করোনাভাইরাস মহামারী নিয়ন্ত্রণে বিধিনিষেধের মধ্যে অলস বসিয়ে রাখায় জামান পরিবহনের দুটি বাসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) নষ্ট হয়ে যায়, যার মেরামতের জন্য ৬০ হাজার টাকার বেশি খরচ করতে হয়।
সোমবার দুপুরে রাজধানীর গাবতলী টার্মিনালে দেখা গেল ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী পর্যন্ত চলাচল করা বাসগুলোর মেরামতকাজ চলছে; মঙ্গলবার রাত থেকেই বাসগুলো যাত্রী পরিবহন শুরু করবে।
প্রায় সুনসান অবস্থার মধ্যে বাস মেরামত আর রক্ষণাবেক্ষণের কাজ; পাশাপাশি চলছে রঙের কাজও। বেশ ব্যস্ত হয়ে মেরামতকাজ দেখভাল করছেন জামান পরিবহনের ব্যবস্থাপক আব্দুর রাজ্জাক।
প্রতিটি গাড়ির সঙ্গেই এক বা দুইজন কর্মী রয়েছেন, যারা গাড়িতেই রাত কাটান। টার্মিনালেই এখন তাদের খাওয়া, গোসল সবকিছু। এদের কয়েকটি দলকে দেখা গেল দলবেঁধে তাস বা লুডো খেলতে। টার্মিনালের ভেতরে ফাঁকা জায়গায় ক্রিকেটও খেলছিলেন পরিবহনকর্মী ও স্থানীয় তরুণদের একটি দল।
আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গাড়ি বইয়া থাকলেই খালি নষ্ট হয়। চললে আর এতো নষ্ট হইত না।
ক্ষতির হিসাবের ফিরিস্তি তুলে ধরে জামান পরিবহনের ব্যবস্থাপক বলেন, এর মধ্যে এসির কম্প্রেসর, কনডেন্সার সব লাগাতে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
এর উপ্রে ইস্টাপগো (কর্মীদের) খোরাকি, মোবিল চেঞ্জ, ব্রেক ঠিক করা, গ্রিজ দেওয়া এইসব কাম তো রইছেই। সব মিলায়া দুইডা এসি গাড়িতে শুধু গাড়ির ক্ষতি লাখ টাকা ছাড়াইব।
রাজ্জাক বলেন, এর বাইরে প্রত্যেকটা গাড়ির কাম করাইতে হইছে। বইয়া থাকতে থাকতে গাড়ির ব্রেকের বাকেট, ক্লাচের বাকেট (হাইড্রলিক ব্রেক ও ক্লাচের সিলিন্ডার বাকেট) ফুইলা নষ্ট হইয়া যায়।
কুনো গাড়ির ব্যাটারি বইছে। একটা ব্যাটারির দাম আছে ৩০ হাজার। এইবার সব (এসি) গাড়ি প্রতিদিন স্টার্ট করাইছি। এর জন্য দুইডা কইরা স্টাফরে ডেইলি ৬০০ টাকা কইরা খোরাকি দিতে হইছে, তেল গেছে। এহন হিসাব করেন ডেইলি শুধু গাড়ি চালু রাখতে খরচ আছে হাজার টাকা। আর এহনেই ক্লাচের বাকেট লাগাইলাম, গ্রিজ দিতাছি। খরচের উপ্রে খরচ।
গাবতলীতে হঠাৎ ছোটাছুটি বেড়েছে গ্যারেজ মালিক কামালের। তিনি সাতক্ষীরা-খুলনা রুটের বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন।
তিনি বলেন, বাস মালিকদের খালি খরচ আর খরচ। লকডাউনে বসে থাকার পর গাড়ি চালু করতে প্রতিটি গাড়িতে কিছু না কিছু টাকা ঢালতে হবে।
এখানে এমনও মালিক আছে যারা অনুরোধ করে বলেছেন, বাকিতে গাড়ির কাজটা করে দিতে। কিন্তু আমারও তো সংসার আছে।
