দক্ষিণী সিনেমায় মিলগুলো কোথায়


মো: ইমরান | Published: June 25, 2022 14:07:59 | Updated: June 26, 2022 11:18:23


ছবি: বলিউড হাঙ্গামা

নব্বইয়ের দশকে ভারতের জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যম দুর্দর্শনে শক্তিমান নামে নাটক প্রচারিত হতো। শক্তিমান ছিলেন একজন লারজার দ্যান লাইফ চরিত্র যিনি কেউ বিপদে পড়লে তাকে বাঁচাতে আসতেন। সুপারম্যানেরই ভারতীয় সংস্করণ বলা যায়। বলাই বাহুল্য, নাটকটি ছিল শিশুদের জন্য।

অতীতের শক্তিমানের বড়পর্দার আরো বৃহত্তর সৃষ্টি হলো হালের বাহুবালি, কেজিএফ ও পুষ্পারা। দক্ষিণী মারকুটে সিনেমাগুলোর বাজারে, গরম পুরো ভারতবর্ষ।

অপরাধ

পুষ্পাকেজিএফ পার্ট এক - দুই উভয়ের গল্পের মূল ভিত্তি হলো‌ অপরাধ। পুষ্পা সিনেমায় অবৈধ উপায়ে দুর্লভ লাল চন্দনের কাঠ পাচার করতে দেখা যায়। অপরদিকে কেজিএফে দেখা যায় গোল্ডমাইন থেকে স্বর্ণ উত্তোলন করে বিদেশে পাচার করতে।

এই দিক থেকে বাহুবালি সিনেমার কাহিনী মূলত অপরাধ না হলেও প্রচ্ছন্নভাবে একজন নায়ক যিনি মহেশপতি সাম্রাজ্যের সম্রাটও বটে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন।

পুষ্পা ও কেজিএফ দুটো সিনেমাতেই অপরাধকে মহিমান্বিত করে দেখানো হয়েছে। পুষ্পারাজ যিনি সব অপরাধের মূল তিনিই সিনেমার নায়ক। তিনি মনে করেন তার কথা মতোই আইনের ব্যবহার করতে পারবেন। পুলিশের চোখে ধুলা দেওয়া কোনো ব্যাপার না।

কেজিএফে রকি সিনেমায় কাল্পনিক সরকারপ্রধানকে পর্যন্ত পাত্তা দেন না। তার মূল শক্তি টাকা, গোল্ডমাইন ও অস্ত্র। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এই সিনেমার রকি ভাইও আইনের প্রতি বুড়ো আংগুল দেখিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে গোটা একটি থানা। এখানেও মহিমান্বিত তিনি।

দুঃসময়ে প্রেক্ষাপট

এখানে দুঃসময়ে প্রেক্ষাপট বলতে কোনো বেদনাদায়ক স্মৃতিকে বোঝানো হচ্ছে যার মধ্যে দিয়ে সিনেমার মূল চরিত্রগুলো অর্থাৎ পুষ্পা, রকি ও বাহুবলি প্রত্যেককেই পার করতে হয়েছে।

আশ্চর্যজনকভাবে পুষ্পারাজ ও কেজিএফে বেশি মিল পাওয়া যায়। কেননা এই দুই সিনেমাতে সেই বেদনাবিধুর স্মৃতি তাদের মাকে কেন্দ্র করেই রচিত।

আর্থিক কষ্ট, টানা-পোড়েন, অত্যাচার ও নিপীড়নের শৈশব নিয়ে দুঃখের কাহিনী অঙ্কিত হয়েছে সিনেমা দুটিতে। রকি এবং পুষ্পা ছোটবেলায় পড়ালেখা করার সুযোগ পায়নি। তাই যৌবনে তারা ভুল পথ বেছে নিয়েছে; অনেকটা এমন ধারণাই হতে পারে, যদি সিনেমাটি কেউ দেখে।

তবে অন্যায়ের স্বীকার হয়ে এই দুই নায়ক যৌবনে যে ভুল পথে অগ্রসর হয়েছে, পুরো সিনেমাজুড়ে তাকে মহিমান্বিত করা হয়েছে তো অবশ্যই রীতিমতো তার বৈধকরণও করা হয়েছে।

দুটো সিনেমাকে যদি সিনেমা পরিচালক মহেশ মঞ্জ্রেকরের ১৯৯৯ সালের বাস্তব সিনেমার সাথে তুলনা করি তাহলে মনে পড়বে শেষ দৃশ্যে মূল চরিত্র রঘুর করুণ পরিনতি। রঘু তার মায়ের হাতে পিস্তল দিয়ে বলে "মা আমাকে হত্যা করো, আমাকে শান্তি দাও।" পুষ্পা, কেজিএফে আমরা এধরনের অনুশোচনা দেখি না।

