলে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন লোকসানের মাত্রা।

লঞ্চ মালিক সমিতিও ইতোমধ্যে ভাড়া শতভাগ বা দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কাছে।

বাংলাদেশ বাস- ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ সম্পাদক রাকেশ ঘোষ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, গাড়ি বন্ধ আছে। কোনো মালিকই ছাড়বে না। কালকে সকাল ১১টায় বিআরটিএ মিটিং ডেকেছে। মন্ত্রণালয়ে মিটিং হচ্ছে। কালকে হয়তবা আলোচনা করবে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভাড়া বিআরটিএ নির্ধারণ করে দেয়। আমরা খালি, ইয়েস নো বলি। বা আরেকটু বাড়ানোর জন্য বলি। তালিকা কাল (রোববার) পাব। ১২-১টার মধ্যে আশা করি মিটিং শেষ হয়ে যাবে। তখন হয়তো সবাই মিলে একটা বিবৃতি দেবে।

ভাড়া পুন:নির্ধারণে নিজেদের দাবির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সহনশীল হোক আমরাও চাই, যাত্রীরা যাতে দিতে পারে। আর তেলের দাম কমানো।

গত বৃহস্পতিবার সরকার ডিজেলের দাম ২৩ শতাংশ বাড়িয়ে দিলে শুক্রবার থেকে ধর্মঘট শুরু করে বাস ও ট্রাক মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো। এতে জনদুর্ভোগ চরমে উঠেছে।

বাসের ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে রোববার বিআরটিএ বৈঠক ডেকেছে। সেই বৈঠকের আগ পর্যন্ত ধর্মঘট না তোলার কথা জানিয়েছেন বাস মালিকরা।

ট্রাক মালিক ও শ্রমিক নেতারা শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বলেছেন, দাবি না মানলে তারাও ধর্মঘট তুলবে না।

দিনভর ভোগান্তি, টার্মিনালে অপেক্ষা

পরিবহন ধর্মঘট ও সরকারি অফিস-আদালত বন্ধ থাকায় শনিবার স্বাভাবিক দিনের চেয়ে মানুষের চলাচল অনেকটাই কম ছিল। সড়কে বাস না থাকায় যানজট নেই বললেই চলে। তবুও সুযোগ পেয়ে মাত্রাছাড়া ভাড়া হাঁকছেন সিএনজি অটোরিকশার চালকরা।

মালিবাগ চৌধুরীপাড়া থেকে মহাখালী যেতে অটোরিকশা চালক নূর ইসলাম চাইলেন ৩৮০ টাকা। সাড়ে তিনশর নিচে যাবেন না।

তার ভাষ্য, সবদিন কি আর বেশি চাই? আইজকা একটু বেশি লাগবোই।

কেন বেশি লাগবোই তার সদুত্তর দিতে না পারলেও উদাহরণ দিলেন, এই মাত্র চাইরশ টাকা দিয়া বনানী গেছে।

শনিবার দিনভর নগরীর বাসিন্দাদের এমন দুর্ভোগ ছাপিয়ে গেছে ঢাকার বাসস্ট্যান্ডগুলোতে ম্লানমুখে বসে থাকা যাত্রীদের দুশ্চিন্তার কাছে। হাতে পর্যাপ্ত টাকা নেই, বাসও চলছে না- কোথায় থাকবেন, কী খাবেন এমন চিন্তায় হতাশ অনেকের দেখাই মিলেছে।

যশোরের বেনাপোলের রহিমা বেগমকে দেখা গেল গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের এদিক ওদিক ছুটাছুটি করতে। একটা পর্যায়ে গাড়ির খোঁজ না পেয়ে টার্মিনালের সামনের একটি গাছের ছায়ায় রাস্তার ফুটপাতে বসে পড়লেন।

কাছে গিয়ে জানতে চাইলে মাঝবয়সী এই নারী বলেন, মিরপুরের ডেল্টা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন তারা।

হাসপাতাল থেকে ছাড় পাওয়ার পর গাবতলীতে আসলাম বেনাপোলের বাস ধরার জন্য। বাস বন্ধ শুনেছি। তারপরও একটু আশা ছিল একটা দুইডা গাড়ি হলেও চলতে পারে। কিন্তু এভাবে একটা বাসও চলবে না তা কল্পনাও করিনি, হতাশাই ঝরে পড়ল তার কণ্ঠে।

তিনি বলেন, সাত বছরের বাচ্চাসহ আমরা চারজন। হাসপাতালের বিল দিয়ে বাকি যে টাকা আছে তা দিয়ে কোনও রকম বাস ভাড়া হয়। কিন্তু এখন কী করব কিছুই ভাবতে পারছি না।

প্রায় একই অবস্থা গাবতলী বাস টার্মিনালের হানিফ পরিবহনের কাউন্টারের পাশে নির্লিপ্ত বসে থাকা রংপুরের মুজিবুল হাসানের।

এই তরুণ গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় আসেন সরকারি ব্যাংকের পরীক্ষায় অংশ নিতে। শুক্রবার পরীক্ষার পর বাড়ি ফিরে যেতে চাইলেও পরিবহন ধর্মঘটের কারণে পারেননি।

হতাশ কণ্ঠে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, বৃহস্পতি ও শুক্রবার দুই দিন বন্ধুর সঙ্গে মেসে ছিলাম। কিন্তু আরও একরাত থাকব এ পরিবেশ সেখানে নেই। তাই বন্ধুর পরামর্শে যে কোনোভাবে বাড়ি চলে যাওয়ার জন্য এসেছি।

সকাল থেকে সম্ভাব্য সব পরিবহনের কাউন্টারে গিয়ে চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোনও গাড়ি না ছাড়ায় শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে বসে আছি।

হাতে যে টাকাপয়সা আছে তা হোটেলে থাকার মতো নয় ম্লান কণ্ঠে যোগ করে তিনি বলেন, আছে শুধু বাড়ি ফেরার মতো বাস ভাড়া। এ টাকাও শেষ হয়ে গেলে আরও বিপদে পড়ে যাব। দেখি কোনও সুযোগ আসে কি না।

রাজধানীতে আর কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় এখানেই রাত কাটার আশংকা প্রকাশ করেন তিনি।

Share if you like