নামে কি বা আসে যায়- জগদ্বিখ্যাত কবি ও নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট নাটকের বহুল ব্যবহৃত একট সংলাপ থেকে এই প্রবচনের উদ্ভব। এর সার কথা হলো: নাম দিয়ে সবসময় কোনো জিনিসের গুণ বোঝা যায় না বা নাম কোনো কিছুর গুণের মতো গুরুত্ব বহন করে না।
বেসরকারি খাতের ’পদ্মা ব্যাংকে’র ক্ষেত্রে এ প্রবচনটি বেশ খাটে। তৃতীয় প্রজন্মের এই বেসরকারি ব্যাংকটি ২০১৩ সালে ’ফারমারস ব্যাংক’ নামে যাত্রা শুরু করেছিল। ২০১৭ সালে নাম বদলে রাখা হয় পদ্মা ব্যাংক। নাম বদলের প্রধান কারণ হলো, অনিয়ম-কেলেংকারীর কালিমা মোচন।
তৎকালীন শীর্ষ কর্ণধারদের ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির ফলে ব্যাংকটি ডুবতে বসেছিল। অভিযোগ রয়েছে যে ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও নিরীক্ষা কমিটির প্রধানরা (চেয়ারপারসন) ব্যাংক থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বিভিন্নভাবে সরিয়ে ফেলায় সহযোগিতা করেছিলেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান নিয়ম-কানুন ও প্রচলিত প্রথার সাথে আপোষ করে বা ছাড় দিয়ে ব্যাংকটি বাঁচানোর চেষ্টা করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকটির পরিচালনা পরিষদ বাতিল করে দিয়ে নতুন পরিষদ গঠন করে। সরকার চারটি রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ব্যাংক এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা আইসিবিকে বাধ্য করে ডুবতে বসা ব্যাংকটিকে ৭১৫ কোটি টাকার নতুন পুঁজি জোগান দিতে।
এখন প্রতীয়মান হচ্ছে যে এসব যাবতীয় প্রয়াসই বিফলে গেছে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সবরকম সমর্থন পেয়েও ব্যাংকটি নিজেকে টেনে তুলতে পারেনি।
পদ্মা ব্যাংকে পুঁজি যোগান দিয়ে তথা বড় অংকের বিনিয়োগ করে রাষ্ট্র-মালিকানাধীন চার বাণিজ্যিক ব্যাংক (সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী) এবং আইসিবি ২০১৮ সাল থেকে একটি পয়সাও মুনাফা পায়নি। একাধিক গণমাধ্যমের সংবাদ থেকে বরং এটা জানা গেছে যে ব্যাংকটিতে সবসময় লাল বাতি জ্বলতে থাকায় এই বিনিয়োগের বেশিরভাগই হাওয়া হয়ে গেছে।
এমতাবস্থায় নতুন আরেক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। জানা গেছে, পদ্মা ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি লিখে জানিয়েছে যে কোনো একটি রাষ্ট্র-মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাথে তাদেরকে একীভূত করে দিতে। মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ চিঠিটি মাত্র পেয়েছে। মন্ত্রণালয় এখন পরযন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
তবে একটি দৈনিক পত্রিকার খবর অনুসারে, রাষ্ট্র-মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এ বিষয়ে বেশ অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেছে। কেউই অনিয়ম-লোকসানে নিমজ্জিত পদ্মা ব্যাংককের সাথে গাঁটছড়া বাঁধতে রাজী নয়। আর সেটাই যৌক্তিক। এই সরকারি-মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো নিজেরাই বড় অংকের খেলাপি ঋণের বোঝাসহ নানামুখী সমস্যার মধ্যে আছে। বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে সরকারকে তহবিল জোগান দিতে হয়েছে। এখন পদ্মা ব্যাংকে যদি এদের কারো সাথে একীভূত (মার্জার) করা হয়, তাহলে তা সরকারের সমস্যা বাড়াবে বৈ কমাবে না।
[এদিকে মূলধনের ঘাটতি মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোরনিয়াভিত্তিক বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংক ডেলমরগানের সাথে গত সপ্তাহে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে পদ্মা ব্যাংক। খবরে প্রকাশ, ৩৫ কোটি ডলার ঋণ ও ৩৫ কোটি ডলার মূলধনী বিনিয়োগ মিলবে এর মাধ্যমে। মানে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার নতুন মূলধন আশা করছে পদ্মা ব্যাংক।]
সাবেক ফারমারস ব্যাংকে যেসব অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে তার জন্য অবশ্যই দায়ী সরকারি নীতি-নির্ধারকদের একাধিক ভুল সিদ্ধান্ত এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বল তদারকী।
আর দেশের ব্যাংকখাতের স্বাস্থ্য যে ভাল নেই- এ কথাতো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সবাই তা জানে। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের কোনো দেখা মিলছে না। সরকার বরং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করে গত এক দশকে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যক্তিখাতে কয়েকটি নতুন ব্যাংক স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে।
যে কোনো নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, তা সেটা ব্যাংকই হোক বা ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) হোক, স্থাপনের সময় এর উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সততা ও শুদ্ধাচারিতার গুণ দুটো বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে যথাযথ দৃষ্টি দিয়েছে- এ কথা বলা খুব কঠিন।
বিপর্যয়ে নিমজ্জিত হওয়ার অভিজ্ঞতা শুধু এই পদ্মা ব্যাংকেই শেষ হবে বলে মনে হয় না। বরং আরো কয়েকটি ব্যাংকের একই রকম পরিণতি হতে পারে যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক সকল ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করতে ও আর্থিক অবস্থা গভীরভাবে যাচাই করতে শুরু করে।
zahidmar10@gmail.com
[মূল ইংরেজি নিবন্ধ পড়ুন:
https://thefinancialexpress.com.bd/views/opinions/merge-with-padma-bank-not-interested-1630598304]
