বিকেল বেলায় কেউ একজন একটা রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। হঠাৎ তার মনে হলো এদিকটায় আগেও তিনি একবার এসেছেন। এবার সামনে দিয়ে একটা লোক হেঁটে চলে গেলো। মনে মনে তিনি খুঁজে চলছেন, এ কে কোথায় যেন দেখেছি। ভেবেই চলেছেন কিন্তু পাচ্ছেন না কোথায় কবে দেখেছেন। এখন আদতে ওই রাস্তা ধরে তিনি কোনোদিন এসে নাও থাকতে পারেন এবং এটা সম্ভব যে, সেই লোকটি ছিল তার সম্পূর্ণ অপরিচিত। আর তারর সাথে যে ঘটনাটা ঘটলো সেটা ছিল দেজা ভ্যু!
১৮৭৬ সালে বিজ্ঞানী এমিলি বইরাচ প্রথম মানুষের এই আজব অনুভবটি নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন এবং দেজা ভ্যু নাম দেন। দেজা ভ্যু শব্দের উৎপত্তি ফ্রেঞ্চ ভাষায়, যার মানে করলে দাঁড়ায় আগেই দেখা হয়ে গিয়েছে। দেজা ভ্যু হলো এমন একটা অনুভূতি যা কোনো ব্যক্তিকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে সামনে ঘটে যাওয়া দৃশ্যপট সে আগে দেখেছে।
গবেষকরা দেজা ভ্যুর অভিজ্ঞতাকে কয়েকটি গোত্রে ফেলেছেন-
দেজা ভিকু - পূর্বে অনুভব করা হয়েছে এমন, দেজা সু- আগেই জানা ছিল, দেজা সেন্টি- আগে চিন্তা করা হয়েছে আর দেজা ভিজিটি -আগেই ঘুরে আসা হয়েছে।
মানুষের মস্তিষ্ক সব ধরনের অভিজ্ঞতার ছবি যত্নে সাজিয়ে রাখে ধূসর কোষে। তাই যখন একই রকমের কোনো ঘটনা ঘটতে চলে তখন মাথায় থাকা পুরোনো স্মৃতি অনুরণিত হয়। মস্তিক এটা মানতে উসকে দেয় যে এই ঘটনা তো ঘটেছে আগে। অনেকটা হলোগ্রামের মতো, একবার মনে হয় এই ছবিটা আগে দেখেছি, কিছুক্ষণ পরেই মনে হয়- না আসলে এমনটি ঘটেনি। কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে মস্তিকে পুনঃপরীক্ষণ চলে, সে খুঁজে পায় এই জায়গায় বা এই রকম পারিপার্শ্বিকে আসলে সে প্রথম এসেছে।
শব্দ, স্পর্শ, গন্ধ, দর্শন, আস্বাদ পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের এই সব কয়টি অনুভব পূর্বে ঘটে যাওয়া মানে স্মৃতিতে থাকার যেকোনো অনুরূপ ঘটনার বিন্দুমাত্র আভাস পেলেই দেজা ভ্যু জাগাতে সক্ষম। অর্থাৎ স্মৃতির রঙ্গমঞ্চে পুরোনো কোনো ঘটনার পুনর্জন্ম ঘটে যায় তখন।
তরুণ বয়সে মানে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সে বেশি দেজা ভ্যু হয়। এই বয়সে বেশি ঘটার কারণ মানুষ তখন প্রত্যহ নতুন জিনিস শিখতে থাকে আর নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সামনে আসে। মস্তিস্কও এই সময়টায় বেশি কর্মক্ষম থাকে। ভ্রমণপিপাসু মানুষদের সবচেয়ে বেশি এই অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে।
তবে পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শতকরা ষাট হতে সত্তর শতাংশ মানুষ জীবনে কখনো না কখনো দেজা ভ্যুয়ের সম্মুখীন হয়েছেন। বয়েস বেড়ে যাওয়ার সাথে মস্তিস্ক এমন ঘটনা ঘটানো ছেড়ে দিতে থাকে।
