নোনাজলের কাব্য - যে গল্প মাটি ও মানুষের


আবির অয়ন | Published: December 12, 2021 13:30:27 | Updated: December 12, 2021 20:33:26


নোনাজলের কাব্য - যে গল্প মাটি ও মানুষের

ক্রমশ উন্নত হচ্ছে পৃথিবী। পাল্লা দিয়ে জটিল হচ্ছে জীবনযাপন। নিজেদের সুখ স্বচ্ছন্দ্যের দিকে বেশিমাত্রায় খেয়াল রাখতে গিয়ে প্রকৃতির শরীর থেকে পলেস্তারা খসিয়ে উষ্ণতা খুঁজে যাচ্ছে মানুষ। তাতে প্রকৃতিও নির্মম হচ্ছে নিজের মতো। যার প্রভাব পড়ছে প্রান্তিক মানুষদের জীবন-জীবিকায়।

পটুয়াখালির প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক জেলেপাড়া। ট্রলার দিয়ে মাঝসাগরে পাড়ি জমায় জেলেরা মাছের খোঁজে। বড় বড় ঢেউ পার হতে হয় নিয়মিত।

সিডর এসে তাদেরকে নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে কয়েকবছর আগে। কিন্তু তারা দমে যাননি৷ আবার সাগরের স্রোতে মিশে গেছেন জীবিকার তাগিদে।

আধুনিক শিক্ষার প্রসার এখানে তেমন নেই। গ্রামের কিশোরদের দৌড় মসজিদ পর্যন্ত। গ্রামের চেয়ারম্যানই মোড়ল, তিনিই মহাজন। সব জেলেদের খুঁটি তার উঠোনে পোঁতা।

এমন সময় শহর থেকে আসে রুদ্র। শহুরে সংস্কারমুক্ত লেখাপড়া জানা ভাস্কর। তার বাবা কোনো একসময় এই জনপদে এসেছিলেন ত্রাণ দিতে। নিজের আর্টিস্ট সত্তার বিপরীতে থাকা বাবার উপর ক্ষোভ থাকলেও বাবার মুখে শোনা এই জনপদেই রুদ্র ফিরে আসেন, হয়তো নিজের নতুন সৃষ্টির অনুপ্রেরণা যোগাতে।

তরুণ নির্মাতা রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের প্রথম চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপট এমনই।'নোনাজলের কাব্য' ছবিটি টোকা দিয়ে খুলতে চাইবে দর্শকের বন্ধ হয়ে থাকা মনের দরজাটা।

রুদ্রর চোখ দিয়ে দর্শক দেখবে পরিবেশ নিয়ে উদাসীন মানুষের খামখেয়ালীতে জলবায়ুর পরিবর্তন কি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে বা উঠতে পারে তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের কোনো প্রত্যন্ত জনপদের জন্য।

রুদ্র আসে, সাথে তার চারকোণা সংসার। রুদ্রর স্বাধীনচেতা মূল্যবোধের সাথে সংঘর্ষ বাঁধে কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামের মানুষের অন্ধবিশ্বাসে, যার ইন্ধনদাতা চেয়ারম্যান।

সমুদ্রে মাছ ধরা পড়বে না দোষ রুদ্রর। কেননা সে বেশ কিছু নাপাক জিনিস (রুদ্রর বানানো ভাস্কর্য) এই গ্রামে ঢুকিয়েছে। গ্রামের কিশোররা রুদ্রর ঘরে গিয়ে মূর্তি তোলা শেখে। মূর্তি গড়তে গড়তে তাদের নামাজ ছুটে যায়।

রুদ্র বোঝায় সবাইকে। এগুলো পূজা করার মূর্তি না। এগুলো ভাস্কর্য৷ কিন্তু গ্রামের মানুষরা চেয়ারম্যানের ফতোয়া মেনে চলে। তারা মাছ ধরতে যাবে কি যাবে না তাও নির্ভর করে চেয়ারম্যানের কথার উপর।রেডিওতে শোনা আবহাওয়ার সংবাদ তিনি কানে নেন না কারণ তাদের পূর্বপুরুষদের সময় রেডিও ছিলো না। তখনও তারা মাছ ধরে জীবনযাপন করতেন।

