দ্য পয়জন গার্ডেন: শত প্রজাতির বিষাক্ত উদ্ভিদের বাগান


মাহমুদ নেওয়াজ জয় | Published: March 13, 2022 20:01:40 | Updated: March 14, 2022 15:24:48


একটি ভিডিও ফুটেজ থেকে নেওয়া ছবি

হ্যারি পটারের বিভিন্ন সিনেমায় যে প্রাসাদটি চোখে পড়ে তা অবস্থিত লন্ডনের নর্দামবারল্যান্ডে, নাম অ্যালউইক ক্যাসল। নর্দামবারল্যান্ডের ডিউক সপরিবার বাস করেন এই প্রাসাদে। প্রাসাদের সাথে রয়েছে বিশাল বাগান। তবে প্রাসাদটি যতটা না আলোচিত তারচেয়ে অনেক বেশি আলোচিত এর বিশাল বাগানের নির্দিষ্ট একটা অংশ- যার নাম দ্য পয়জন গার্ডেন।

এই বাগানে রয়েছে প্রায় একশ রকমের বিষাক্ত উদ্ভিদ। যার ভেতর আছে হেমলক, ব্রুগম্যানসিয়া, ধুতুরা, লরেল, বেলাডোনা, ফক্সক্লোভ এর মত প্রচণ্ড বিষাক্ত উদ্ভিদ। আবার পপি, হেরোইন, কোকেন এর মত মাদকও আছে এই বাগানে!

বাগানটি প্রাকৃতিক কোন বাগান নয়। খুব সুপরিকল্পিতভাবে সেখানকার দ্বাদশ ডিউক রাসেল পার্সি ও তার স্ত্রী ডাচেস জেন পার্সি গড়ে তুলেছিলেন বাগানটি।

সেটা ১৯৯৫ সালের কথা। রাসেল পার্সি সস্ত্রীক নর্দামবারল্যান্ডে আসেন তার ভাইয়ের অকস্মাৎ মৃত্যুর পর। সেখানে এসে ডিউকের দায়িত্ব নিতে হয় তাকে। তার স্ত্রী জেন নতুন এই জীবনে অভ্যস্ত হতে পারছিলেন না। তাই ঠিক করেন বাগান করবেন অবসরে।

এই প্রাসাদে প্রায় সাতশত বছর আগে থেকে তাদের পূর্বপুরুষরা বাস করে আসছিলেন। ১৭৫০ সালে তৎকালীন ডিউক নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বাগানটি গড়ে তুলেছিলেন। তবে এতদিন পর এসব ছিলো প্রায় পরিত্যক্ত। তিনি ঠিক করেন বাগান করবেন, পাশাপাশি বাচ্চাদের পড়াবেন সেখানে। চমৎকার সময় কাটবে তার।

সেই পরিকল্পনামত আবার নতুন রূপে সাজে অ্যালউইক ক্যাসল। বিশাল এলাকা জুড়ে নানারকম ফুল-ফলের সমাহারে গড়ে ওঠে মনোরম বাগান। প্রাসাদটিও অনেকাংশে তার হারানো জৌলুশ ফিরে পায়।

কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই বাচ্চাদের অনেকে বিরক্ত হয়ে উঠছিলো। একঘেঁয়েমি বোধ করছিলেন তারা। আবার পর্যটকদের আনাগোনাও আশানুরূপ হচ্ছিলো না। ডাচেস ভাবলেন চমকপ্রদ কিছু করা দরকার। ডিউক রাসেলের পরামর্শে তারা শুরু করলেন বাগানে রকমারি বিষাক্ত উদ্ভিদের বীজ বপন।

এক্ষেত্রে তাঁদের অণুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিলো ইতালির মেডিসি পরিবারের করা বিষাক্ত বাগান। ইতালির এই রাজপরিবার পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য শত প্রকার বিষাক্ত উদ্ভিদের সম্ভার তৈরি করেছিলেন!

ডাচেস অব নর্দামবারল্যান্ড নিজেও সেই পথে হাঁটলেন। দশ বছরের প্রস্তুতি শেষে ২০০৫ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এই বাগানের কার্যক্রম।

নিষিদ্ধ জিনিসের মত চিরায়ত আকর্ষণ আছে মানুষের। তাই ঘটনা চাউর হতে না হতেই প্রচুর মানুষের ভিড় জমে যেতে লাগলো এই বাগানে। রোমাঞ্চ, কৌতূহল, সত্য যাচাই, অবিশ্বাস, সন্দেহের দোলাচল - মানুষকে নিয়ে এলো এখানে।

বিষাক্ত এই বাগানের প্রবেশপথে আছে প্রকাণ্ড এক কালো গেট। প্রচণ্ড ক্ষতির নির্দেশক কঙ্কালের খুলি ও হাড়ের চিহ্ন আছে সেখানে। একদিনে গড়ে ২০-২৫ জনের বেশি পর্যটককে ঢুকতে দেয়া হয়না।

সার্বক্ষণিক গাইড থাকেন। বিষাক্ত উদ্ভিদগুলো খাওয়া তো দূরের কথা, এমনকি ছুঁয়ে দেখলে বা ঘ্রাণ নিলেও অজ্ঞান হওয়া, সাময়িক স্মৃতিভ্রষ্টতা বা অন্ধ হয়ে যাওয়ার মত ব্যাপার ঘটতে পারে।

সক্রেটিসের মৃত্যুর ঘটনাসূত্রে বিষাক্ত উদ্ভিদ হেমলকের কথা জানা আছে সবারই। এই বাগানে আরো আছে ব্রুগম্যানসিয়া। এটি একরকম ধুতুরা ফুল। বেঁটে খেলে বা হাতে ছুঁয়ে সেই হাত মুখে দিলে ঘটতে পারে স্মৃতিবিভ্রম।

লরেল উদ্ভিদের ঘ্রাণে অনেক পর্যটকই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। ভালোভাবে মাস্ক ব্যবহার না করলে অজ্ঞান হওয়া, এমনকি কাছ থেকে শুঁকলে মৃত্যুও হতে পারে। এতে থাকা সায়ানাইড প্রজাপতিসহ বিভিন্ন পতঙ্গকে মেরে ফেলে।

বেলাডোনা দেখতে সুন্দর। কিন্তু এই সৌন্দর্য হতে পারে পর্যটকদের চেতনানাশের কারণ। পাশাপাশি হাতে ছুঁয়ে চোখে হাত দিলে দৃষ্টিশক্তি হারাতে হতে পারে চিরতরে। কাজেই পর্যটকদের সবাইকে খুব সাবধান থাকতে হয়।

প্রতিসপ্তাহে এই বাগানে অন্তত তিনজন পর্যটক অজ্ঞান হন, যদিও কারো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি এখনো।

এই বিষাক্ত বাগানে এতকিছুর পাশাপাশি আছে বাড়তি আকর্ষণ উইচ-হাট বা ডাইনী কুঁড়েঘর। বিষাক্ত উদ্ভিদগুলো খুব কাছ থেকে দেখার রোমাঞ্চকর অনুভূতির সাথে ডাকিনীবিদ্যার সামনে হাজিরের অনুভূতি চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে পর্যটকদের।

আর এভাবেই প্রতিষ্ঠার সতেরো বছর পরও সেই একইরকম আগ্রহ ও রোমাঞ্চের জায়গা ধরে রেখেছে লন্ডনের নর্দামবারল্যান্ডের এই বিষাক্ত উদ্ভিদের বাগান।

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা করেন।

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like