কেন মস্তিষ্ক এমন অনুভব জাগায় তার উত্তর অনুসন্ধানে দার্শনিক থেকে শুরু করে ছুটেছেন মনোবিদ ও বিজ্ঞানীরা। দেজা ভ্যু ঘটে থাকে মস্তিকের টেম্পোরাল লোবের এপিলেপ্সির কারণে। তবে এই নিয়ে আছে নানা মুনির নানা মত।
এমিলির সমসাময়িক সিগমুন্ড ফ্রয়েড নামে এক মনোচিকিৎসক তত্ত্ব দিয়েছেন এটি দমিয়ে রাখা কোনো ইচ্ছের ফলশ্রুতি যাকে মস্তিষ্ক ঠাঁই গড়তে দেয়নি। 'দ্য দেজা ভ্যু এক্সপিরিয়েন্স: এসেস ইন কগনেটিভ সাইকোলজি' বইতে প্রফেসর এলেন ব্রাউন জানান জৈবিক ত্রুটি, পূর্বপরিচিতি ও বিভক্ত উপলব্ধির কারণে মস্তিকে এমন অনুভূতি সাড়া জাগায়। কিন্তু ডা. ভেরনন নেপে বলেন এটি সম্পূর্ণ এপিলেপ্সি আর সিজোফ্রেনিয়ার ফসল। তবে যারা এইসকল রোগে আক্রান্ত নয়, তাদের কেন এমন হচ্ছে সেই বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
এটি মোটামুটি স্বীকৃত যে, গুরু মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস অঞ্চল এই ঘটনা ঘটাবার কারখানা অর্থাৎ সেই এই অঘটনঘটনপটিয়সী। গবেষণাগারে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ মস্তিষ্কে প্রেরণ করে কৃত্রিমভাবে দেজা ভ্যু ঘটানো সম্ভব হয়েছে। সেখানে ফলাফলে জানা গিয়েছে, নিউরনের বৈদ্যুতিক ডিসচার্জের কিছু তারতম্যের জন্যে দেজা ভ্যুয়ের অনুভূতি তৈরি হয়।
আবার কেউ কেউ বলেন, এটি স্বপ্নে দেখা কোনো স্মৃতি হতেও জাগরুক হতে পারে।
কারুর সাথে যদি পূর্বদৃষ্ট ঘটনাবলীর অনুভব বারবার ঘটতে থাকে, তাহলে সেটা নিশ্চয়ই সুখকর ঘটনা হবে না। তবে এমন একটি ঘটনাই ফ্রান্সের এক ব্যক্তির সাথে ঘটেছে উনিশ শতকে।
এই গল্পের নায়ক হলেন লুইস, যিনি ছিলেন একজন সৈনিক। লুইস এমনেশিয়ায় আক্রান্ত হন। কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছিলো তার জীবনে নতুন কোনো ঘটনা ঘটছে না। যা কিছু ঘটছে তা সবই আগে ঘটে গিয়েছে। তিনি যেন ছোটবেলা থেকে সব একইরকম দৃশ্যপট বারবার দেখে যাচ্ছেন। যখন তার ডাক্তার আর্নডের সাথে দেখা হয়, তখন সে ডাক্তারকে জানায়-
"আমি আপনাকে চিনতে পেরে গেছি ডাক্তার, গত বছর ঠিক এইখানটাতেই আপনার সাথে আমার দেখা হয়। আপনি ঠিক এই প্রশ্নগুলিই করেছেন। আমিও আপনাকে এমনই উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলাম।" পরে ডাক্তার আর্নাড এই অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছিলেন যে, বাস্তবে সেদিন লুইসের সাথে তার প্রথম দেখা হয়েছিল।
মস্তিষের কারসাজি বোঝা সবসময় সম্ভব হয়েও ওঠে না।
সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
susmi9897@gmail.com