নোনাজলের কাব্যে এরকম কুসংস্কারের চর্চা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো দর্শকের মনে আছড়ে পড়ে। তারা বুঝতে শুরু করে এই সিনেমা ঠিক আনন্দ যোগানোর জন্য নির্মাণ করা হয়নি, আরো গভীর বক্তব্য নিয়ে হাজির হচ্ছে।

আবার ঝড় আসে। রুদ্রর যুক্তিতে প্রভাবিত হতে থাকে গ্রামের মানুষেরা। ঘনঘন ঝড়, সমুদ্রে মাছের আকাল এসবকিছুই হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে। এখানে অন্ধ বিশ্বাসের কোনো ঠাঁই নেই।

অবশ্য সিনেমাটি কোনো জয় পরাজয়ের হিসাব কষতে যায়নি। জেলেপাড়ার টুনি রুদ্রকে কীভাবে তার সৃষ্টিতে প্রভাবিত করতে থাকে তার আখ্যানও বলতে থাকে সিনেমাটি।

নিয়মের বাইরে গিয়ে টুনির বারবার রুদ্রর ঘরে ছুটে আসা, কোনো এক পরিত্যক্ত জাহাজে ছোটভাইকে নিয়ে দুজনের ঘুরতে যাওয়া, চেয়ারম্যান তাদের মেলামেশার জের টেনে টুনিকে ঘরবন্দী করলে রুদ্র'র তার কাছে ছুটে যাওয়া- এসবের মাঝে চেনা প্রেমের গল্পের আবহ খুঁজে পাওয়া যায়।

রুদ্র চরিত্রে তিতাশ জিয়া বেশ সাবলীল। তার প্রথম সিনেমা 'মৃত্তিকা মায়া'তে তিনি গ্রামীণ ভাস্করের ভূমিকায় অভিনয় করলেও মৃত্তিকার বৈশাখ আর নোনাজলের রুদ্র সম্পূর্ণ আলাদা।

চেয়ারম্যানের চরিত্রে ফজলুর রহমান বাবু মূল এন্টাগনিস্ট হলেও তাকে দেখে দর্শকের ঘৃণা জন্মে না, রক্ত মাংসের মানুষi মনে হয়। অভিনেতার পাশাপাশি নির্মাতার সাফল্য এখানেই। কোনো ধর্মের উপর বিদ্বেষ জন্ম না দিয়ে তার কুসংস্কারগুলো ছেঁচে আনতে পেরেছেন।

তবে সবচেয়ে অবাক করেছে তাসনোভা তামান্নার অভিনয়। জেলেপাড়ার নারীদের সাথে তাকে আলাদা করা যায় না একেবারেই। 'লাইভ ফ্রম ঢাকা'র রেহানার সাথে নোনাজলের কাব্যের টুনির আকাশ পাতাল তফাৎ। জেলে চরিত্রের অন্যান্যরাও ছিলেন যুৎসই।

চলচ্চিত্রের টেকনিক্যাল ডিপার্টমেন্ট বেশ পোক্ত। বেশ কিছু ফ্রেম চোখে লেগে থাকবে। সাথে অর্ণবের মিউজিক পরিমিত ও যথাযথ।

সম্প্রতি গ্লাসগোতে কপ-২৬ (Cop-26) এর গ্রিন জোনে সিনেমাটি প্রদর্শিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এটির মূল বিষয় হওয়ায় জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে চলচ্চিত্রটি আমন্ত্রিত হয়।

গত বছর ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট আয়োজিত ৬৪তম লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবে চলচ্চিত্রটি প্রথম প্রদর্শিত হয়। পরবর্তীতে বুসান, সিঙ্গাপুর, কলকাতা, গোথেনবার্গ, সাও পাওলো, তুরিন, সিয়াটলসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এর প্রদর্শনী হয়েছে।

এছাড়া সম্প্রতি কানাডার দক্ষিণ এশীয় চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতা MISAFF-এ শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক হিসেবে পুরষ্কার জিতেছেন ছবির পরিচালক রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত এবং চিত্রগ্রাহক চানানুন চোতরুনগ্রজ।

abirayon217@gmail.com

Share if you like