Loading...

পদ্মা সেতুর যাত্রীতে থৈ থৈ সায়েদাবাদে টিকেটের হাহাকার


পদ্মা সেতুর যাত্রীতে থৈ থৈ সায়েদাবাদে টিকেটের হাহাকার

ঈদের আগে ছুটি শুরুর প্রথম দিনে রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে দক্ষিণের জেলার বাসের টিকেট ফুরিয়েছে বেলা অর্ধেক হওয়ার আগেই, কোনো কোনো কাউন্টারের সামনে বাসও ‘নেই’।

পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় দক্ষিণের জেলার বাড়িমুখো যাত্রীরা বহু বছরের ভোগান্তি এড়াতে এবং প্রথমবার সেতুতে ওঠার বাসনায় এবার ঈদযাত্রায় বেছে নিয়েছেন সড়ক পথ। তাই পিরোজপুর, পটুয়াখালীসহ অন্যান্য এলাকার সঙ্গে বরিশাল ও খুলনাগামীদের ভিড় বেড়েছে রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে। খবর বিডি নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর।

এ টার্মিনাল থেকে পিরোজপুর, বাগেরহাট, পটুয়াখালী যাতায়াত করা সাকুরা পরিবহনের কাউন্টারে কোনো টিকেট নেই বলে ব্যবস্থাপকরা জানালেন। খুলনা ও বাগেরহাট রুটের ইমা পরিবহনের কাউন্টারেও 'গাড়ি নাই' লেখা কাগজ সেঁটে দেওয়া হয়েছে।

সায়েদাবাদে সেবা গ্রিন লাইন, সাদিক পরিবহন, বেপারি পরিবহন, কুয়াকাটা এক্সপ্রেস, বরিশাল এক্সপ্রেস, ফালগুনি এক্সপ্রেস, রাজীব পরিবহনের কাউন্টারেও কোনো কর্মীকে দেখা গেল না।

টার্মিনালের কর্মীরা জানালেন, এসব পরিবহনের বাসের টিকেট আগেই বুকিং হয়ে যাওয়ায় এখন আর কাউন্টারে কেউ নেই। তবে চাপ বেশি দেখে কিছু কিছু বাস কাউন্টারে টিকেট বিক্রি বন্ধ করে দিয়ে বাইরে ‘বেশি দামে’ টিকেট বিক্রি করছে বলে অভিযোগ করলেন যাত্রীদের কেউ কেউ। 

খুলনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া বনফুল পরিবহনের কাউন্টারে কিছু টিকেট বিক্রি করার পর বাসের দরজায় ওই বাসের সুপারভাইজারকে টিকেট বিক্রি করতে দেখা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল বাসে সিটের জন্য এক হাজার এবং দাঁড়িয়ে যাওয়ার জন্য ৭০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।

কাউন্টারের বদলে গাড়িতে বেশি দামে টিকেট বিক্রির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বনফুল পরিবহনের সুপারভাইজার ফয়েজ আহমেদ বললেন, “এত বেশি যাত্রী আগে দেখিনি, লোকজন টাকা দিলেও আমাদের পক্ষে তাদের সবাইকে নেওয়া তো সম্ভব না। কিছু বেশি নেওয়া হচ্ছে কারণ গাড়িটা যাত্রী নামিয়ে একেবারে খালি অবস্থায় আবার ফিরবে।”

সায়েদাবাদ থেকে বাগেরহাটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া বনফুল পরিবহনের আরেকটি বাসে নির্ধারিত সিটের অতিরিক্ত যাত্রী তোলার অভিযোগ করলেন ওই বাসের যাত্রী তৈরি পোশাককর্মী মো. মুকুল মিয়া।

তিনি বলেন, “খুব সকালে আসলাম, কিন্তু কোনো গাড়ি পাইতেছি না, এই গাড়িতে কন্ডাক্টর বলছে এক হাজার টাকা লাগবে, উঠে গেলাম। বলছে সিট দেবে, কিন্তু এখনও তো অনেকেই দেখছেতেন দাঁড়াইয়ে আছে।"

প্রথমবার প্দ্মা সেতু দেখার ইচ্ছায় দীর্ঘ পথে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কষ্ট মেনে নিয়েছেন মুকুল মিয়া। বললেন, “পদ্মা সেতু দেখব বলে দাঁড়িয়ে হলেও যাইতেছি। প্রথমবার এত বড় সেতুর ওপর দিয়া বাড়ি যাই, এটা বড় আনন্দের বিষয়।"

