পথ চলতে চলতে চোখে পড়লো রাস্তার পাশে কেউ মনের আনন্দে নাচছে। একটু এগিয়ে দেখা গেল বিশাল বিশাল স্তম্ভ, জাদুঘর। কিছুদূর পরপর ফুটবল উন্মত্ততা তো আছেই। মনে প্রশ্ন আসতেই পারে যে একসাথে এত কিছু কিভাবে অনুভব করা সম্ভব! কিন্তু আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্স এমনই এক শহর যা এই অনুভূতির মধ্য দিয়ে ঘুরিয়ে আনবে এখানে ঘুরতে আসা মানুষদের।
এই শহরে ট্যাঙ্গো নাচ থেকে শুরু করে ফুটবলের উল্লাস, পার্ক জাদুঘরের স্মৃতিস্তম্ভ কি নেই! সব মিলিয়ে এই শহর যেন এক জাদুর দেশ। একে বলা হয় 'প্যারিস অব সাউথ আমেরিকা'। এই শহর যেন সবসময়ই জীবন্ত!
২০৩ কিলোমিটার আয়তনের এই শহরে পথে ঘাটে পা রাখলেই খেলে যায় উত্তেজনার ঢেউ। অভিবাসীদের জীবনপ্রবাহ, ইউরোপীয় ধাঁচের সংস্কৃতি, ভৌগলিক অবস্থা সব দিক দিয়ে এই শহর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে সব কিছু ছাড়িয়ে এই শহরের মূল বিশেষত্ব হচ্ছে এখানকার নাচ। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়া এই নাচ বিশ্বব্যাপী সবারই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
বুয়েন্স আয়ার্সের 'লা বোকা' জায়গার নাম কম বেশি সকলেরই জানা। এই জায়গায় থাকে ইতালীয় অভিবাসীরা। এদের সাথে সাথে এখানে প্রতিপালিত হয়েছে ফুটবল এবং ট্যাঙ্গো নাচ। এখানেই রীতিমত বসে ট্যাঙ্গোর আসর। প্রেমাবেদনপূর্ণ এই নাচ সকল পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
ট্যাঙ্গোর আদি নাচের নাম 'মিলঙ্গা'। মানুষে মানুষের মাঝে সংযোগের এক মাধ্যম ছিল এই নাচ। বুয়েন্স আয়ার্স - এর অলিগলিতে দেখা মিলত এই মিলঙ্গা নাচের। সবাই একসাথে বসে পানাহার করত, নাচতো, গাইতো এবং নিজেদের জীবনের নেতিবাচক বিষয়কে ভুলে থাকার চেষ্টা করত।
অবাক করা বিষয় এই নাচটা তখন পরিচিত ছিল 'দরিদ্র পুরুষের নৃত্য' হিসেবে। কেননা আজ থেকে ১২০ বছর আগে খোলা রাস্তায় নারীদের নাচের পরিবেশ ছিল না। তখন পুরুষরাই পুরুষদের সাথে নাচতো। নারীরা এই নাচে যুক্ত হওয়ার পরপরই এই নাচের মূল স্টাইল ঠিক হয়ে যায়৷ হয়ে যায় প্রেমাবেগ প্রকাশের এক অন্যতম মাধ্যম।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ট্যাঙ্গো নাচের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়৷ বিভিন্ন দেশ থেকে নারী পুরুষ অংশ নেন সেই প্রতিযোগিতায়। এই ট্যাঙ্গো নাচ এই শহরের এক ঐতিহ্য। তবে সোশ্যাল ক্লাবে এই নাচ পরিবেশিত হয় না।
বুয়েন্স আয়ার্স-এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে, এখানে মৃতদেরকেও দেওয়া হয় সম্মান এবং তা দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক বেশি ই! এখানে সমাধিস্থানে দেখা যাবে বিশাল বিশাল গম্বুজ এবং স্মৃতিস্তম্ভ। তবে এখানে দর্শনার্থীদের নজর সবচেয়ে বেশি কাড়ে ইভা পেরনের সমাধির দিকে৷ ইভা পেরন আর্জেন্টিনার ফার্স্ট লেডি ছিলেন। তার মৃত্যুর ৭০ বছর পরেও তার কাজ নিয়ে এখনো আলোচনা হয়।
তবে এই শহরের প্রাণ বলতে যদি কেউ ট্যাঙ্গো নাচের কথা বলেন, সেক্ষেত্রে ভুল হওয়ার কোনো অবকাশ নেই!
অর্থী নবনীতা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
aurthynobonita@gmail.com
