সাঁঝ আকাশে নতুন বাঁকা চাঁদের আলোয় ছোটবড় সকলের মুখে যেনো হাসির রেখা ফুটে উঠে। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনা শেষে পবিত্র ঈদুলফিতর উদযাপনের অপেক্ষার প্রহর এবার ফুরালো। বিশ্বের সকল ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ তাদের পরিবারপরিজন, আত্মীয়স্বজন নিয়ে আনন্দমুখর ও উৎসব আমেজে এই দিনটি পালন করে থাকেন।
সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল সেরে মানুষ নতুন পোশাক গায়ে জড়ায়। এরপর মিষ্টান্ন দিয়ে হালকা নাশতা সেরে ঈদের নামাজ পড়তে ঈদগাহের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ঈদের সকালের দৃশ্যপটটা এমনই হয়ে থাকে। তবে দেশ আর সংস্কৃতিভেদে সারাদিনের ঈদ উদযাপনে ঐতিহ্যগত কিছু পার্থক্য দেখা যায়। একেক দেশে একেক প্রথা বা বিশেষ নিয়মে পবিত্র এই দিনটি পালিত হয়।
ইন্দোনেশিয়া
বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ দেশটিতে ঈদ উদযাপনের একটি বিশেষ অংশ হচ্ছে হাজার স্তর বিশিষ্ট কেক(ল্যাপিস লেজিট কেক) তৈরির রেওয়াজ। এই কেকটি দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমনি সুস্বাদু। ২০১৭ সালে সিএনএন কর্তৃক স্বীকৃত বিশ্বের সুস্বাদু ১৭ টি কেকের তালিকায় এই কেকের অবস্থান ছিল চতুর্থতম। বাদ্য বাজিয়ে আরআতশবাজির খেলায় পুরো দিনটি আনন্দ উৎসবে কেটে যায়।
তুরস্ক
তুরস্কে ঈদ উৎসবকে রামাদান বৈরামি বা সেকার বৈরামি বলা হয়। ঈদের দিনে বিশেষ কিছু প্রথা পালন করা হয়, যেমন-ছোটরা বড়দের সম্মান জানানোর জন্য তাদের ডান হাতে চুমু এঁকে দেয় এবং সেই হাতটি নিজেদের কপালে ছুঁয়ে বৈরামি অভ্যর্থনা (আপনার ঈদ শুভ হোক) জানায়।
যুক্তরাষ্ট্রের হ্যালোইন উৎসবের মত ছোটদের আরো একটি বিশেষ প্রথা আছে। ছোট বাচ্চারা প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বৈরামি অভ্যর্থনা জানায় এবং প্রতিবেশীরা বিভিন্ন রকম মিষ্টান্ন, যেমন-বাকলাভা, টার্কিশ ডিলাইট, চকোলেট বা উপহার হিসেবে অল্প পরিমাণে টাকা (তুরস্কের মুদ্রার নাম আংকারা) প্রদান করে।
মালয়েশিয়া
কর্মসংস্থানের কারণে বাবা-মা বা পরিবারপরিজন ছেড়ে অনেককেই দূরে থাকতে হয়। ঈদের আগে তাই কমবেশি সবাই চেষ্টা করে ছুটির সময়টাতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরে যাওয়ার। কিন্তু মালয়েশিয়াতে ঈদের আগে সবাই তাদের নিজ নিজ বাড়িতে চলে যায়। ঈদের ঠিক আগেরদিন প্রদীপ দিয়ে পুরো বাড়ি সাজাতে সবাই খুব ব্যস্ত সময় পার করে। ঈদের দিনে নানারকম সুস্বাদু পদ, যেমন-কেতুপাত (ভাত দিয়ে তৈরি এক ধরনের খাবার), কুইহ রায়া (এক ধরনের কুকি) লেম্যাং(পোলাও চাল ও নারকেল দুধ তৈরি এক ধরনের খাবার), রেন্ডিং(নারকেল দুধ দিয়ে মশলাদার মাংস) প্রতি ঘরে ঘরে রান্না হয়।
ঈদের দিনে মালয়েশিয়ার একটি বিশেষ ঐতিহ্য রয়েছে যা ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানবতার ধর্মকে তুলে ধরে। প্রতিটি মুসলিম বাড়ির দ্বার এই দিনটিতে সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকে। পরিচিত, অপরিচিত যে কেউ যেকারো বাড়িতে আতিথেয়তা গ্রহণ করতে পারে এবং সবাই সাদরে অতিথিকে আপ্যায়ন করে।
সৌদি আরব
ঈদের দিনে সৌদি আরবের মুসলমানগণ তাদের ঈদ খুশী ছোট-বড়, গরীব-দুঃখী সকলের সাথে ভাগ করে নেন। ঈদের দিনে খাবার টেবিলে পরিবেশনের পূর্বে ছোট বাচ্চারা পরিবারের বড়দের সামনে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে পরে আর বড়রা তাদের সালামি দিয়ে খুশি করে। প্রত্যেকটি পরিবারেই এর অনুকরণ হয়। এরপর সবাই মিলে পরিবেশনকৃত মজার মজার খাবার উপভোগ করে।
অর্থ-বিত্তে সবাই সমান হয় না। ঈদের দিনে কেউ পরিবার নিয়ে আনন্দ করবে আর কেউ বিরস বদনে বসে থাকবে, এটা সৌদি আরববাসীরা কখনো চায় না। তাই তারা সাধ্যমত যথেষ্ট পরিমাণে চাল-ডালসহ অন্যান্য পণ্য চুপিসারে এবং সম্পূর্ণ অজ্ঞাত পরিচয়ে দুঃস্থ পরিবারগুলোর ঘরের সামনে রেখে আসে।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com