গুরুত্বপূর্ণ মা, আদর্শ মা

বাহুবলি, পুষ্পা ও কেজিএফ তিনটি সিনেমাতেই মায়ের চরিত্র তাৎপর্যপূর্ণ। কেজিএফ সিনেমায় মা নিপীড়িত ও অত্যাচারের স্বীকার।

সিনেমার যেকোনো টার্নিং পয়েন্টে তিনি হাজির হন এবং হিরোকে ফ্ল্যাশব্যাকে নিয়ে গিয়ে জীবনবোধ সম্পন্ন কয়েকটি সবক দেন। সেই সবকে শক্তিশালী হয়ে পুনরায় অপরাধে মনোনিবেশ করেন রকি ভাই।

পুষ্পা সিনেমায় পুষ্পা সিনেমায় মা জীবিত। তিনি আদর্শবাদী হলেও বখাটে ছেলে তার ছিটেফোঁটা দেয়ার তাগিদ অনুভব করেননি। দিনভর কষ্ট করা আর ছেলেকে বকাঝকা করে দু-একটা আদর্শ বাক্য শোনানো তার কাজ।

মায়ের এই‌ কষ্টকে উপজীব্য করে গল্পের মধ্যে হিরো চন্দন কাঠের অবৈধ ব্যবসা করার অনুপ্রেরণা পায়।

রোমান্টিক সম্পর্ক

যেখানে লারজার দ্যান লাইফ চরিত্রটিই সিনেমার মূল চালিকাশক্তি সেখানে একজন নারী চরিত্রের চিত্রায়ন প্রাধান্য নিতান্তই নেই বললে চলে। কেজিএফে রকি ভাইয়ের প্রেমিকার কোনো ভূমিকা নেই। ভালোবাসা দিয়ে উগ্র প্রেমিককে মানুষ করা যদি সিনেমার বিষয় হয় তবে সোনিয়ার এখানে সার্থক।

বলিউডের ব্যবসা সফল গতানুগতিক সিনেমার মতোই পুষ্পা ও কেজিএফে প্রেমিকার চরিত্রটি আঁকা হয়েছে। তিনটি শব্দে বলতে গেলে বোকা, দুর্বল ও পরাধীন হিসেবেই দেখানো হয়েছে।

কেজিএফ সিনেমায় প্রেমিকাকে হ্যালিকপ্টার দিয়ে বাতাস দেয়ার দৃশ্যটি যতনা রোমান্টিক তার থেকে বেশি হিরোইজম প্রকাশিত হয়েছে।

একশন

বাহুবালি সিনেমা এই নব্য একশনের জনক বললে ভুল হবে না। তবে কী নতুনত্ব? এক ঘুষিতে দশ ফিট দূরে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মাঝে নতুন কী? স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে।

উত্তর: ভিএফএক্সের ব্যবহার এবং চরিত্রের গুরুতর গুণকীর্তন।

রজনীকান্ত, সালমান খান কিংবা ধানুশের সিনেমায় যেই একশন দেখা যায় তা থেকে কিছুটা ভিন্ন উপস্থাপন। রজনীকান্তের একশন আনন্দ দেয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি অপরদিকে বাহুবালি, পুষ্পা ও কেজিএফে 'বাস্তব ও প্রয়োজনীয়' এমন বোঝায়।

অদ্ভুত সংলাপ

পুষ্পা ঝুকেগা নেহি এবং ভায়োলেন্স লাইকস মি আই কান্ট আভয়িড এদুয়ের অর্থ যথাক্রমে পুষ্পা মাথা নত করবে না এবং সহিংসতা আমাকে পছন্দ করে, আমি তা এড়াতে পারি না।

এই সংলাপগুলো টিকটক কিংবা ইউটিউব রিলের জন্য যুতসই করে বানানো। দর্শককে আকর্ষণ করতে সক্ষম।

একজন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী

কোনো শটে বাহুবালির আসার সময় পুরো গ্রামবাসীর অবাক এবং ভক্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে একসাথে গান গেয়ে ওঠা আবার কেজিএফে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে সিনেমার দৃশ্যে রকির প্রবেশ করা অপরদিকে পুষ্পাতে তার সতীর্থরা তার আনুগত্য হওয়া সবকিছুর ছন্দ এক, বার্তা অভিন্ন।

পুরো গ্রামবাসীর ভয়, আতংক ও শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ত্রাণকর্তা বনে যাওয়া সিনেমার এই মূল চরিত্রগুলোর মাধ্যমে তৈরি হয় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী চরিত্র যিনি অপরাধ করলেও দর্শক তালি দিতে বাধ্য।

মোঃ ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

imran.tweets@gmail.com

Share if you like