সায়েদাবাদে ক্লাসিক মেঘনা পরিবহনের একটি বাসে বাগেরহাটের রায়েন্দা পর্যন্ত যেতে জনপ্রতি ৭০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। হুড়োহুড়ি করে উঠতে গিয়েও না পেরে হতাশ দোকানকর্মী মাইদুল ইসলাম বললেন, "ভাড়া তো বড় কথা না, দাঁড়িয়ে যাব, তাও তুলছে না। কখন যে গাড়িতে উঠতে পারব, আর বাড়ি পৌঁছব কখন, বুঝতেছি না।"

দেড় বছরের দুই যমজ মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে আব্দুল্লাহপুর থেকে সকাল সাড়ে ৭টায় সায়েদাবাদ টার্মিনালে পৌঁছান মাছের আড়তে চাকরি করা মো. রাসেল। বাগেরহাট যেতে বনফুল পরিবহনের টিকেট নিয়েছেন তারা।

সকাল ১০টার দিকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে রাসেল বলেন, “তিন ঘণ্টা হয়ে গেল টিকেট নিলাম, কিন্তু এখনও তো গাড়ি আসে না। কখন যে গাড়ি আসবে তারাই (বাসকর্মী) জানে।"

এ ই পরিবারটিরও ঈদযাত্রায় মূল আকর্ষণ পদ্মা সেতু পাড়ি দেওয়া। রাসেল বললেন, “আমরা এই প্রথম সেতু দিয়ে যাব, মেয়েদের কোলে তুলে সুন্দর এই সেতু দেখাব।"

এ টার্মিনালে দীর্ঘদিন ধরে গাড়ির গ্যাস ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করা আবুল হোসেন আপেল জানালেন, এতো যাত্রীর চাপ তার ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতায় নেই।

“এই টার্মিনাল চালু হওয়ার পরের বছর আমি কাজ শুরু করেছি, আগে এখান থেকে সিলেট, কুমিল্লা, ফেনি, চট্টগ্রামের বাস বেশি যেতে। খুলনা, বাগেরহাটের বাসগুলো ডাকাডাকি করেও যাত্রী পেত না।"

পদ্মা সেতু হওয়ায় ভোগান্তি এড়াতে মানুষ বাসরুট বেছে নিয়েছে বলে মনে করেন টার্মিনালের এই কর্মচারী।

"এবার পদ্মা সেতু হওয়ায় মানুষগুলো এই দিকে চলে এসেছে। লঞ্চে সন্ধ্যায় উঠলে সারা রাত সময় লাগত, এখন বাসে উঠতে পারলেই সাড়ে তিন- চার ঘণ্টায় বাড়ি পৌঁছে যাবে, সেজন্য তো মানুষ এদিকেই আসবে।"

মেঘনা পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার মো. রফিকের ভাষ্য, যাত্রীদের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে গেছে তাদের জন্য। অসহায় কণ্ঠে বললেন, “সবাই টিকেট চায়, কিন্তু আমাদের তো এত গাড়ি নাই।”

বেশি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে তার বক্তব্য, “ভাড়া তো বেশি না, এক্সপ্রেসওয়ে  আর পদ্মা সেতুর টোল আছে। গাড়ির খরচ বাড়ছে, আমাদের তো পোষাতে হবে।"

টার্মিনালের সামনে সড়কের পাশে সৌদিয়া পরিবহনসহ কয়েকটি বাস কাউন্টারে যাত্রীদের বড় জটলা দেখা গেল। সেখানে অধিকাংশ বাসের টিকেট আগেই শেষ হয়ে। কাউন্টার থেকে বলা হচ্ছে, তাদের কাছ থেকে সকালে যারা টিকেট নিয়েছেন, তাদের বাস ছড়াবে দুপুরের পর।

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া যেতে মিরপুর থেকে ওই কাউন্টারে টিকেটের আশায় আসা শাকিল আহমেদ বললেন, "বহু কষ্ট করে মিরপুর থেকে এসেছি, ভাবছি বাসস্ট্যান্ড থেকে গাড়ি পাব, এখানে তো মানুষ আর মানুষ, গাড়ি নাই।"

টার্মিনালে এসে টিকেট না পেয়ে লোকাল বাসে কয়েক দফায় গাড়ি বদল করে করে ফরিদুপর যাওয়ার চেষ্টা করবেন বলে জানালেন ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালের শিক্ষার্থী শরীফুল ইসলাম।

তিনি বললেন, অনেক চেষ্টা করেও কোন গাড়ির টিকেট তিনি যোগাড় করতে পারেননি। তাই ভেঙে ভেঙে যাওয়া ছাড়া গতি নেই।

Share if you like

Filter By Topic