কামাল জানান, তার গ্যারেজ চালাতে ঘর ভাড়া, কর্মীদের বেতনসহ মাসে ন্যূনতম খরচ ২০ হাজার টাকা। ঘরে সাত বছরের মেয়ে আছে, স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। দীর্ঘদিন বসে থাকার পর এখন ছোটাছুটি বাড়লেও টাকা সেভাবে আসছে না।
দিগন্ত পরিবহনের বাস চালক আবদুল বাতেন বহু বছর বাস চালান। তার শিষ্য-স্যাঙাতদের অনেকেই এখন একই কোম্পানির চালক হয়েছেন। তাকে দেখা গেল টার্মিনালের ভেতরে বাসের সামনে বসে চা পান করতে।
বাতেন বলেন, গাড়ির ক্ষতি তো হইতাছেই, আমাগো যে কী খারাপ অবস্থা। ভয়ে বাড়িত যাই না। ঘর ভাড়া আছে, খাওয়ার খরচ আছে। আমাগো কাছ থিকা শ্রমিক কল্যাণের নামে ট্যাকা নেয়, হেই ট্যাকা কার পকেটে যায় সেইডা আপনারা খোঁজ করেন।
কামালের সঙ্গে বসে থাকা বাসচালক আশরাফুল বলেন, পুরো লকডাউনে কোনো শ্রমিক নেতা তাদের এক কেজি চালও দেননি। সোমবার ঢাকা উত্তর সিটির মেয়রের পক্ষ থেকে এক হাজার পরিবহনকর্মীকে ত্রাণ দেওয়া হয়।
বাস শ্রমিকদের অভিযোগ, ত্রাণ দেওয়ার কথা শুনে শ্রমিক নেতারা আবার নিজ এলাকার লোকদের টার্মিনালে পাঠিয়ে দেন, সে কারণে কার্ডথাকার পরও অনেক বাসকর্মী ত্রাণ পাননি।
শ্রমিক নেতাদের কথা উঠতেই জটলার মধ্য থেকে শ্রমিকেরা তাদের কয়েকজন নেতার নাম ধরে অভিযোগ করতে শুরু করেন; গালি-গালাজও চলতে থাকে।
আলী আকবর নামে একজন বলেন, এই যে এতো বড় বড় শ্রমিক নেতা, কিন্তু শ্রমিকগো দেহার কেউ নাই। গাড়ি চললে সারা দ্যাশেই চান্দা নেয়। কিন্তু শ্রমিকরা যহন না খায়া থাকে, তহন কেউ আগায়া আসে না।
অর্ধেক বাস গুনবে কে?
লকডাউনের বিধিনিষেধ নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ রোববার যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, তাতে ১১ অগাস্ট থেকে স্বাস্থ্যবিধি মানার উপর জোর দিয়েদোকানপাট-রেস্তোরাঁ-অফিসসহ প্রায় সবকিছু চালুর কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু গণপরিবহনের ক্ষেত্রে এবার অন্য নিয়ম। আগে লকডাউন শিথিলের ধাপ হিসেবে অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখার কথা বলা হলেও এবার আসন সংখ্যার সমান যাত্রী নিতে বলা হয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন এক এলাকার মোট গণপরিবহনের অর্ধেক সড়কে নামানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন পরিবহন মালিকরা। স্বয়ং সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
পরিবহন কর্মীরা বলছেন, সরকার এ সিদ্ধান্ত কী করে বাস্তবায়ন করে সেটি দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
বাসচালক আবদুল বাতেন বলেন, আমার কোম্পানির কয়টা গাড়ি চলে হেইডা তো আমি নিজেই জানি না। কে অর্ধেক বাস চালাইতাছে- এইডা গুনবো ক্যামনে।
পুলিশ কী রাস্তায় বইয়া বইয়া কোম্পানির গাড়ি গুনব? এইহানে বহু মহাজনের একটাই গাড়ি। হ্যারা কী করব?