দিনটি কন্যা শিশুর তরে


অনিন্দিতা চৌধুরী | Published: October 11, 2021 13:08:25 | Updated: October 11, 2021 17:29:57


ছবি- ইউনিসেফ

বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি, চির কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বহু বছর আগে বলে যাওয়া এই সাম্যময় বাণী যতই আমাদের মর্মে প্রবেশ করুক, পৃথিবীর কোনো বিষয়েই সাম্য প্রতিষ্ঠা হতে বোধহয় আরো অনেকটা পথ রয়ে গেছে বাকি। আর এই বাকি থাকা পথটা যাতে আরেকটু মসৃণভাবে পাড়ি দেয়া যায়, সেজন্য প্রয়োজন হয় বিশেষ কিছু দিবসের। যার চেতনায় মানুষ আবারো নিজের লক্ষ্যটাকে ঝালিয়ে নিতে পারে। এমনই একটি দিবস হচ্ছে আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস- ১১ অক্টোবর। মূলত লিঙ্গ বৈষম্য দূর করে কন্যা শিশুদের পথ মসৃণ করাই এ দিবসের চেতনা।

শ্রীমঙ্গল চৌমোহনা শাখার রূপালি ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পান্নাশ্রী চৌধুরী কর্মক্ষেত্রে এবং কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পূর্বে - উভয় অবস্থানেই নারীদের প্রতিবন্ধকতার দিকটি চিহ্নিত করেন। তিনি মনে করেন, চাকরি পাবার পূর্বের বেশিরভাগ পরীক্ষা দিতে ঢাকা শহরে আসা-যাওয়া করতে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে পুরুষ সহপাঠীদের চেয়ে বেশি অনিরাপত্তা বোধ হয়েছে; কেননা এ দেশে এখনো নারী নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত নয়।

তিনি আরো বলেন যে মফস্বলের একটি ব্যাংক শাখায় কাজ করার দরুন কর্মক্ষেত্রে তাকে তাঁর পুরুষ সহকর্মীদের চেয়ে অনেক বেশি যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রমাণ দিতে হয়। কেননা ব্যাংকে আসা কাস্টমাররা প্রথমে এসে একজন পুরুষ অফিসার-এর খোঁজ করেন। শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন ইত্যাদি বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে,নিজের বেড়ে ওঠার গল্পে অনেক না, অনেক বাধানিষেধের মাঝেও নিজেকে এতদূর এগিয়ে নিয়ে আসতে পেরে আত্মতৃপ্তির পারদ কিছুটা চড়ানোই থাকে তাঁর।

কথা হয়েছিল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বয়ং-এর প্রতিষ্ঠাতা ও জেন্ডার অ্যাক্টিভিস্ট স্বাতীল বিনতে মাহমুদের সাথেও। প্রথমেই তিনি কন্যা শিশু দিবসের তাৎপর্যকে চিহ্নিত করেন। অনেকেই বর্তমানে কোনো বিশেষ দিবসের প্রয়োজন নেই, বছরের প্রতিটি দিবসই বিশেষ ধরনের মনোভাব পোষণ করলেও স্বাতীলের কাছে বিশেষ দিনের মানে একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে আলাদা করে মর্যাদা দেয়া, সেটিকে স্বীকৃতি দান করে নতুন করে ভাবতে বসা। উদযাপনের জন্য পৃথক একটি দিনের অর্থ তাঁর কাছে সম্মিলিতিভাবে সেই দিন এবং দিনের পেছনে থাকা কারণটি নিয়ে ভাবনা।

স্বাতীলের মতে,বিভিন্ন শ্রেণির পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের সংগ্রামের ধরনটা আলাদা হয়। সবাই সবার যাত্রাটা সম্পর্কে জানে না, তবে ফুটপাত থেকে এসি রুম- সর্বত্র নারীদের টিকে থাকার কিংবা এগিয়ে যাবার লড়াইটা কোথায় যেন একই সুরে বাজে। বলেন, শ্রেণি নির্বিশেষে নারীদের পথে কাঁটা আসবেই।

স্বাতীল মনে করেন, ৩০-৪০ বছর আগে নারীদের যে লড়াই ও প্রতিবন্ধকতাগুলো ছিল, তা সময়ের সাথে গতি পাল্টালেও ধরন রয়ে গেছে একই। এবং যা পরিবর্তন কিছু এসেছেও, তা নারীদের নিজেদের টিকে থাকার, এগিয়ে যাবার উৎসাহ থেকে এসেছে। সমাজ, আমাদের চারদিক তাতে খুব একটা শক্তি যুগিয়েছে বলে মনে হয়নি তাঁর। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পরম্পরায় সেই সমাজ, সংস্কৃতি, ক্ষেত্রবিশেষে আমাদের পরিবারও যেন পেছনেই টেনে নিতে চায় নারীদের।

আমরা আমাদের নারীদেরকে ক্ষমতায়িত হতে শিখিয়েছি, কিন্তু আমাদের পুরুষদের কীভাবে সেই ক্ষমতাশীল নারীদের সাথে বসবাস করতে হয়- তা শেখাইনি।

প্রতিটি শিশুই সমান। তারা জানে না কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ কিংবা কোন পথে এগোলে মিলবে সঠিক গন্তব্য। তাই স্বাতীল বিশেষত আহ্বান জানিয়েছেন সকল কন্যা শিশুর বাবা-মাকে, তারা যেন ছোটবেলা থেকেই জেন্ডারের ছাঁচে গড়া কোনো কাজ না চাপিয়ে দেন, শিশুদের জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বিয়ে-সংসার ইত্যাদি ধারণা না ঢুকিয়ে দিয়ে প্রথমে ব্যক্তি হিসেবে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে শেখান। এবং সর্বোপরি তারা যে শুধু নারী হবার কারণে কোনো কাজ করতে পারবে না, এমনটা নয়- বিষয়টি বুঝিয়ে দেন; ঠিক যেমনটা স্বাতীলের বাবা-মার কাছ থেকে তিনি পেয়েছেন বলে জানান।

যত হতাশাই থাক না আশেপাশে, আমাদের নিজেদের মনে রাখতে হবে আশার বীজ। স্বাতীলও তাই বিশ্বাস করেন,মীনা-রাজুর দিন শেষ। এখন মাছের মাথাটা চাইলে মীনাও খেতে পারবে, চাইলে রাজুও খেতে পারবে।

অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী।

anindetamonti3@gmail.com

Share if you like