যুগে যুগে নারীকে বহুভাবে সাহিত্যের পাতায়, চলচ্চিত্রের রিলে উপস্থাপন করা হয়েছে। সময়ের সাথে সে উপস্থাপনের ধরনে কিছু পরিবর্তন এলেও বেশিরভাগ ধাঁচই রয়ে গেছে পুরনো। অন্য সব ক্ষেত্রের চলচ্চিত্র নির্মাণের জগতে পুরুষের অধিক বিচরণের কারণে নারীকে আমরা বেশিরভাগ দেখেছি পুরুষের দৃষ্টিতে, যা অধিকাংশ সময় লরা মালভের ‘মেল গেইজ’ তত্ত্বের প্রতিনিধিত্ব করেছে।
সেক্ষেত্রে এ প্রশ্ন আসা খুবই স্বাভাবিক যে নারীর দৃষ্টিতে যদি নারীকে উপস্থাপন করা হয়, তবে তা কেমন হবে? সে প্রশ্নের উত্তর হিসেবে কিছু নারী নির্মাতা নারীকে ফুটিয়ে তুলেছেন চলচ্চিত্রের পর্দায়। সবগুলোই যে মেইল গেজ থেকে বেরিয়ে এসেছে, তেমনটা একেবারেই নয়। কেননা পুরুষতান্ত্রিক নারীর উপস্থিতিও পুরুষতান্ত্রিক পুরুষের মতোই সরব।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২২ উপলক্ষে আজকের এ লেখায় কয়েকজন নারী নির্মাতার চোখে ধরা নারীর গল্প হবে। গল্প হবে সেই চলচ্চিত্রগুলো নিয়ে, যার কাহিনীর কেন্দ্রে ছিল নারীই।
পরমা (১৯৮৫)
অভিনয়ের পাশাপাশি ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণের জগতে নিজের সাবলীল প্রতিভার ছাপ রেখেছেন অপর্ণা সেন। ‘পরমা’ তার ক্যামেরার পেছনের অভিজ্ঞতার অন্যতম একটি গল্প। ‘কুড়িতে বুড়ি’; নারীর জীবনরেখাকে একসময় বেঁধে ফেলা হতো এই শব্দগুচ্ছ দিয়ে। তাতে চল্লিশে পৌঁছানো নারী তার জীবন একেবারে শেষ হয়েছে ভেবে নেয়াটাও অস্বাভাবিক ছিল না। এ সিনেমার নামচরিত্র তেমনই এক নারী। এ চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাখী গুলজার।
সংসারের নিত্যদিনের ঝঞ্ঝাটে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা, পরিবারের বাইরে নিজের কোনো পরিচয় না খুঁজে পাওয়া, অতীতের নিজেকে একেবারেই হারিয়ে ফেলা এই নারীর চোখে আমরা দেখি তার অস্তিত্ব পুনরায় আবিষ্কারের যাত্রা।
ধাপে ধাপে পরমা যেভাবে আবারো নিজেকে কুড়িয়ে পায় কয়েকখানা আধুলির মতো, সামলে রাখতে গিয়ে আবারো হাত ফসকে পড়ে যায়– তা যেন প্রতিনিধিত্ব করে আরো আমাদের আশপাশের বহু চেনা নারীর উত্থান-পতনের হিসেবটারই। সিনেমা এগোনোর সাথে সাথে পরমাকে বিচ্ছিন্ন কোনো গল্পের একা এক চরিত্র মনে হয় না, মনে হয় আমাদের পাড়ার অলিগলিতে বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে আরো অনেক পরমা।
ওয়াটার (২০০৭)
বৈধব্য– এই একটি শব্দে একটা সময় অস্তিত্ব বেঁধে ফেলা হতো একজন মানুষের, একজন নারীর। আধুনিকতার উন্নয়ন জুড়ে এখনো যে কোথাও তা হয় না, তার কোনো নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। তবে যে সময়ে এই বৈধব্যের আক্ষরিক অর্থে ‘জ্বালা’ নিয়েই নারীর জীবন ঘুরপাক খেতো, সেই সময়টি নিয়ে এ সিনেমা।
ভারতীয় পরিচালক দীপা মেহতার ‘এলিমেন্ট ট্রিলজি’র শেষ সিনেমা এটি। বানারসের ১৯৩৮ সাল। একটি বিধবা আশ্রম এর পটভূমি। সেখানে বহু বিধবার মধ্যে যে তিনজনকে প্রধান করে দেখানো হয়েছে, তাদের বয়সটা খেয়াল করলে বোঝা যায়– একজন মানুষেরর জীবনের মূল তিনটি ভাগই আছে সেখানে। শৈশবের চুঁইয়া, যৌবনের কল্যাণী এবং বার্ধক্যের সেই বুড়িমা, যার জীবনের শেষ ইচ্ছে ছিল একটি লাড্ডু খেতে পারা।
বৈধব্য নিয়ে সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি আষ্টেপৃষ্ঠে কীভাবে এই তিন বয়সের ফ্রেমে তিন নারীকে যে সুতোয় গেঁথে ফেলে, এ গল্প তারই বুনন। এতে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যেমন এসেছে, তেমনি আছে বর্তমানের অসহায়ত্বও। পরিচালক সে সূত্রেই একটি সাক্ষাৎকারে সিনেমার নামের সাথে এর উপস্থাপনের সংযোগ ঘটিয়েছেন, “জল যেমন প্রবহমান রূপ নিতে পারে, তেমনি থেমেও থাকে। আমি মনে করি আমাদের ঐতিহ্য বা প্রথাগুলো অতটা অনমনীয় হওয়া ঠিক নয়। বরং তাদের সময়ের সাথে প্রবহমান জলের মতো বয়ে যাওয়া উচিত।”
আন্ডার কনস্ট্রাকশন (২০১৫)
আজকের তালিকায় সর্বশেষ নামটি একজন বাংলাদেশী চলচ্চিত্র নির্মাতার– রুবাইয়াত হোসেন। এটি তার পরিচালিত দ্বিতীয় সিনেমা। রবি ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’র মাকড়সাজালের জগত থেকে, যক্ষপুরীর সোনা খুঁজে বেড়ানোর সময় থেকে বেরিয়ে নন্দিনী চরিত্রটি এ সিনেমায় এসে দাঁড়ায় ঢাকার নাগরিক জীবনে। তার বিবর্তন হয় মঞ্চের সামনে ও পেছনে, তার মেটামরফোসিস ঘটে জীবনের সাঁকো জুড়ে।
এ গল্প সকাল হলেই একই ঘড়ির কাঁটায় ঘেরা জীবনবৃত্তের, যাতে প্রতিদিন দল বেঁধে গার্মেন্টস কর্মীরা একই দিনের পুনরাবৃত্তি করে। নন্দিনী এখানে বহুমাত্রিক, নারী এখানে শ্রেণিবিভক্ত– বাস্তবের মতোই। সিনেমা যে বাস্তবকে তুলে ধরতে পারে, সিনেমা যে বাস্তবের চাইতে খুব দূরের কিছু নয়– সিনেমা যে আদতে আমাদের জীবনের মতোই ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ থাকে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত, তাই উঠে আসে এ সিনেমায়।
অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
anindetamonti3@gmail.com
